সবসময় ক্লান্ত লাগে, বারবার হাই ওঠে? নারীরা যে রোগে বেশি ভোগেন

সবসময় ক্লান্ত লাগে, বারবার হাই ওঠে? নারীরা যে রোগে বেশি ভোগেন
শেয়ার করুন

লাইফস্টাইল

আপনি কি প্রতিদিন ঘুমিয়ে ওঠার পরেও ক্লান্ত অনুভব করেন? সকালবেলার কফি বা চায়ের কাপে চুমুক দিয়েও কি মন আর দেহ সজাগ হয় না? দুপুর গড়িয়ে গেলেও কি চোখের পাতায় ঘুম আর মুখে হাই থেমে থাকছে না? কাজ করতে গিয়েও কি মনে হয় যেন শরীর আর মন একসাথে চলছে না?

এই ধরনের অবস্থা আজকের দ্রুতগতির জীবনে অনেকের জন্যই পরিচিত বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। বারবার মনে হয়, দৈনন্দিন কাজকর্ম শেষ করাটাই যেন বিশাল এক চ্যালেঞ্জ! এই ক্লান্তির যেন কোনো শেষ নেই, নেই কোনো মুক্তির পথও!

এই দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি বা অবসন্নতার নাম ক্রনিক ফ্যাটিগ সিনড্রোম (Chronic Fatigue Syndrome – CFS)। ডাক্তারি ভাষায় একে বলা হয় মায়ালজিক এনসেফ্যালোমাইলিটিস (Myalgic Encephalomyelitis – ME/CFS)। এটি শরীর ও মন উভয়েরই এক জটিল ও রহস্যময় অবস্থা, যা বিশেষ করে নারীদের মাঝেই বেশি দেখা যায়। এই রোগ সহজে ধরা পড়ে না এবং অনেক সময় ভুল রোগ হিসেবে চিকিৎসাও হয়ে থাকে।

ক্রনিক ফ্যাটিগ সিনড্রোম কী?

সিএফএস এমন একটি অবস্থা, যেখানে ক্লান্তি ব্যাখ্যাতীত এবং বিশ্রামেও কমে না। সাধারণ ক্লান্তির মতো নয়, যা ঘুম বা বিশ্রামে সেরে যায়। এই রোগে ঘন্টার পর ঘন্টা বিশ্রাম নিয়েও রোগী ভেতর থেকে নিঃশেষিত ও শক্তিহীন অনুভব করেন।

ভারতের পিএসআরআই হাসপাতালের নিউরোলজিস্ট ড. ভার্গবী রামানুজম জানান, “এই রোগে ক্লান্তি বিশ্রামের পরেও বাড়তে পারে। এমনকি খুব হালকা কাজ করলেও লক্ষণগুলো তীব্র হতে পারে। একে বলা হয় Post-Exertional Malaise (PEM) বা ‘পরিশ্রম-পরবর্তী অসুস্থতা’।”

উপসর্গ কী কী?

ক্রনিক ফ্যাটিগ সিনড্রোমের বিভিন্ন উপসর্গ রয়েছে:

  • দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি ও অবসন্নতা
  • কাজের পর অবস্থা আরও খারাপ হওয়া
  • পেশি ও জয়েন্টে ব্যথা
  • মাথাব্যথা, ঠোঁট শুকিয়ে আসা
  • মনঃসংযোগে সমস্যা ও স্মৃতিভ্রান্তি
  • ঘন ঘন মুড সুইং, উদ্বেগ বা হতাশা

এই উপসর্গগুলো অনেক সময় হতাশা, উদ্বেগ বা থাইরয়েড সমস্যার মতো অন্যান্য রোগের সঙ্গে মিশে যায়, ফলে রোগটি ধরা পড়ে না বা ভুলভাবে চিকিৎসা করা হয়।

চিকিৎসা কীভাবে হয়?

এই রোগ নির্ণয়ের জন্য কোনো নির্দিষ্ট ল্যাব টেস্ট নেই। অন্যসব রোগকে বাদ দিয়ে, ধাপে ধাপে উপসর্গ বিশ্লেষণ করেই রোগ শনাক্ত করতে হয়। এতে সময় লাগে অনেক, মাসের পর মাস। রোগী ধীরে ধীরে অসহায় বোধ করতে শুরু করেন এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনেও বিঘ্ন ঘটে।

নারীরাই বেশি আক্রান্ত কেন?

বিশ্বব্যাপী দেখা গেছে, পুরুষদের তুলনায় নারীরাই সিএফএসে বেশি ভোগেন। একটি ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, ১৮-৫০ বছর বয়সি ৩০০০ নারীর মধ্যে ১২% এর বেশি এই রোগে আক্রান্ত।

এই প্রবণতার পেছনে কিছু কারণ হল:

  • বয়ঃসন্ধির শারীরিক পরিবর্তন
  • রজঃনিবৃত্তি (মেনোপজ)
  • পারিবারিক ও সামাজিক চাপ
  • আর্থ-সামাজিক অসুবিধা
  • লিঙ্গ বৈষম্য ও মানসিক চাপ

একই গবেষণায় দেখা গেছে, ২০% নারী এই জরিপে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন— কারণ তাদের পরিবারের পুরুষ সদস্যরা অনুমতি দেননি। এটি নারীদের স্বাধীনতা ও স্বাস্থ্যসচেতনতার অভাবকেই স্পষ্ট করে।

 

করণীয়

প্রতিদিনকার ক্লান্তিকে অবহেলা নয়— বুঝে নিতে হবে কখন তা সাধারণ নয়। সঠিক সময়েই চিকিৎসা নেওয়া এবং নিজের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের খেয়াল রাখা জরুরি। বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে এই রোগ নিয়ে সচেতনতা ও স্বীকৃতির প্রয়োজন আরও বেশি।

আপনি যদি দীর্ঘদিন ধরে ব্যাখ্যাতীত ক্লান্তিতে ভুগে থাকেন, তবে একে হালকাভাবে না দেখে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। আপনি একা নন, এই সমস্যার মুখোমুখি অনেকেই— এবং সমাধান শুরু হয় সঠিক তথ্য আর সচেতনতা দিয়ে।

Visited 115 times, 1 visit(s) today