ছাপাখানার সাথে গোপন আঁতাতে শিশুরা পেল ৮ কোটি নিম্নমানের পাঠ্যপুস্তক

ছাপাখানার সাথে গোপন আঁতাতে শিশুরা পেল ৮ কোটি নিম্নমানের পাঠ্যপুস্তক
শেয়ার করুন

শিশুদের বই ছাপতে অতিরিক্ত ৮০০ কোটি টাকা খরচ | মান নিয়ন্ত্রণে তদারকির মাঝেই দুর্নীতি

নিজস্ব প্রতিবেদক | ২১শে মে, ২০২৫

প্রতিবছর ১লা জানুয়ারি শিশুদের হাতে পাঠ্যপুস্তক পৌঁছালেও অন্তর্বর্তী সরকার এবার এতে ব্যর্থ হয়। বই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাবার আগেই চলে যায় খোলা বাজারে। প্রকাশ্যেই বিনামূল্যের পাঠ্যপুস্তক বিক্রি হয়। যেসব ছাপাখানায় বই ছাপার কাজ পেয়েছিল, আমদানিকৃত কাগজে তারা পাঠ্যপুস্তকের গাইডবই ছেপে বিক্রি শূরু করে তারা। যা ছিল সম্পূর্ণরূপে কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট। এতকিছুর মধ্যে শিশুদের হাতে পাঠ্যপুস্তক পৌঁছায় এপ্রিলের শেষাংশে। ইতিমধ্যে শিক্ষাবর্ষ থেকে হারিয়ে গেছে মূল্যবান ৪ মাস। তবে ভোগান্তি এতেই শেষ হয়নি।

জানা গেছে, চলতি শিক্ষাবর্ষে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ৪০ কোটি বিনামূল্যে সরবরাহকৃত পাঠ্যপুস্তক দরপত্রের নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী ছাপা হয়নি। যার প্রেক্ষিতে সরকার দেশব্যাপী সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে। অভিযানের নেতৃত্বে রয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে দুটি পরিদর্শন সংস্থা ও দুটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধিরা। ৩২টি দল গঠন করে দেশের ৬৪ জেলায় অভিযান চালানো হয়েছে।

এই অভিযানে প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, ছাপা হওয়া ৪০ কোটির মধ্যে অন্তত ৮ কোটি বই নিম্নমানের হিসেবে শনাক্ত হয়েছে। যেসব মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী বই ছাপাতে ব্যর্থ হয়েছে, তাদের বিল আটকে রাখা এবং কালো তালিকাভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।

এনসিটিবির একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, শুরু থেকেই কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা থাকলেও কিছু বইয়ের মান প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়।

এরপর শিক্ষা উপদেষ্টা সি আর আবরার এনসিটিবিকে নির্দেশ দেন তথ্য যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে। সেই নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে গত এপ্রিল থেকে মাঠপর্যায়ে অভিযান শুরু করে এনসিটিবি। ৩২টি টিম গঠন করে প্রতিটি টিমে দুজন করে কর্মকর্তা রাখা হয়। এদের দায়িত্ব দেওয়া হয় সদর ও উপজেলা শহরের বাইরের এলাকা থেকে দৈবচয়ন পদ্ধতিতে বই সংগ্রহ করার।

এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ নাগাদ এই টিমগুলো তাদের কাজ সম্পন্ন করে—সারা দেশ থেকে বই সংগ্রহ এবং প্রাথমিক মান যাচাই শেষে এখন প্রতিবেদন প্রস্তুতের কাজ চলছে। মাঠপর্যায় থেকে সংগ্রহ করা বইগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর), বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ও বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)-এর পরীক্ষাগারে।

এ ছাড়া, বই ছাপার পরের মান যাচাইয়ের জন্য ‘হাইটেক সার্ভে বিডি’ নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে নিযুক্ত করা হয়েছে। তারাও মাঠপর্যায় থেকে বই সংগ্রহ করে ল্যাব পরীক্ষার মাধ্যমে মান যাচাই করছে। একইভাবে দুটি গোয়েন্দা সংস্থাও স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় বিভিন্ন এলাকা থেকে বই সংগ্রহ করে পরীক্ষা করছে।

জানা গেছে, এসব টিম বইয়ের ছাপার মান, কভার পৃষ্ঠায় ব্যবহৃত কাগজের ধরন, জিএসএম (গ্রাম পার স্কয়ার মিটার), ব্রাইটনেস এবং আর্ট কার্ড সঠিকভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করেছে। একই সঙ্গে তারা বইয়ের মুদ্রণ মান, ছবি ও বাঁধাই ঠিক আছে কি না, তাও যাচাই করেছে।

হাইটেক সার্ভে বিডি ও অভিযানে অংশ নেওয়া একাধিক টিমের প্রতিবেদনের বরাতে জানা গেছে, সংগৃহীত বইয়ের মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ নিম্নমানের হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই হিসেবে প্রায় ৮ কোটি বই মানের ঘাটতি নিয়ে স্কুলে পৌঁছেছে।

খুলনা অঞ্চলে অভিযান পরিচালনাকারী এনসিটিবির এক সদস্য জানান, তারা দুটি জেলা থেকে ২৫০টির বেশি বই সংগ্রহ করেন। তার মধ্যে ৫৩টি বই নিম্নমানের পাওয়া গেছে।

হাইটেক সার্ভে বিডির প্রকল্প ব্যবস্থাপক শাহ জামান জানিয়েছেন, এনসিটিবির নির্দেশনার ভিত্তিতে তারা দেশের প্রতিটি উপজেলার সদর ছাড়া অন্যান্য এলাকা থেকে বই সংগ্রহ করেছেন এবং সেগুলো নির্ধারিত ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হয়েছে। তার নেতৃত্বে একটি বড় দল সারা দেশ ঘুরে নমুনা সংগ্রহের কাজ সম্পন্ন করে।

বই সংগ্রহের সময় তারা বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন—প্রতিটি উপজেলায় বরাদ্দ অনুযায়ী সব বই পৌঁছেছে কি না, ছাপার মান নির্ধারিত দরপত্র অনুযায়ী হয়েছে কি না এবং ছাপার কাজে কোনো ভুল রয়েছে কি না, এসব বিষয়ের ওপর।

শাহ জামান জানান, তাদের প্রতিবেদন এনসিটিবিকে মাঠপর্যায়ের বাস্তব অবস্থা বুঝতে সহায়তা করবে।

তিনি আরও বলেন, এই কাজ চলাকালে বিভিন্ন মহল থেকে চাপ আসলেও, তারা নিরপেক্ষ থেকে প্রকৃত তথ্য তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।

এদিকে, এনসিটিবির অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, দেশব্যাপী এই অভিযান বন্ধ করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং এনসিটিবির সাবেক চেয়ারম্যান তৎপরতা শুরু করেন।

শিক্ষা উপদেষ্টা সি আর আবরারের নির্দেশে ১৭ই এপ্রিল দুপুরে টিম গঠন করে একটি অফিসিয়াল চিঠি জারি করা হয়, কিন্তু সেদিন সন্ধ্যায় তা বাতিল করে দেওয়া হয়।

সূত্র দাবি করেছে, মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তার নির্দেশেই এই বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। পরে, উপদেষ্টার প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে ২৩শে এপ্রিল পুনরায় অভিযান পরিচালনার জন্য নতুনভাবে টিম গঠন করা হয়।

এনসিটিবির দাপ্তরিক নথি অনুযায়ী, বইয়ের মান নিশ্চিত করতে এবার দুইটি নিরীক্ষা সংস্থার পাশাপাশি এনসিটিবির নিজস্ব কর্মকর্তারাও সরেজমিনে কাজ করেছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাধিক পরিদর্শন দল ছাড়াও প্রথমবারের মতো দু’টি গোয়েন্দা সংস্থা এবং শিক্ষা ক্যাডারের ১৫০ জন কর্মকর্তাকে সংশ্লিষ্ট কাজে যুক্ত করা হয়। তারা বিভিন্ন মুদ্রণ প্রেসে হঠাৎ করে অভিযান চালান।

এত নজরদারির পরও শেষ পর্যন্ত অনেক স্কুলে নিম্নমানের বই পৌঁছে গেছে।

এ সমস্যার মূল কারণ অনুসন্ধানে দেখা যায়, বই ছাপানোর আগে ও পরে মান নিরীক্ষার জন্য এনসিটিবি ‘প্রি-ডেলিভারি ইন্সপেকশন (পিডিআই)’ ও ‘পোস্ট ল্যান্ডিং ইন্সপেকশন (পিএলআই)’ নামে দুই ধাপের তদারকি ব্যবস্থা চালু করেছিল। তবে বাস্তবে, কিছু প্রিন্টার্স এসব সংস্থার সঙ্গে অসাধু সমঝোতার মাধ্যমে নিম্নমানের বই সরবরাহ করে।

পরিদর্শনের প্রথম ধাপে প্রেসে ব্যবহৃত কাগজের জিএসএম ও মান যাচাইয়ের কথা ছিল, এরপর ছাপানো বই যাচাই করে ছাড়পত্র দেওয়ার বিধান ছিল। এই পর্যায়কে বলা হয় পিডিআই। নিয়ম অনুযায়ী, প্রেসে ২৪ ঘণ্টার তদারকি চালিয়ে রাতেও বই ছাপার মান যাচাই করার কথা থাকলেও বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।

বিশেষত, পরিদর্শনের মাধ্যমিক ধাপ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ‘ব্লু বাইন্ডার্স’-এর ঘাটতি ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রতিষ্ঠানটির কাছে পর্যাপ্ত জনবল ও প্রযুক্তিগত যন্ত্রপাতি যেমন—বার্স্টিং ফ্যাক্টর মেশিন, স্টিফনেস মেশিন ও গ্লস মেশিন ছিল না।

প্রতিষ্ঠানটি অতীতেও দায়িত্বে অবহেলা এবং অনৈতিক কাজের জন্য কালো তালিকাভুক্ত ছিল। তা সত্ত্বেও, দরপত্রে ছয় নম্বরে থাকলেও তৎকালীন চেয়ারম্যানের পছন্দে তারা কাজ পায়।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এই প্রতিষ্ঠানের অব্যবস্থাপনার কারণেই চলতি বছর মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যবইয়ে মানহানির ঘটনা ঘটেছে।

এ বিষয়ে এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক ড. রিয়াদ চৌধুরী বলেন, “দরপত্রে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে—এনসিটিবি চাইলে পরিদর্শন সংস্থা ছাড়াও নিজস্ব উদ্যোগে মাঠপর্যায়ের বই যাচাই করতে পারবে। এতদিন এ ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয়নি। এবার তা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে মাঠের বাস্তবতা জানা যাচ্ছে।”

এনসিটিবির সচিব অধ্যাপক মাহতাব উদ্দিন মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জানান, তিনি কক্সবাজার জেলার সদর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরের একটি মফস্বল স্কুল থেকে বই সংগ্রহ করেছেন।

তার মতে, অনেক সময় প্রিন্টার্সরা জেলা সদর বা উপজেলা শহরের জন্য অপেক্ষাকৃত ভালো মানের বই সরবরাহ করে, যাতে মনিটরিংয়ে ধরা না পড়ে। কিন্তু প্রকৃত চিত্র জানতে হলে মফস্বলের স্কুলগুলো থেকেই বই সংগ্রহ করা জরুরি, এবং এবার ঠিক সেটাই করা হয়েছে।

এনসিটিবির নথিপত্র অনুযায়ী, ৫ই আগস্টের পর পূর্বের দরপত্র বাতিল করে নতুন দরপত্র আহ্বান করা হয়। এ সময় বেশিরভাগ প্রিন্টার্স দরদাতারা এনসিটিবির সঙ্গে গোপন সমঝোতার মাধ্যমে গড়ে ২০ শতাংশেরও বেশি দামে কাজ নেয়। এর ফলে সরকারের প্রায় ৮০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়। বইয়ের মান বজায় রাখতে কাগজের ‘বাস্টিং ফ্যাক্টর’ ১৫ থেকে ১৬ নির্ধারণ করে দেওয়া হয়, যাতে মানহীন কাগজে বই ছাপা রোধ করা যায়।

প্রথমদিকে তদারকি দলগুলো সক্রিয় থাকায় প্রাথমিক স্তরের বইয়ের মান নিয়ে বড় ধরনের অভিযোগ ওঠেনি। কিন্তু প্রকৃত সংকট দেখা দেয় দ্বিতীয় ও শেষ ধাপে ছাপা হওয়া মাধ্যমিক স্তরের বই নিয়ে।

অভিযোগ রয়েছে, প্রি-ডেলিভারি ইন্সপেকশন (পিডিআই)-এর দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানটি দক্ষতা, পর্যাপ্ত জনবল ও যন্ত্রপাতির ঘাটতির পাশাপাশি আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে কিছু প্রিন্টার্সের কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে নিম্নমানের বইয়ের ছাড়পত্র দিয়েছে।

বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান বলেন, “সরকারের এতগুলো পর্যবেক্ষণ সংস্থা ও পরিদর্শন টিম থাকা সত্ত্বেও যদি বাজারে নিম্নমানের বই পৌঁছে যায়, তাহলে বোঝা যায় যে দুর্নীতি বা গাফিলতি ব্যবস্থার ভেতরেই আছে।”

তিনি দাবি করেন, বই ছাপার শেষ পর্যায়ে তৎকালীন চেয়ারম্যানের নির্দেশেই পরিদর্শন সংস্থাগুলো বইয়ের মান সঠিকভাবে না যাচাই করেই ছাড়পত্র দিয়েছে। এনসিটিবির কিছু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সদিচ্ছার অভাবের কারণেই এ বছরও মানসম্পন্ন বই সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়নি।

এনসিটিবির একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, মানহীন বই ছাপা ও বিতরণ ঠেকাতে ব্যর্থ হয়ে ৫টি বড় মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের বিল আটকে দেওয়া হয় এবং এই বিষয়টি নিয়ে একজন সদস্য তৎকালীন চেয়ারম্যানের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে নোট অব ডিসেন্ট (দ্বিমত পোষণ) প্রদান করেন। তবে এই সদস্যকে পরবর্তীতে এনসিটিবি থেকে বদলি করা হয়।

এই ঘটনার পর এনসিটিবির ভেতরে একটি নিরুৎসাহ ও ভীতিকর পরিবেশ তৈরি হয়। ফলস্বরূপ, চেয়ারম্যানের নির্দেশই পরিণত হয় চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে, এবং কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট পরিদর্শন সংস্থাগুলো তার সিদ্ধান্ত অন্ধভাবে অনুসরণ করতে বাধ্য হয়।

Visited 86 times, 1 visit(s) today