পরিকল্পিতভাবে মাজারের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ধ্বংস করা হচ্ছে

পরিকল্পিতভাবে মাজারের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ধ্বংস করা হচ্ছে
শেয়ার করুন

বিডিডি ডেস্ক

গত বছরের (২০২৪) ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পরপরই সারাদেশে ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয়। বাদ যায়নি বহু শতাব্দী প্রাচীন মাজারও। আক্রান্ত মাজারের অনেকগুলোই প্রাচীন এবং এগুলোর ঐতিহাসিক, প্রত্নতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব রয়েছে। কিছু কিছু মাজার কয়েক শতাব্দী আগে নির্মিত, যখন এ অঞ্চলে ইসলামের বিস্তার লাভ শুরু করে। ইসলামী বিশেষজ্ঞদের মতে, মাজার এবং সুফিবাদের ঐতিহ্য ইসলামের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

অথচ এই ঐতিহ্যগুলোকে ধ্বংস করার চক্রান্তে লিপ্ত হয়েছে একটি চক্র। ৫ আগস্টের আগেও কালেভদ্রে মাজারে হামলা হয়েছে, কিন্তু সরকারের ত্বরিত পদক্ষেপে তা মোকাবেলা করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু ৫ আগস্টের পরে মাজারে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়া, এসব হরহামেশা ঘটে চলছে। অপরদিকে এসবের খুব কম খবরই গণমাধ্যমে এসেছে। সরকারের অলিখিত নিষেধাজ্ঞা ও গণমাধ্যমগুলোর প্রো-পাওয়ার জার্নালিজমের মতো নোংরামির ফলে এসব খবর থেকে যাচ্ছে আড়ালে এবং গোপন।

বিডি ডাইজেস্টের অনুসন্ধানে ৫ আগস্ট থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ১০৪টি মাজারে হামলার তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়া ৭টি মাজার ও দরগায় বাৎসরিক ওরস বন্ধের তথ্যও পাওয়া গেছে।

আগস্ট – ২০২৪

৫ আগস্টেই আক্রান্ত মাজারগুলো হলো- ঢাকার তেজগাঁও কলোনি বাজারে অবস্থিত বৈরাম শাহর মাজার নামে পরিচিত বোরহান উদ্দিন বৈরাম শাহের মাজার, ঢাকার ৪৮নং হাজারীবাগে অবস্থিত হায়দার আলী শাহের মাজার, যশোরের বকুলতলায় অবস্থিত গরীব শাহ বাবার মাজার, চুয়াডাঙ্গার দামুরহুদা থানায় অবস্থিত শাহ ভালাই নামে পরিচিত সৈয়দ রেজা শাহ্ চিশতীর মাজার, খুলনার তারের পুকুর এলাকায় অবস্থিত খাজাবাবা শাহসূফী আবুল হাসান চিশতীর রওজা শরিফ, নরসিংদীর দেওয়ান শরীফ খানের মাজার, নরসিংদীর পলাশ উপজেলার পারুলিয়া গ্রামের কোপ্পা/কোফা পাগলার মাজার, দরগা বা পারুলিয়া মাজার, বিগচান আল জাহাঙ্গীর মাজার বা বিগচান আল সুরেশ্বরী মাজার বা বিগচাঁন সাধুর মাজার, নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার জালিম খার মোড়ে অবস্থিত গোলাপ শাহ মাজার, আকবর পাগলার মাজার, আয়েজ পাগলার মাজার, নারায়ণগঞ্জের রুপগঞ্জের সৈয়দ রেজা সারওয়ারের মাজার, কুমিল্লার লাকসামে অবস্থিত আশরাফনগর দরবার শরীফ (চাঁদপুরী দরবার শরিফ), মালেক দরবেশের মাজার (মালেক শাহ্ দরবার), মানিকগঞ্জের ঘিওরে অবস্থিত ওয়ায়েছিয়া দরবার শরীফ, ময়মনসিংহ জেলার গৌরীপুর উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামে অবস্থিত নুর আইসার দরবার শরীফ।

এর মধ্যে পাঁচ শতাধিক বছরের পুরোনো ঢাকার বৈরাম শাহর মাজার গুঁড়িয়ে দেয়া হয় এবং ঢাকার অপর মাজার হায়দার আলী শাহের মাজারে ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।

ঈশা খানের বংশধরদের স্মৃতিজড়িত তিন শতাধিক বছরের পুরোনো নরসিংদীর দরগা মাজার বা পারুলিয়া মাজার, কোপ্পা/কোফা পাগলার মাজার, ১০০ বছর ধরে বাৎসরিক ও সাপ্তাহিক অনুষ্ঠান চালু থাকা বিগচাঁন সাধুর মাজার, আকবর পাগলার মাজার ও আয়েজ পাগলার মাজারে ভাংচুর, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ করা হয়।

চার শতাধিক বছরের পুরোনো যশোরের গরীব শাহ বাবার মাজার, খুলনার খাজাবাবা শাহসূফী আবুল হাসান চিশতীর রওজা শরিফ, পাঁচ শতাধিক বছরের পুরোনো চুয়াডাঙ্গার সৈয়দ রেজা শাহ্ চিশতীর মাজারে ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।

কুমিল্লার চাঁদপুরী দরবার শরিফ, মালেক দরবেশের মাজার, মানিকগঞ্জের ওয়ায়েছিয়া দরবার শরীফ, ময়মনসিংহের নুর আইসার দরবার শরীফে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়। নারায়ণগঞ্জের সৈয়দ রেজা শাহ্ সারোয়ারের মাজারের দেয়াল ভেঙ্গে মাজার প্রাঙ্গণের ফুল ও ফলের গাছগুলো উপড়ে ফেলা হয়।

৫ আগস্ট থেকে শুরু হওয়া দেশের বিভিন্ন স্থানে ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন মাজার, সুফি দরবার শরীফ, পাগল-ফকিরদের মাজার ও বাউল-ফকিরদের আখড়া-আস্তানায় একেরপর এক হামলা হতে থাকে। এসব ক্ষেত্রে সরকার নির্বিকার এবং পরোক্ষ সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে বলেই মাজার সংশ্লিষ্টদের বিশ্বাস। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক মাজারের খাদেম বলেছেন, হামলায় নেতৃত্ব দিয়েছে জামায়াত, হেফাজত ও বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা। যারা ড. ইউনূস সরকারের অন্যতম সমর্থক, সুবিধাভোগী ও স্টেকহোল্ডার হিসেবে স্বীকৃত। ফলে এসব হামলার বিচারের বিষয়টি মোটামুটি নিভৃতে কাঁদবে বলেই সংশ্লিষ্টদের অনুমান। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মামলা হয়নি, সাহস করে মামলা করতে যায়নি কেউ কেউ এবং মামলা করলেও কোন ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ দেখা যায়নি গত প্রায় ১১ মাসে। ফলে মাজারের খাদেম ও মুরিদেরা আবারও যেকোন সময় হামলা হতে পারে আশঙ্কায় রয়েছে। ফলে তারা এমন আশঙ্কায় মাজারে যাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন অনেকেই।

মাজারে হামলা ৫ আগস্টেই শেষ হয়নি। এরপরেও ধারাবাহিক ও পরিকল্পিতভাবে চলছে। কোথাও কোথাও সংঘর্ষও হয়েছে। নিহত-আহতের ঘটনাও ঘটেছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শামসুল হক শাহের মাজারে ৬ ও ৭ আগস্ট দুই দফায় ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। ৭ আগস্টে চুয়াডাঙ্গার কুতুবউদ্দিন শাহ মাজার ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়।

ফরিদপুরের হযরত শাহ বদিউজ্জামান মুন্সী (রহ.) এর মাজারে অগ্নিসংযোগে কোরআন শরীফ সহ বিভিন্ন বইপুস্তক পোড়ানো হয়।

১৬ আগস্ট কুমিল্লার শাহাজাহান পাগলার মাজার বুলডেজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়। ২৫ আগস্ নারায়ণগঞ্জের আয়নাল শাহের মাজার ভেঙ্গে ধ্বংস করা হয়। ২৯ অগাস্ট একইভাবে ধ্বংস করা হয় সিরাজগঞ্জের আলী পাগলার মাজার।

এছাড়া আগস্ট মাসে আরও ৬টি মাজারে হামলার তথ্য জানা গেলেও দিন-তারিখ জানা যায়নি। এগুলো হলো- চট্টগ্রামের বার আউলিয়া মাজার, ঢাকার বাংলা একাডেমি সংলগ্ন মা জটালীর মাজার, নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার আক্কেল আলী শাহ মাজার, বাবা গোলাপ শাহের মাজার, আলিম শাহ চিশতির মাজার এবং নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলায় অবস্থিতি সনমান্দীর আয়না দরগায় হামলা, ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ এবং লুটপাট চালানো হয়।

সেপ্টেম্বর – ২০২৪

সিরাজগঞ্জের ইসমাইল পাগলার মাজার ৩ সেপ্টেম্বর ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগকরা হয়। এখানে নিয়মিত বাংসরিক ও সাপ্তাহিক অনুষ্ঠান হতো, কিন্তু এখন সব বন্ধ হয়ে গেছে।

সিরাজগঞ্জের আরও তিনটি মাজারের কবর খুঁড়ে হাড়গোড় পর্যন্ত নিয়ে যায় হামলাকারীরা। ৯ সেপ্টেম্বর হজরত বড়পীর গাউসুল আজম দরবার শরীফ (আলতাফ সাধু) প্রাঙ্গণে অবস্থিত তিনটি মাজারে ভাংচুর চালিয়ে কবর থেকে মরদেহের দেহাবশেষ নিয়ে যায় এবং মাজারের বিভিন্ন স্থাপনায় ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে।

নারায়ণগঞ্জের দেওয়ানবাগ খানকা শরীফের মাজারে ৬ সেপ্টেম্বর হামলা ও অগ্নিসংযোগ করে ধ্বংস করা হয়। এখানে ৪জন আহত হয়। দেওয়ানবাগের আরও দুটি আস্তানায় হামলা চালানো হয়। ৮ সেপ্টেম্বর ময়মনসিংহের ত্রিশালে অবস্থিত দেওয়ানবাগ দরবার শরীফে এবং ১০ সেপ্টেম্বর কুমিল্লায় খানকায়ে দেওয়ানবাগীতে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়। হামলায় ময়মনসিংহে অন্তত অর্ধ শতাধিক আহত হয়।

৭ সেপ্টেম্বর নরসিংদীর হানিফ পাগলার মাজারে হামলা ও ভাংচুর করা হয়। তখন ওরসের প্রস্তুতি চলছিল, সকল আয়োজন লুটপাট ও ধ্বংস করা হয়।

৯ সেপ্টেম্বর কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে ৬টি মাজারে একসঙ্গে ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এগুলো হলো- ইয়াজোড়া দরবার শরীফ (হিয়াজোড়া টিপুর আস্তানা), পীর গোলাম মহিনউদ্দিন ওরফে টিপুর আস্তানা (টিপুর বাপের দয়াল আবুল কাসেম মাজার), রৌশন শাহ (তেতৈয়া মাজার) মাজার, দেওয়ান শাহের মাজার, খাটাচৌ গ্রামের মাজার, খাটাচৌ শাহ জালাল মাজার শরীফ।

১০ সেপ্টেম্বরেও কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে ৯টি মাজারে ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। এগুলো হলো- সুবেদার আবদুর রহিমের মাজার, হাবিলদার আবুল কাশেমের মাজার, নিজাম উদ্দিনের কবরস্থান, আবদুল জলিলের মাজার, খানকায়ে দেওয়ানবাগী (পূর্বে উল্লেখিত), সৈয়দ আব্দুল গনি হিয়াজুড়ির মাজার (গণী শাহ মাজার), উদাম শাহ মাজার, কেরানী সাহেবের মাজার এবং প্যাটেন শাহের মাজার।

১০ সেপ্টেম্বর রাতে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে অবস্থিত হজরত হোসেন আলী শাহ ল্যাংটার মাজার (হোসেন লেংটা মাজার) এস্কেভেটর দিয়ে মাজার ও মাজার সংলগ্ন মসজিদ গুড়িয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। ওয়ি মাজারে ৭৮ বছর ধরে ওরস হয়ে আসছে, কিন্তু এখন সব নিস্তব্ধ। একদিন পরে ১১ তারিখে রূপগঞ্জে অবস্থিত আরেকটি মাজার, আলিমুদ্দিন চিশতীর মাজারে সংঘবদ্ধভাবে হামলা পরিচালনা করা হয়।

১০ সেপ্টেম্বর রাজশাহীর এটিএস এম খলিলুর রহমান আল চিশতী নিজামীর মাজার ও সিলেটের শাহ পরানের মাজারে হামলা ও ভাংচুর চালানো হয়। ১১ তারিখে রাজশাহী মহানগরীর দারুসার সরাইপুকুর এলাকায় অবস্থিত মানছুরিয়া খানকাহ শরীফে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালানো হয়।

১১ সেপ্টেম্বর দুপুরে ধামরাইয়ে অবস্থিত বুচাই পাগলার মাজার ও মাজারসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনা ভেকু দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। পরদিন ১২ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ধামরাইয়ের অপর মাজার বরকত মায়ের মাজার, যেখানে নারীদের উপস্থিতি ছিল লক্ষ্যণীয়, সেই মাজারে হামলা ও ভাংচুর চালানো হয়।

১৩ সেপ্টেম্বর শরীয়তপুরের জাজিরায় অবস্থিত ফকির করিম শাহ মাজার (আরশেদ পাগলার মাজার) এবং একই জেলার নড়িয়া উপজেলার মজিদিয়া দরবার শরিফ মাজারে (শালু শাহ মাজার) ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।

১৩ তারিখেই নোয়াখালী সদর উপজেলার লক্ষ্মীনারায়ণপুর এলাকার ফকির চাড়ু মিজি শাহ্ (র.) মাজার (দরগাহ বাড়ির মাজার) ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। গাজীপুরের পাঁচ পীরের মাজারে হামলা চালাতে গেলে মাজারের মুরিদদের সাথে আক্রমণকারীদের সংঘর্ষ বাধে এবং কয়েকজন আহত হয়, প্রতিরোধের ফলে মাজারটি রক্ষা পায়। কাছাকাছি সময়ে গাজীপুরের পোড়াবাড়ি এলাকার শাহ্ সুফি ফসিহ পাগলার মাজারে (পাগলা বাবার মাজার) এবং শাহ সুফি চাঁন মিয়া মাজারে (ফকির মার্কেট মাজার) হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। একদিনে সিলেটের খাদিমনগরে অবস্থিত শাহ সুফি আব্দুল কাইউমের মাজার ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরে অবস্থিত হযরত শাহ রাহাত আলী (রহ.) মাজারে (শাহান শাহ রাহাত আলি শাহ) হামলা চালিয়ে মাজার সংলগ্ন আস্তানায় ভাংচুর করে ১৪ সেপ্টেম্বর। ১৫ সেপ্টেম্বর গাজীপুরের ভাওয়াল মির্জাপুর বাজার এলাকার করমদী ফকিরের মাজারে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। করমদী ফকিরের মাজার একটি অতি প্রাচীন মাজার।

১৬ সেপ্টেম্বর দুপুরে কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে অবস্থিত সৈয়দ আবু মোহাম্মদ মঞ্জরুল করিমের মাজার থেকে ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে মিছিল বের হলে মাজারবিরোধীরা হামলা চালিয়ে মাজার সংলগ্ন মসজিদ ও বড়িঘর ভাংচুর করে। এতে ১জন নিহত অনেকে আহত হয়। এটি ছয়সূতি মাজার নামেও পরিচিত।

২০ সেপ্টেম্বর সকালে সুনামগঞ্জের হোসেন বখত চত্ত্বরে অবস্থিত হযরত ডংকা শাহ (রহ.) মোকামের (মাজার) সিঁড়ি ও দানবক্স ভাংচুর করে হামলাকারীরা। সেনাবাহিনীর উপস্থিতিতে হামলাকারীরা পিছু হটলেও ২০২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি রাতে আবার হামলা চালিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়।

রাজবাড়ী সদর উপজেলার দাদশী সিংগা গ্রামের শাহ পরানের মাজার ভাংচুর হয় ২৮ সেপ্টেম্বর রাতে।

২৯ সেপ্টেম্বর রাতে ওরস চলাকালে কুষ্টিয়ার চরসাদিপুরের রশিদিয়া দরবার শরীফে হামলা, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। একইদিনে ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার লালন আনন্দধাম, মানিকগঞ্জের খাজা শাহ সুফি দেওয়ান আব্দুর রশিদ আল চিশতি নিজামি (রা.) দরবার শরীফ এবং সাভারের সুফি সাধক কাজী আফসার উদ্দিনের মাজার ও বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। কাজী আফসার উদ্দিনের বাড়ি বর্তমানে তার পুত্র কাজী জাভের আহমদের বাড়ি বলেও পরিচিত।

১২ সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার শাহ্ আরেফিনের (রহ.)–এর আস্তানায় হামলার আশঙ্কায় গানবাজনা নিষিদ্ধ করে দেয় স্থানীয় প্রশাসন।

অক্টোবর – ২০২৪

ময়মনসিংহ জেলার তারাকান্দা উপজেলার বিসকা গ্রামের শাহ মোহাম্মদ আবদুর রহমান ভান্ডারীর মাজার হামলার শিকার হয় ৮ অক্টোবর।

হামলা, ভাংচুর, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও গুঁড়িয়ে দেওয়ার মহোৎসবের মধ্যে অক্টোবর মাস কিছুটা বিরত ছিল।

নভেম্বর – ২০২৪

টাঙ্গাইল সদর উপজেলার চরপৌলী এলাকার বেলাল পীরের মাজারে ২২ নভেম্বর হামলা, ভাংচুর ও লুটপাট চালানো হয়।

২৩ নভেম্বর নরসিংদীর দিলালপুরে অবস্থিত আমিনুল হক পাগলার আস্তানায় হামলা চালিয়ে উচ্ছেদ করা হয়।

২৫ নভেম্বর যশোরের মনিরামপুরের সর্বজনীন তীর্থধামে সাধুসঙ্গ চলাকালে হামলা চালানো হয়।

শেরপুর সদর উপজেলার মুর্শিদপুর দরবার শরীফে চারদিনব্যাপী ওরস চলাকালে ২৬ নভেম্বর হামলা চালিয়ে ভাংচুর ও লুটপাট চালানো হয়। এখানে মাজারের মুরিদেরা প্রতিরোধ করতে গিয়ে আহত হয়।

ডিসেম্বর – ২০২৪

নেত্রকোনার আটপাড়ায় ২৫ ডিসেম্বর নুরাই পীরের মাজারে হামলা ও ভাংচুর চালিয়ে ওরস বন্ধ করে দেয়া হয়। ডিসেম্বরের ৩০ তারিখে নাটোরের লোচনগড় গ্রামে অবস্থিত আল চিশতী মাজারে ওরসের প্রস্তুতিকালে হামলা চালানো হয়।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ডিসেম্বরের ৩১ তারিখ পর্যন্ত ৮৪টি পীরের মাজার, দরগা ও আস্তানায় হামলা চালানো হয়। এছাড়াও একটি মাজারে হামলার আশঙ্কায় গানবাজনা নিষিদ্ধ করে দেয় খোদ প্রশাসন।

২০২৫ সালেও একইভাবে হামলা, ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, গুঁড়িয়ে দেয়া, সংঘর্ষ চলছে। তাছাড়াও প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাজারের স্বাভাবিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার ঘটনাও ঘটছে। যেখানে প্রশাসনের দায়িত্ব হলো নিরাপত্তা দেয়া, সেখানে নিরাপত্তা না দিয়ে উল্টা নিষিদ্ধ করে দিচ্ছে।

জানুয়ারি – ২০২৫

জানুয়ারি মাসের ৮ তারিখে ময়মনসিংহ শহরের সৈয়দ কালু শাহ মাজারে ওরস চলাকালে হামলা করা হয়। ১০ জানুয়ারি পঞ্চগড় সদরের মজিবর রহমান সিদ্দিকীর মাজারে হামলা, ভাংচুর ও লুটপাট চালানো হয়।

ঢাকার ধামরাই উপজেলার শুকুর আলী শাহ ফকিরের মাজারে ২৩ জানুয়ারি সন্ধ্যায় ওরস চলাকালে হামলা ও ভাংচুর চালানো হয়।

জানুয়ারি মাসে নরসিংদী জেলাতেই ৭টি মাজারে হামলা ও ভাংচুরের ঘটনা ঘটে। ২৩ জানুয়ারি নরসিংদী সদরের করিমপুর গ্রামের খেতা শাহের মাজারে, ২৪ জানুয়ারি দড়ীনবিপুর গ্রামের শাহ সুফি হযরত হকসাব শাহ (হক পাগলা) মাজারে, কালাইগোবিন্দপুর গ্রামের শাহ সুফি হযরত ফজলু শাহের মাজারে, চম্পকনগর গ্রামের মোহাম্মদ আলী মুন্সীর মাজারে, শ্রীনগর গ্রামের শাহ সুফি হযরত আইয়ুব আলী শাহের আস্তানা এবং মনোহরদী উপজেলার খোটমোড়া গ্রামের হানিফ শাহের মাজারে হামলা চালিয়ে ভাংচুর করা হয়।

ফেব্রুয়ারি – ২০২৫

৯ ফেব্রুয়ারি দুপুরে গাজীপুরের শ্রীপুরের হেরাবন পাক দরবার শরীফের পীর সাহেবকে মাওরধর করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হয়।

১৭ ফেব্রুয়ারি নোয়াখালীর চাটখিলের মধু দরবেশের মাজার ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দেয়া হয় এবং ২০ ফেব্রুয়ারি সদর উপজেলার মুন্সির তালুক গ্রামে অবস্থিত আইয়ুব আলী দরবেশের মাজারে ওরস চলাকালে হামলা চালিয়ে মাজার ও প্যান্ডেল গুড়িয়ে দেয় এবং অগ্নিসংযোগ করে। ১৯ ফেব্রুয়ারি রাতে কক্সবাজারের পেকুয়ায় সৈয়দ মুহাম্মদ শায়ের মুহাম্মদ শাহ আল কাদেরী আল চিশতীর মাজারে ওরস চলাকালে হামলা ও ভাংচুর চালানো হয়।

মানিকগঞ্জের সিংগাইরে রশিদ সরকারের মাজারে ২১ ফেব্রুয়ারি সকালে ওরস উদযাপনে বাধা দেয়ায় দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয় এবং ওরস পণ্ড হয়ে যায়।

মার্চ – ২০২৫

১ মার্চ দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে রহিম ভান্ডারীর মাজারে দিনেদুপুরে ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। ৩ মার্চ রাতে নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় শাহ নেওয়াজ ফকিরের (ল্যাংটা ফকির) মাজারে ভাংচুর চালানো হয়।

৭ মার্চ হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জের হেকিম শাহের মাজারে হামলা করতে গেলে দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়।

বরগুনার আমতলীতে ওরস চলাকালে ইসমাইল শাহের মাজারে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয় ১৭ মার্চ।

এপ্রিল – ২০২৫

১৩ এপ্রিল ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার রাঙ্গামাটিয়া গ্রামের নূরাই পীরের দরগাহে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়।

এপ্রিলের পরে মাজারে হামলার খবর পাওয়া যায়নি। তবে মাজারের ওপরে হুমকি রয়েছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। যার ফলে মাজারগুলো নীরব, নিস্তব্ধ ও লোকশূন্য একেকটি সাধারণ কবর মাত্র!

মানবাধিকার সংগঠন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) এর ১ অক্টোবরের প্রতিবেদনে জানা যায়, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর এই দুই মাসে মাজারে হামলায় অন্তত একজন নিহত ও ৪৩ জন আহত হয়েছেন।

আমাদের অনুসন্ধানে জানা গেছে গাজীপুরের পোড়াবাড়ীর ফসিহ পাগলার মাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সামছু পাগলার মাজার, সুনামগঞ্জের ডংকা শাহের মাজার এবং নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের সৈয়দ রেজা সারওয়ারের মাজারসহ বেশ কয়েকটি মাজারে একাধিকবার হামলা হয়েছে এবং কয়েকটি মাজার বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কয়েকটি মাজারে ভক্তদের জোরপূর্বক চুল-দাড়ি ছেঁটে প্রকাশ্যে অপমান করা হয়েছে।

ইসলামী মরমীবাদের পরম্পরাগুলো তরিকা বা সিলসিলা নামে পরিচিত। প্রতিটি তরিকার মধ্যে পীর, ফকির ও পাগল ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন সাধক দেখা যায়। আবার কলন্দরিয়া ও মাদারী তরিকা মূলত পাগলদের তরিকা। সেমেটিক ও ভারতীয় ঐতিহ্যে প্রাচীনকাল থেকে সাধকদের মধ্যে পাগলপন্থা একটি প্রবহমান ধারা।

সবধরনের সামাজিকতা আর বিধি-বিধানকে পাশ কাটিয়ে স্রষ্টার প্রেমে মগ্ন পাগলদের সুফি পরিভাষায় বলা হয় ‘মজ্জুব’। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ইসলামী ঐতিহ্যের মরমী ধারার চার ধরনের প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে পাগল-ফকিরদের, বিশেষ করে পাগলদের মাজার। যেখানে ধর্ম-বর্ণ, লিঙ্গ নির্বিশেষে সবার প্রবেশাধিকার এবং প্রার্থনার অংশ হিসেবে নিয়মিত সংগীতচর্চা ছিল। অনুষ্ঠিত হতো বাৎসরিক ওরস ও মেলা।

মাজারের নিজস্ব সংস্কৃতি আছে। এখানে ভক্তিবাদী সাংস্কৃতিক আবহ বিরাজ করে। মাজারে সব ধর্মের, সব বর্ণের এবং নারী-পুরুষ সকল মানুষ মিলিত হয়। যার যেভাবে মন চায়, সেভাবেই প্রার্থনা করে। কোনো ধর্মীয় কঠোরতা নেই। মাজার হচ্ছে আধ্যাত্মিক মুক্তাঞ্চল। মাজার ভাঙার মাধ্যমে সংগীতচর্চা বন্ধ, নারীদের প্রবেশ ও ভক্তি প্রকাশে বাধা দেওয়া হচ্ছে। জোর করে ভিন্ন তরিকা চাপিয়ে দিতে ব্যর্থ হয়েই মাজার ভাংতে শুরু করেছে একশ্রেণির মানুষ এবং মাজারের নিজস্ব সংস্কৃতি ধ্বংসের পায়তারা করছে।

৫ আগস্টের পরে মাজারে হামলা প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অধ্যাপক বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে যে সরকার ক্ষমতায় রয়েছে তারা মূলত উগ্র ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তির সমর্থনপুষ্ট। ফলে এরকম সরকারের আমলে সুফিবাদী ঘরানা, নারী, মুক্তচিন্তা, বাকস্বাধীনতা, অসাম্প্রদায়িকতা এবং শুধু ধর্মীয় সংখ্যালঘু নয় বরং উগ্র ডানপন্থীদের সাথে দ্বিমত পোষণকারী মুসলমানেরাও আক্রান্ত হচ্ছে এবং হবে। উদ্বেগ ও আশকার হলেও এটাই স্বাভাবিক পরিণতি।

 

Visited 459 times, 1 visit(s) today