সংবাদ প্রতিবেদন
জুলাই-আগস্টে সরকারবিরোধী আন্দোলন চলাকালে ৪ঠা আগস্ট সুনামগঞ্জ পৌর শহরে গুলিবিদ্ধ হন দোকান কর্মচারী জহুর আলী (৩০)। সেপ্টেম্বরে তার বড় ভাই হাফিজ আহমদ স্থানীয় এক সাংবাদিকের সহযোগিতায় বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। সেই মামলায় আসামি ধরা ও ছাড়া নিয়ে ধান্দাবাজি শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ করেন আহত জহুর আলী স্বয়ং।
নিজের শরীরের ক্ষতকে পুঁজি করে মামলা বাণিজ্যে কোটি টাকা কামাচ্ছেন- এলাকায় এমন গুঞ্জনে ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে একপর্যায়ে নিজের ফেসবুক আইডি থেকে লাইভে এসে ওই মামলা নিয়ে ধান্দাবাজি বন্ধেরও আহ্বান জানান তিনি।
অথচ ভুক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচার পাবেন কিনা, এই সংশয় থেকে মামলা করার কথাও ভাবেননি। কিন্তু দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন ও বাংলাভিশনের সুনামগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত সাংবাদিক মাসুম হেলালের প্ররোচনায় মামলা করেন জহুরের বড় ভাই হাফিজ। তিনিই এখন মামলার ভয়-ভীতি দেখিয়ে লোকজন থেকে টাকা আদায় করছেন, এমনটা জানান জহুর আলী।
কিন্তু পরিবারের লোকজনকে নিয়ে স্থানীয়দের ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ দেখে হাফিজ মামলা দায়েরের ১ মাস ২০ দিন পর (নভেম্বরে) আদালতে হলফনামা দিয়ে জানান, ঘটনার বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না, কোনো আসামিকে চেনেন না।
হাফিজ হলফনামায় লিখেছেন, ঘটনার দিন তিনি বাড়িতে ছিলেন। তার বাড়ি সুনামগঞ্জ থেকে অনেক দূরে। তাই তিনি ঘটনার বিষয়ে কোনো কিছু জানেন না। আসামিদেরও চেনেন না।
কিন্তু এই আপসনামা দেওয়ার পর হাফিজ আদালতে গেলে সেখান থেকে একদল যুবক তাকে জিম্মি করে তুলে নিয়ে যায়। পরদিন তাকে সদর থানায় পৌঁছে দেওয়া হয়।
তুলে নিয়ে যাওয়ার পর কী ঘটেছে, জানার চেষ্টা করলেও মুখ খোলেননি হাফিজ। ধারণা করা হচ্ছে তাকে প্রাণনাশের ভয়-ভীতি দেখানো হয়েছে।
জহুর আহমদের বাড়ি সুনামগঞ্জ পৌর শহরের বাধনপাড়া এলাকায়। তিনি শহরের একটি সার-বীজের দোকানে চাকরি করতেন। তার গ্রামের বাড়ি দোয়ারাবাজার উপজেলার এরোয়াখাই গ্রামে। মামলা দায়েরের পর বাদী হাফিজ আহমদও স্বীকার করেন তিনি এত লোককে আসামি দিতে চাননি। ওই সাংবাদিকই (মাসুম হেলাল) সব করেছেন।
জহুর ঢাকায় পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে (সিআরপি) চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন। ফেসবুক লাইভে তিনি জানান ৪ঠা আগস্ট সুনামগঞ্জে গুলিবিদ্ধ হন তিনি। একমাস পর সাংবাদিক মাসুম হেলাল তাদের মামলা করার কথা বলেন।
জহুর আলীর পরিবার সেসময় মাসুম হেলালকে বলেছিলেন, যেহেতু পুলিশ তাকে গুলি করেছে তাই পুলিশের বিরুদ্ধে এই মামলা করবেন। পরে দেখা যায়, মামলায় ৯৯ জন আসামির নাম। এ ছাড়া আরও অজ্ঞাতনামা আসামি ২০০। মামলা দায়েরের সময় সাংবাদিক মাসুম হেলাল জহুর আলীকে ৩০ হাজার টাকা দিয়ে বলেন, ‘একজন’ তার চিকিৎসার জন্য দিয়েছে।
মামলা নিয়ে এখন উল্টো মহাবিপদে আছেন উল্লেখ করে জহুর আলী বলেন, ‘পুলিশ গুলি করছে, পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা করব। কিন্তু পরে দেখি মাসুম হেলাল সবাইরে মামলায় ফাঁসাইছে। সেই মামলা নিয়া এখন ধান্দা শুরু হইছে। সে (মাসুম হেলাল) কোটি টাকা নিছে। শুনছি সে কানাডা চইলা যাইব। টাকা নিয়ে জেলে ঢুকায়, আর বের করে। মামলায় যারার নাম নাই তারারে পুলিশ ধরে বেশি। লোকজন আমাদের নামে অপবাদ দেয়, বলে আমরা নাকি টাকা নিচ্ছি। এসব মিথ্যা। আমরা কোনো টাকা পাই নাই। আমরা গরিব মানুষ। এখন আমরা পড়ছি মহাবিপদে। কোর্ট থেকে আমার ভাইরে তুলে নেওয়া হইছে।’
এরপর জহুর আলীর লাইভ ভিডিওটি ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে যায়।
দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন ও বাংলাভিশনের সুনামগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি সাংবাদিক মাসুম হেলাল তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি উকিল না, রাজনৈতিক কর্মীও না। আমার কথা বলে থাকলে, তারা কারও প্ররোচনায় বলে থাকতে পারে।’
জহুর আলী বলেন, আমি সুনামগঞ্জে গিয়েছিলাম। মামলার কারণে এখন রাস্তায় বের হইতে পারি না, লজ্জা লাগে। লোকে ভাবে মামলা নিয়ে ধান্দাবাজি করতেছি। অথচ আমি গুলি খাইলাম, এখনো চিকিৎসা নিই। চাকরিটা গেছে। আমার এই মামলা নিয়া যেন ব্যবসা, হয়রানি বন্ধ হয়।’
তবে তিনি তার ঘটনার ন্যায়বিচার চেয়ে বলেন, ‘ঘটনায় আরও অনেকে আহত হইছিল, কেউ মামলা করছে না। এখন সবাই মামলা নিয়া খেলতাছে, টাকা কামাচ্ছে। আমারে গুলি করছে পুলিশ। সেই ওসি খালেদ এখনো গ্রেপ্তার হয় নাই।’
উল্লেখ্য, এই মামলায় সুনামগঞ্জের বাসিন্দা পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান, সুনামগঞ্জের সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিকসহ বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে এম এ মান্নান, মুহিবুর রহমানসহ বেশির ভাগই এখন জামিনে আছেন।
পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান-এর মত সর্বজন শ্রদ্ধেয় সজ্জন ব্যক্তিকে এই গায়েবি মামলার কারণে চরম হেনস্থার শিকার হতে হয়েছে। দল-মত নির্বিশেষে স্থানীয় লোকজন তার পক্ষে রাস্তায় নেমে সমাবেশও করেছেন, তার মুক্তির দাবি করেছেন। যা সর্বত্র ব্যাপক সাড়া ফেলে। এরপরই আদালত তাকে জামিন দেন।
যদিও এই মামলায় নিরপরাধ কাউকে হয়রানি করা হচ্ছে না বলে দাবি করেন সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নাজমুল হক।
তিনি বলেন, যাদের নাম আসামির তালিকায় আছে, তারা পালিয়েছে। এটা ঠিক অজ্ঞাতনামা আসামি বেশি ধরা হচ্ছে।
তার দাবি, পুলিশ খোঁজ নিয়ে, ভিডিও ফুটেজ দেখে যারা ঘটনায় যুক্ত তাদের গ্রেপ্তার করছে। নিরপরাধ কাউকে হয়রানি করা হচ্ছে না।
