নোয়াখালী প্রতিনিধি। হাতিয়া, ২৭ জুলাই ২০২৫।
নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় অমাবস্যা ও বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের প্রভাবে অস্বাভাবিক জোয়ারের পানিতে বেড়িবাঁধ ভেঙে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে উপকূলীয় এলাকার হাজারো মানুষের জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। প্রায় তিন কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বসতঘর, ফসলি জমি, মাছের ঘের ও রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে গেছে। তবে দুই দিন বন্ধ থাকার পর রোববার (২৭ জুলাই) সকাল থেকে হাতিয়ার সঙ্গে নৌ-যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়েছে এবং নিঝুম দ্বীপসহ নিম্নাঞ্চল থেকে পানি নামতে শুরু করেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার (২৫ জুলাই) থেকে শনিবার (২৬ জুলাই) পর্যন্ত অস্বাভাবিক জোয়ার ও টানা বৃষ্টির ফলে হাতিয়ার সুখচর, নলচিরা, চরইশ্বর, সোনাদিয়া ও নিঝুম দ্বীপের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। উপজেলার মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন দমারচর, ঢালচর, চরগাসিয়া, নলের চর, বয়ার চর, চর আতাউর ও মৌলভীর চরের মতো চরাঞ্চলগুলোতেও জোয়ারের পানি প্রবেশ করেছে। সুখচর ইউনিয়নের ২, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডসহ অধিকাংশ এলাকায় বসতঘর, রান্নাঘর, আঙিনা, রাস্তাঘাট ও মাছের ঘের পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। কিছু কিছু এলাকায় হাঁটু থেকে কোমর পর্যন্ত পানি জমে আছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) নোয়াখালী কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হালিম সালেহী জানান, অমাবস্যা ও নিম্নচাপের প্রভাবে উচ্চ জোয়ারে তুপানিয়া, আল-আমিন গ্রাম ও নলচিরা এলাকায় প্রায় তিন কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। নদী ভাঙনের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় টাংকির ঘাট ও চেয়ারম্যান ঘাট এলাকায় অর্ধশতাধিক বাড়ি-ঘর সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ইউসুফ মাঝি বলেন,
“জোয়ারের পানি বেড়িবাঁধ ভেঙে লোনা পানি কৃষি জমি ও মাছের ঘেরে প্রবেশ করেছে। নদীর পাড়ে ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পুরো এলাকা হুমকির মুখে পড়বে।”
অস্বাভাবিক জোয়ারের ফলে হাতিয়ার নিম্নাঞ্চলের হাজারো পরিবার চরম দুর্ভোগে পড়েছে। ফসলি জমি, মাছের ঘের ও কাঁচা বাড়ি-ঘরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। নিঝুম দ্বীপের নামার বাজার এলাকা প্লাবিত হওয়ায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে পড়েছে এবং অনেক পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। স্থানীয়রা জানান, নিঝুম দ্বীপ জাতীয় উদ্যানের হরিণসহ বন্যপ্রাণীরা এই দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় হুমকির মুখে রয়েছে।
নিঝুম দ্বীপের বাসিন্দা রাজু বলেন,
“আমাদের বাড়িঘরে পানি উঠেছে, ফসলি জমি নষ্ট হয়ে গেছে। এই দুর্যোগে হাজারো পরিবার দুর্ভোগে পড়েছে। বিশেষ করে নিঝুম দ্বীপে বেড়িবাঁধ না থাকায় স্বাভাবিক জোয়ারেও পানি ঢোকে, আর এই অস্বাভাবিক জোয়ারে পানি সহজে নামছে না।”
জেলা আবহাওয়া কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম জানান, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের প্রভাবে উপকূলীয় অঞ্চলে দমকা হাওয়া ও গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নোয়াখালীতে ৫১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারগুলোকে উপকূলের কাছাকাছি থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
দুই দিন বন্ধ থাকার পর রোববার সকাল ৮টা থেকে হাতিয়ার সঙ্গে নৌ-যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়েছে। চেয়ারম্যান ঘাট থেকে যাত্রী নিয়ে সীট্রাক নলচিরা ঘাটে পৌঁছেছে এবং দুপুরে নলচিরা ঘাট থেকে একটি যাত্রীবাহী ট্রলার চেয়ারম্যান ঘাটে ফিরেছে। এতে দ্বীপের বাসিন্দাদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। তবে, প্লাবিত এলাকায় পানি নামতে শুরু করলেও ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধের সংস্কার না হওয়া পর্যন্ত দুর্ভোগ কমবে না বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
জেলা শহর ও অন্যান্য উপজেলায় জলাবদ্ধতা
হাতিয়ার পাশাপাশি, গত দুই দিনের টানা বৃষ্টিপাতে জেলা শহর মাইজদীসহ সদর, বেগমগঞ্জ, সেনবাগ ও কবিরহাট উপজেলার নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। নোয়াখালী পৌরসভার ড্রেন ও খালে ময়লা-আবর্জনা জমে থাকায় পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হচ্ছে, যা জনদুর্ভোগকে আরও তীব্র করেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার না করায় এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আলাউদ্দিন জানান, জোয়ারের পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধের সংস্কার কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, “সুখচর, সোনাদিয়া ও নিঝুম দ্বীপের কিছু গ্রামে ২-৩ ফুট পানি জমে আছে। শুক্রবার সুখচরের একটি বেড়িবাঁধ ভেঙে প্লাবন তীব্র হয়। আমরা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করছি এবং সরকারি সহায়তার জন্য ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নিরূপণ করা হচ্ছে।”
জেলা প্রশাসক দেওয়ান মাহবুবুর রহমান জানান, হাতিয়াসহ উপকূলীয় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সরকারি ত্রাণ সহায়তা পৌঁছানোর জন্য বিভিন্ন দপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়াতে প্রশাসন কাজ করছে। স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের বিষয়টি উচ্চ পর্যায়ে জানানো হয়েছে।”
স্থানীয়রা দীর্ঘমেয়াদী সমাধান হিসেবে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন। হাতিয়ার সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আলী বলেন, “ঘূর্ণিঝড় রিমালের পর এবারের নিম্নচাপে হাতিয়ার মানুষ আবারও বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। ত্রাণের চেয়ে এখানকার মানুষ স্থায়ী বেড়িবাঁধ চায়। এ বিষয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে আলোচনা করা হয়েছে।”
নোয়াখালীর হাতিয়ায় অস্বাভাবিক জোয়ার ও বেড়িবাঁধের ক্ষতির ফলে সৃষ্ট প্লাবন পরিস্থিতি উপকূলীয় জনজীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। ফসল, মাছের ঘের ও বাড়িঘরের ক্ষয়ক্ষতি স্থানীয় অর্থনীতি ও জীবিকার ওপর বড় ধরনের আঘাত হেনেছে। যদিও নৌ-যোগাযোগ পুনরুদ্ধার ও পানি নামতে শুরু করায় কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে, তবুও স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি মিলবে না বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। প্রশাসনের তৎপরতা ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এই সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
