নিজস্ব প্রতিবেদক
উগ্রবাদী সংগঠন হেফাজতে ইসলামের উদ্যোগে রাজধানীতে এক বিশাল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে নারী সংস্কার কমিশনের রিপোর্টের তীব্র বিরোধিতা করা হয়। সমাবেশে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন যুদ্ধাপরাধীদের সমর্থক খ্যাত আমার দেশ পত্রিকার বিতর্কিত সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। তিনি সরকারের প্রতি নারী সংস্কার কমিশনসহ সকল “অপ্রয়োজনীয়” কমিশন বাতিলের আহ্বান জানান।
মাহমুদুর রহমান তার বক্তব্যে বলেন, “হেফাজতে ইসলাম নারীবাদ নিয়ে যথাযথভাবে প্রশ্ন তুলেছে। আমি প্রধান উপদেষ্টার কাছে জানতে চাই, আপনারা কেন অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক সৃষ্টি করছেন? জুলাই আন্দোলনে কেউ এই ধরনের কমিশন গঠনের জন্য জীবন দেয়নি। মানুষ ফ্যাসিবাদ উৎখাত ও ভারতীয় আধিপত্য থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করতে জীবন দিয়েছে। সরকারের প্রাথমিক দায়িত্ব হওয়া উচিত এমন সংস্কার, যা ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান রোধ করে।”
তিনি আরও বলেন, “একজন প্রবীণ নাগরিক হিসেবে আমি সরকারের কাছে অনুরোধ করছি, অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে সময় ও সম্পদ নষ্ট করবেন না। আমরা বেশ কিছু অপ্রয়োজনীয় কমিশন গঠন হতে দেখেছি, এগুলো বন্ধ করতে হবে। সব কমিশন বাতিল করুন, এগুলোর কোনো বাস্তব উপযোগিতা নেই।”
সংবাদপত্র ব্যবহার করে সম্পাদিত এবং মিথ্যা-বানোয়াট ছবি ও তথ্যসন্ত্রাসের মাধ্যমে গুজব রটানো মাহমুদুর রহমানের বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছেন সচেতন মহল।
একজন সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারী বলেন, “মাহমুদুর রহমানের পুরুষতান্ত্রিক বক্তব্য শুনে আমার গা গুলাচ্ছে। সমান অধিকার, সুযোগ সৃষ্টি ও জীবনযাপনের পছন্দ মৌলিক মানবাধিকার। এটি অপ্রয়োজনীয় বিষয় নয়, বরং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি। তিনি একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক হয়ে সরকার অনুমোদিত নারী সংস্কার কমিশনকে ‘অপ্রয়োজনীয়’ বলে অভিহিত করেছেন, যা নিন্দনীয়।”
আরেকজন প্রশ্ন তুলেছেন, “যদি কোনো সংস্কারের প্রয়োজন না থাকে, তাহলে নারী অধিকার সংস্কার কমিশন কেন গঠন করা হলো? আপনি কি ভুলে গেছেন যে বাংলাদেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলগুলো এখনও নারীদের দ্বারা নেতৃত্বাধীন? আপনি কি অরাজকতা সৃষ্টি করতে চাইছেন? মাহমুদুর সাহেব, এটা নতুন বাংলাদেশ। আমরা আমাদের মেয়েদের পাশে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়াব, যাতে তাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত হয়।”
জুলাই সহিংসতায় নেতৃত্বদানকারী নারীদের মধ্যে সবচেয়ে অগ্রগামী উমামা ফাতেমা ফেসবুক পোষ্টে লেখেন:
“জুলাই এর পর মেয়েদের সাইডে বসায় দিয়ে এখন রাজনৈতিক পাড়ায় নারী অধিকার নিয়ে সালিশ বসছে দেখছি। হায়রে নাটক!
তিনি জুলাইয়ের সরকারবিরোধী আন্দোলনকে উপজীব্য করে খোলা রাজনৈতিক দলের নেতাদের উদ্দেশ্যে বলেন:
নারীরা কোনো ব্যবহারের বস্তু না যে আপনার গদি সিকিউর করে রান্নাঘরে ফিরে যাবে। অভ্যুত্থানের পর দেশের ৫০% জনগণের অধিকারের প্রশ্ন যাদের কাছে উটকো ঝামেলা লাগে তারা আসলে কোন ধরনের রাজনীতি করতে চায় তারাই জানে।
জুলাইয়ের এই তথাকথিত চেতনার নামে আন্দোলনকারীদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যগুলো অবশ্য বেশ হাস্যরসের সৃষ্টি করেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন এনসিপির সাংগঠনিক সম্পাদক হাসনাত আবদুল্লাহ। তাদের আন্দোলনের নারী সদস্যদের অনেকেই জুলাই চেতনার সাথে হেফাজতের এই সমাবেশের উদ্দেশ্য সাংঘর্ষিক বলে মন্তব্য করছেন অনেকেই।
তাদের মতে, উগ্রবাদীদের নিয়ে আহুত জুলাইয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনে নারীদের অবদান কম নয়, অথচ তারাই এখন উগ্রবাদীদের লক্ষ্যবস্তু। অনেকেই মজা করে বলছেন, “জুলাই স্পিরিটটা আসলে কী? একজনের সাথে আরেকজনের স্পিরিট মেলে না কেন?”
এই সমাবেশ এবং বিতর্কিত মাহমুদুর রহমানের বক্তব্য নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র বিতর্ক চলছে। অনেকে নারী অধিকারের পক্ষে সোচ্চার হওয়ার পাশাপাশি সরকারের কাছে নারী সংস্কার কমিশনের কার্যক্রম অব্যাহত রাখার দাবি জানাচ্ছেন।
