পোপের হৃদপিণ্ড রাখা হবে শ্বেতপাথরের কলসিতে, পালিত হবে আরও যেসব নিয়ম

পোপের হৃদপিণ্ড রাখা হবে শ্বেতপাথরের কলসিতে, পালিত হবে আরও যেসব নিয়ম
শেয়ার করুন

পোপ ফ্রান্সিসের মরদেহ থেকে হৃদপিণ্ড অপসারণ করে নিয়ে একটি শ্বেতপাথরের কলসিতে সংরক্ষণ করে রাখা থাকবে। পোপদের মৃত্যুর পর বিভিন্ন রীতি ও আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পালিত হয় শেষকৃত্য। প্রাচীনকাল থেকে এই রীতিনীতিগুলো নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে আসছেন এ কাজে দায়িত্বশীলরা।

এমনকি, পোপের মৃত্যুর সংবাদটিও প্রকাশ্যে আনার নির্দিষ্ট নিয়মাবলী রয়েছে। ভ্যাটিকানের চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর একজন ক্যামেরলেঙ্গোকে (ভ্যাটিকানের সিনিয়র প্রাশাসনিক কর্মকর্তার পদ) জানিয়ে দেন, চিকিৎসা আর কাজে দিচ্ছে না, পোপের দেহ কোনও সাড়া দিচ্ছে না, শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ এবং হৃদপিণ্ডের কাজ থমকে গিয়েছে।

ঐতিহ্য অনুসারে, ক্যামেরলেঙ্গোই প্রথম পোপের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন। তিনি তিনবার পোপকে ডাকেন, তাতে সাড়া না দিলে তাকে মৃত বলে ঘোষণা করা হয়।

বর্তমানে ওই পদে রয়েছেন আইরিশ কার্ডিনাল কেভিন ফারেল। তিনিই কলেজ অব কার্ডিনালসকে খবরটা দেবেন। এই কলেজ অব কার্ডিনালস হল গির্জার সিনিয়র কর্তাদের একটি কমিটি। এরপর ভ্যাটিকান সরকারিভাবে পোপের মৃত্যুর ঘোষণা করে সংবাদমাধ্যমের সামনে।

মৃত্যুর পর সাধারণত ৪ থেকে ৬, কখনও ৯ দিন পর সমাধিস্থ করা হয় পোপকে। যার নেতৃত্বে থাকেন কলেজ অব কার্ডিনালস-এর ডিন। সাধারণত পোপকে সমাধিস্থ করা হয় ভ্যাটিকান গ্রোতেয়েস-এ। সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকার পাশেই এই সমাধিস্থান রয়েছে। কিন্তু, পোপ ফ্রান্সিস এক সাক্ষাৎকারে তাকে রোমের সান্তা মারিয়া ম্যাগুয়েরে ব্যাসিলিকায় সমাধি দেওয়ার ইচ্ছাপ্রকাশ করেছিলেন।

প্রাচীন রোমান রীতি অনুযায়ী মোট ৯ দিন শোকদিবস পালিত হয় পোপের মৃত্যুতে।

প্রথা অনুযায়ী, এই কদিন পোপের পোশাক পরা দেহ শায়িত থাকে সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকায়। তার গায়ে সুগন্ধী মাখা থাকে সারাক্ষণ। দেহ থেকে বেশ কিছু প্রত্যঙ্গ অপারেশন করে বের করে নেওয়া হয়। রোমের ত্রেভি ঝরনার কাছে থাকা একটি গির্জায় পূর্ববর্তী ২২ জন পোপের হৃদপিণ্ড শ্বেতপাথরের কলসাকৃতির পাত্রে সংরক্ষিত রয়েছে। এটাকে খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীরা পবিত্র দেহাবশেষ বলে মনে করে।

সিস্টাইন চ্যাপেল

পোপের শেষকৃত্যের প্রায় তিন সপ্তাহ পর অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে নতুন পোপ নির্বাচিত হন। পোপ নির্বাচন করার প্রক্রিয়াকে বলা হয় কনক্লেভ। কলেজ অব কার্ডিনালস সিস্টাইন চ্যাপেলে একটি কনক্লেভ ডাকে। সেখানেই গত ৭০০ বছর ধরে মেনে চলা রীতি অনুযায়ী নতুন পোপ নির্বাচিত হন।

ক্যাথলিকদের সবচেয়ে উচ্চস্তরের ১২০ জন কার্ডিনাল (কলেজ অব কার্ডিনালস) পোপ নির্বাচন করেন। ৭০টি দেশের ২২০ জন কার্ডিনাল ভ্যাটিকানে আসবেন। তবে ভোটে অংশ নিতে পারবেন এবার ১২০ জন। গতবার অংশ নেন ১১৮ জন। কারণ যে কার্ডিনালদের বয়স ৮০ বছরের চেয়ে বেশি, তাদের ভোটাধিকার থাকে না। কার্ডিনালরা প্রবেশ করবেন বিশ্বখ্যাত শিল্পী মাইকেলেঞ্জেলোর সিলিং পেইন্টের জন্য বিখ্যাত সিস্টাইন চ্যাপেলে।

তাদের প্রবেশের পর সিস্টাইন চ্যাপেলে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং কার্ডিনালরা ভোট সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত সেখান থেকে আর বেরোতে পারেন না।

কার্ডিনালরা ভেতরে সম্মিলিত প্রার্থনা করবেন। এরপর ঘোষণা করা হবে ‘extra omnes’ অর্থাৎ সবাইকে বেরিয়ে যেতে হবে। ১২০ কার্ডিনাল ছাড়া সবাই বেরিয়ে যাবার পর সিস্টাইন চ্যাপেলের দরজা বন্ধ করে দেওয়া হবে। এর আগেই সবার মোবাইল ফোন, ল্যাপটপসহ সকল ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা সরিয়ে নেওয়া হবে। সমস্ত কক্ষ তল্লাশি করা হবে, যেন কোনো ধারণের গোপন লিসনিং ডিভাইস আছে কিনা। যেন ভেতরের আলাপ বাইরে কোথাও প্রকাশ না হয়।

পোপ নির্বাচন সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত কার্ডিনালরা বাইরের কারো সাথে কোনো যোগাযোগ করতে পারবেন না। একজন নতুন পোপ নির্বাচিত না হওয়া অবধি সিস্টাইন চ্যাপেলের গেট বন্ধ থাকবে। তারা চ্যাপেলের পার্শ্ববর্তী ১৯৯৬ সালে ২০ মিলিয়ন ডলারে নির্মিত কাসা সান্টা মার্থা হোস্টেলেই থাকবেন।

পোপ নির্বাচনে দুই তৃতীয়াংশ ভোট প্রয়োজন। কনক্লেভ শুরুর পর সকাল এবং বিকেলে দুইবার ভোটগ্রহণ হবে। যে কোনো ব্যাপ্টিস্ট পুরুষ পোপ হওয়ার যোগ্য। তবে কোন নারী পোপ হতে পারবেন না। যদিও ১৩৭৮ সালের পর থেকে শুধুমাত্র কার্ডিনালদের মাঝ থেকে পোপ নির্বাচিত হয়ে আসছে।

গোপন ব্যালটে প্রতিবার ভোট গণনার পর ব্যালট পুড়িয়ে ফেলা হবে। যদি পোপ নির্বাচন না হয় তখন পোড়া ব্যালটের চিমনি দিয়ে কালো ধোঁয়া বের হবে। ৩০ বার ভোট হওয়ার পরও কেউ যদি দুই-তৃতীয়াংশ ভোট না পায়, তখন সাধারণ সংখ্যাগরিষ্টতার ভিত্তিতে পোপ নির্বাচিত হন। ১৯২২ সালে এই পদ্ধতিতে পোপ নির্বাচন হয়েছিল। পোপ নির্বাচিত হয়ে গেলে ব্যালট পোড়ানোর পর চিমনি দিয়ে রাসায়নিক ব্যবহারে সাদা ধোঁয়া বের হবে। ভ্যাটিকানের চত্বরে উপস্থিত হাজার হাজার মানুষসহ সারা বিশ্ব লাইভ দেখতে পান টিভিতে এই দৃশ্য।

ভোটের ফলাফলের পর নির্বাচিত কার্ডিনালকে জিজ্ঞেস করা হবে ফলাফল মেনে নিয়ে তিনি পোপের পদ গ্রহণে রাজি কিনা। সম্মতি দিলে পুর্ব থেকে প্রস্তুত পোপের পোশাক পরিধান করবেন। ভ্যাটিকানের টেইলার্স তিন সাইজের পোশাক আগেই তৈরি করে রাখে। এরপর সবচেয়ে বয়স্ক কার্ডিনাল সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকার মেইন ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দিবেন আমরা একজন নতুন পোপ পেয়েছি।

সারা বিশ্বের মানুষ ‘পোপ’ হিসেবে জানলেও পদটির আসল নাম ‘বিশপ অফ রোম’।

কে হতে পারেন নতুন পোপ?

কার্ডিনাল পিয়েত্রো প্যারোলিন। বয়স ৭০। ২০১৩ সাল থেকে তিনি ভ্যাটিকানের বিদেশ সম্পর্কিত বিষয়ের সচিব। কনক্লেভের সর্বোচ্চ পদে আসীন। পরবর্তী নাম, কার্ডিনাল পিটার এরদো। ৭২ বছর বয়সি হাঙ্গেরির মানুষ। পিটার ক্যাথলিকদের বিবাহ বিচ্ছেদ ও পুনর্বিবাহের ঘোরতর বিরোধী। এছাড়াও রয়েছেন, কার্ডিনাল লুই অ্যান্তোনিও ট্যাগল, কার্ডিনাল ম্যাত্তেও জুপ্পি, কার্ডিনাল রেমন্ড লিও বুর্ক।

Visited 159 times, 1 visit(s) today