বিশেষ প্রতিবেদন
মার্কিন নাগরিকরা অন্যদেশের নীতি-নির্ধারণে অংশ নিতে পারেন না। ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনালিটি অ্যাক্টের ৩৪৯(এ)(৪) সেকশন অনুযায়ী ভিন্ন দেশের নীতি-নির্ধারণে অংশ নিলে সেই মার্কিন নাগরিকের নাগরিকত্ব বাতিল হয়ে যাবে।
অনেক আগেই প্রণীত এই আইনের সর্বশেষ ব্যাখ্যা অনুসারে, মার্কিন নাগরিকত্ব পরিহার না করে কেউ যদি অন্যদেশের গুরুত্বপূর্ণ কোন দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হন এবং এ তথ্য যদি নিকটস্থ কন্স্যুলেট জানতে পারে, তবে ঐ আমেরিকানের নাগরিকত্ব বাতিলের সনদ ইস্যু করা হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেখা গেছে, বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের সংসদ, মন্ত্রি পরিষদ, উপদেষ্টা পরিষদ, সংবিধানসহ আইন সংস্কারের নানা কমিটিতে মার্কিন নাগরিকরা অংশ নিচ্ছেন। যাদের অনেকেই প্রচলিত রীতি অনুযায়ী স্বেচ্ছায় নাগরিকত্ব পরিত্যাগ করেননি। অর্থাৎ, সেই তথ্য গোপন করেছেন। ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনালিটি অ্যাক্টের সর্বশেষ ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সেই মার্কিন নাগরিকরা এখন থেকে আর ছাড় পাবেন না।
এ প্রসঙ্গে নিউ ইয়র্কের ইমিগ্রেশন বিষয়ক অ্যাটর্নি অশোক কর্মকার বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন আইন লংঘনের ঘটনাগুলো বড় ধরনের অপরাধ হিসেবে দেখা হয় না। এজন্য নাগরিকত্বের তথ্য গোপন করে অন্যদেশের নীতি-নির্ধারণে অংশ নিলে অভিযুক্ত ব্যক্তির শুধুমাত্র নাগরিকত্বটাই বাতিল হবে, আর কিছু নয়। তবে নীতি-নৈতিকতার ব্যাপারটি সামনে আসবে অবশ্যই। নৈতিক স্খলনজনিত আচরণের পর্যায়ে পড়বে।
কারণ হিসেবে এই অ্যাটর্নি বলেন, আপনি একইসাথে দুটি দেশের প্রতি অনুগত থাকতে পারেন না। বিশেষত, যদি রাষ্ট্রীয় নীতি-নির্ধারণে যুক্ত থাকেন। সেনাবাহিনীর পদস্থ অফিসার, সচিব, এমপি, মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী/প্রধান উপদেষ্টা, রাষ্ট্রপতি ইত্যাদি পদগুলো এখানে বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য।
অ্যাটর্নি অশোক কর্মকার উল্লেখ করেন, যারা সাধারণ নাগরিক, অন্যদেশের নীতি-নির্ধারণে যুক্ত নন, তারা দ্বৈত নাগরিকত্ব নিতে পারেন এবং অনেকে নিচ্ছেন-এটা কোন অন্যায়ের নয়। নৈতিকভাবেও এ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে না।
ইদানিং প্রবাসেও গুঞ্জন উঠেছে, মার্কিন নাগরিকত্ব গ্রহণকারী অনেকেই বাংলাদেশে গিয়ে উপদেষ্টা হচ্ছেন। কয়েক বছর আগে বিচারপতির দায়িত্বও পালন করেছেন একাধিক মার্কিন নাগরিক।
বাংলাদেশের আইন এ ব্যাপারে কী বলে জানতে চাইলে অ্যাটর্নি অশোক কর্মকার বলেন, যদি শপথ গ্রহণের ব্যাপারটি থাকে অর্থাৎ দেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশের শপথ নিতে হয়, আর এটি করার পর ধরেই নেয়া হয় যে, আপনার আনুগত্য শুধুমাত্র বাংলাদেশের প্রতিই, অন্য কোন দেশের প্রতি নয়। এতদসত্বেও যারা অন্যদেশের নাগরিকত্ব গ্রহণের তথ্য গোপন করেন বা মিথ্যা বলেন, সেক্ষেত্রে এটি শপথভঙ্গের শামিল বলে গণ্য করা হয়।
কারণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব নিতে একইসাথে দুটি দেশের স্বার্থ সুরক্ষা সম্ভব হয় না। এজন্যে সংসদ সদস্য পদে মনোনয়নের ফরম পূরণের সময় অন্য কোন দেশের নাগরিকত্ব নেই বলে ঘোষণা দিতে হয়।
প্রসঙ্গত, মার্কিন নাগরিকত্ব গ্রহণের শপথনামায় বলতে হয়: ‘অন্যদেশের সাথে সকল সম্পর্ক-আনুগত্য ছিন্ন করছি। আমি যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান ও আইন মেনে চলব, সমর্থন করব।
[Ihereby declare, on oath, that I absolutely and entirely renounce and abjure all allegiance and fidelity to any foreign prince, potentate, state, or sovereignty of whom or which I have heretofore been a subject or citizen; that I will support and defend the Constitution and laws of the United States of America against all enemies, foreign and domestic; that I will bear true faith and allegiance to the same; that I will bear arms on behalf of the United States when required by the law; that I will perform noncombatant service in the Armed Forces of the United States when required by the law; that I will perform work of national importance under civilian direction when required by the law; and that I take this obligation freely without any mental reservation or purpose of evasion; so help me God.]
এ প্রসঙ্গে মার্কিন ডেমক্র্যাটিক পার্টির এশিয়ান-আমেরিকান প্যাসিফিক আইল্যান্ডার্স সম্পর্কিত লিডারশিপ কাউন্সিলের মেম্বার এবং ম্যারিল্যান্ডে বসবাসরত বাংলাদেশি-আমেরিকান নাগরিক আনিস আহমেদ বলেন, যে মুহূর্তে তারা বাংলাদেশে কোনো রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের শপথ নেবেন, সেই সময়েই ধরে নেয়া হবে যে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পরিহার করেছেন।
আনিস আহমেদ বলেন, তারা যদি শপথ না নিয়েও অন্যদেশের নীতি-নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব শুরু করেন, তখন এমনিতেই মার্কিন নাগরিকত্ব বাতিলের পরিস্থিতি তৈরী হয়।
গত বছর ১২ই মার্চের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনালিটি অ্যাক্টের সর্বশেষ ব্যাখ্যা প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি স্বেচ্ছায় নাগরিকত্ব পরিহারের আবশ্যকতা নেই।
আনিস আহমেদ বলেন, কেউ যদি অন্যদেশের দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হবার পর জানতে পারেন যে, তিনি মার্কিন আইন লংঘন করেছেন, তবে সাথে সাথে যদি নিকটস্থ ইউএস কন্স্যুলেটে গিয়ে বিষয়টি অবহিত করেন, তাহলে আইন লংঘনের দোষে দোষী হবেন না। এক্ষেত্রে সময়টি গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ আপনি দায়িত্বের পুরো সময় অতিবাহিত করে যদি নিজের অজ্ঞতার অজুহাত দাঁড় করান, তবে তা গ্রহণযোগ্য না-ও হতে পারে।
নিউ অর্লিন্স ইউনিভার্সিটির এমিরিটাস অধ্যাপক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশেষজ্ঞ ড. মোস্তফা সারোয়ার বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকের অন্যদেশে- যেমন ধরুন, বাংলাদেশে গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার নিয়ম নিয়ে অনেকের প্রশ্ন রয়েছে। ইমিগ্রেশন এবং ন্যাশনালিটি এ্যাক্ট সেকশন ৩৪৯ (এ) (৪)তে এর উত্তর মিলবে।
তিনি বলেন, মার্কিন নাগরিক যখন অন্যদেশে নীতিনির্ধারণী পদে বহাল হন, তখন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট তার যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন তুলতে পারে। নীতি-নির্ধারণী পদ যদি হয় রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী (অথবা সমমর্যাদার পদ), পররাষ্ট্রমন্ত্রী (অথবা সমমর্যাদার পদ), সে ক্ষেত্রে স্টেট ডিপার্টমেন্ট সক্রিয় পর্যালোচনা করে থাকে।
বর্তমান বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই আইনটি প্রয়োগ করতে পারেন, এমন সম্ভাবনা রয়েছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
