জামায়াতের শীর্ষ ৫ নেতার কানাডার ভিসা চেয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নতজানু দরখাস্ত

জামায়াতের শীর্ষ ৫ নেতার কানাডার ভিসা চেয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নতজানু দরখাস্ত
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি ও বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসী ও উগ্র সাম্প্রদায়িক সংগঠন হিসেবে পরিচিত জামায়াতে ইসলামী নেতাদের কানাডা ভ্রমণের ভিসা দিতে সরকারের সুপারিশ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচনা সৃষ্টি করেছে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর রাজনৈতিক মহল, নাগরিক সমাজ এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো ক্ষোভ ও শঙ্কা প্রকাশ করছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সহকারী সচিব (কনস্যুলার) মো. মঊদুদ হাসানের স্বাক্ষরিত এক সরকারি চিঠিতে (স্মারক নং: ১৯.০০.০০০০.৫৩০.৩২.০০৬.২০২৫/০৩৬৯৬, তারিখ: ১১ আগস্ট ২০২৫) জামায়াতে ইসলামীর আমীর মো. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি প্রতিনিধিদলকে কানাডা সফরের জন্য ভিসা প্রদানের অনুরোধ জানানো হয়।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, তারা ২৫শে অক্টোবর থেকে ৩১শে অক্টোবর ২০২৫ অথবা এর কাছাকাছি সময়ে সরকারি কাজে কানাডা সফরে যাবেন। সফরসঙ্গীদের মধ্যে রয়েছেন—

১. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, সহকারী আমীর (সহ-সভাপতি), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
২. আহসানুল মাহবুব যুবায়ের, সহকারী মহাসচিব, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
৩. মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসান, বৈদেশিক বিষয়ক উপদেষ্টা আমীর-এ-জামাত।
৪. মোহাম্মদ নাজরুল ইসলাম, আমীর-এ-জামাতের ব্যক্তিগত সচিব।

চিঠিতে ঢাকাস্থ কানাডা হাইকমিশনকে অনুরোধ করা হয়েছে তাদের ভিসা প্রদানের প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে।

এই সুপারিশকে “নতজানু কূটনীতি” আখ্যা দিয়ে বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি বাংলাদেশের জন্য কেবল লজ্জাজনক নয়, বরং কূটনৈতিকভাবে ক্ষতিকরও হতে পারে। স্বাধীনতাবিরোধী ও যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত একটি দলের নেতাদের সরকারিভাবে বিদেশ ভ্রমণের জন্য ভিসা চাওয়ার অর্থ হলো তাদের আন্তর্জাতিক বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা।

একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, “এটি সরকারের দ্বিচারিতার চরম প্রমাণ। একদিকে দেশে উগ্রবাদ দমন ও জঙ্গিবাদ মোকাবিলার কথা বলা হয়, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জামায়াতের জন্য দরজা খোলার চেষ্টা চলছে। এতে দেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, পশ্চিমা বিশ্বের অনেক দেশ বহু আগেই জামায়াত নেতাদের ভিসা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। কারণ, এই দলটি যুদ্ধাপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছে, উগ্র সাম্প্রদায়িক রাজনীতি চর্চা করেছে এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে উগ্রপন্থী নেটওয়ার্কের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকেছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কানাডার মতো একটি গণতান্ত্রিক দেশে তাদের প্রবেশাধিকারের সুপারিশকে নাগরিক সমাজ “বিপজ্জনক অঙ্গীকার” হিসেবে দেখছে।

স্বাধীনতাবিরোধীদের বৈধতা দেওয়ার প্রচেষ্টা

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতা করেছিল জামায়াতে ইসলামী। স্বাধীনতার পর থেকে দলটি যুদ্ধাপরাধীদের রাজনৈতিক পুনর্বাসনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত এই উগ্র সাম্প্রদায়িক সংগঠনকে ভিসা প্রদানের জন্য সরকার যখন লিখিত সুপারিশ পাঠায়, তখন তা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়।

একজন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “যারা এই দেশটিকে স্বীকৃতি দিতে চায়নি, মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করেছে, তাদের আজ সরকারিভাবে বিদেশ ভ্রমণে সাহায্য করা হচ্ছে। এটা জাতির প্রতি চরম অবমাননা।”

বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ কানাডার মতো পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে বাংলাদেশের অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। একদিকে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে উগ্রবাদ দমনে সহযোগিতা চায়, অন্যদিকে একইসঙ্গে উগ্র সাম্প্রদায়িক সংগঠনকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করলে তা কূটনৈতিকভাবে প্রতিকূল পরিস্থিতি তৈরি করবে।

কূটনৈতিক মহল মনে করছে, কানাডা হাইকমিশন ভিসা প্রদানে অনীহা দেখাতে পারে। কেননা কানাডার নীতি বরাবরই উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোর। এমনকি যদি কানাডা ভিসা না-ও দেয়, তবু বাংলাদেশের সরকারি সুপারিশই দেশের ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

বাংলাদেশ সরকার কেন জামায়াত নেতাদের জন্য ভিসা প্রদানে সুপারিশ করল, তা নিয়ে এখনো কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। তবে সমালোচকরা মনে করছেন, এটি সরকারের রাজনৈতিক দ্বিচারিতার আরেকটি উদাহরণ, যা দেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

Visited 9 times, 1 visit(s) today