মতামত || বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সংকট: ভুল বিপ্লবের প্রভাব না সঠিক বিপ্লবের ভুল পক্ষের ক্ষমতায়ন?

মতামত || বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সংকট: ভুল বিপ্লবের প্রভাব না সঠিক বিপ্লবের ভুল পক্ষের ক্ষমতায়ন?
শেয়ার করুন

মৃন্ময় সেন

লালবাগ কেল্লায় উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর জন্মদিন উদযাপনের অনুষ্ঠান ঘিরে একটি উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে। একদল হুজুর গেট বন্ধ করে অনুষ্ঠানকে ‘নাচ-গান’ বলে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। যদিও পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে এবং উস্তাদের প্রপৌত্র সিরাজ আলী খাঁর ক্লাসিক্যাল সঙ্গীত পরিবেশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানটি সম্পন্ন হয়েছে, এই ঘটনা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জীবনে গভীর প্রশ্ন তুলেছে।

গত বছরের জুলাই সন্ত্রাসের পর থেকে ইসলামিক জলসা, কাওয়ালি, এমনকি পাকিস্তানি ব্যান্ডের কনসার্টের উত্থান দেখা গেলেও, জেমস, ফুয়াদ, আরাফাতের মতো শিল্পীদের অনুষ্ঠান একে একে বাতিল হচ্ছে। উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর জন্মদিনের অনুষ্ঠানে বাধা এই ধারার সর্বশেষ উদাহরণ। প্রশ্ন উঠছে: এটি কি ভুল বিপ্লবের প্রভাব, নাকি সঠিক বিপ্লবের ভুল পক্ষের ক্ষমতায়ন?

জুলাই আন্দোলনকে অনেকে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে একটি টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে দেখেছিল। শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে ছাত্ররা স্বচ্ছতা, স্বাধীনতা এবং বৈচিত্র্যের স্বপ্ন দেখিয়েছিল। কিন্তু এই বিপ্লব কি সত্যিই ভুল ছিল? যদি তাই হয়, তবে কেন লালন মেলা বাতিল হচ্ছে, সুফি সমাধি ধ্বংস হচ্ছে, আর ক্লাসিক্যাল সঙ্গীতের মতো সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ‘ধর্মবিরোধী’ বলে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে?

এই প্রশ্নের উত্তরে কেউ কেউ বলতে পারেন, বিপ্লবের লক্ষ্য ছিল সঠিক, কিন্তু এর ফলাফল অপ্রত্যাশিতভাবে রক্ষণশীল শক্তির উত্থান ঘটিয়েছে।

জামায়াতে ইসলামী-সদৃশ দলগুলো, যারা দীর্ঘদিন ধরে কোণঠাসা ছিল, এখন রাজনৈতিক ও সামাজিক মঞ্চে প্রভাব বিস্তার করছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, বিপ্লবটি ভুল ছিল কারণ এটি একটি শূন্যতা তৈরি করেছে, যা ইসলামিস্টদের দ্বারা পূর্ণ হচ্ছে। তবে, এই যুক্তি পুরোপুরি সঠিক নয়, কারণ বিপ্লবের মূল লক্ষ্য—একনায়কতন্ত্রের অবসান—অর্জিত হয়েছে। সমস্যাটি লক্ষ্যে নয়, বরং তার বাস্তবায়ন ও পরবর্তী শাসনব্যবস্থায়।

আরেকটি দৃষ্টিকোণ হলো, বিপ্লবটি সঠিক ছিল, কিন্তু এর ফলে ভুল পক্ষ ক্ষমতার কাছাকাছি চলে এসেছে।

অন্তর্বর্তী সরকার, ড. ইউনূসের নেতৃত্বে, এখনও রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। এই শূন্যতায় ইসলামিস্ট গোষ্ঠী এবং মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের একাংশ, যারা বিপ্লবের সময় মন্দির-গির্জা রক্ষায় ভূমিকা রেখেছিল, এখন রক্ষণশীল রাজনৈতিক দলগুলোর হাতে ভোটব্যাঙ্কে পরিণত হয়েছে। তাদের প্রভাবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো বাতিল হচ্ছে, তসলিমা নাসরিনের বইয়ের স্টল ভাঙা হচ্ছে, এবং মাইনরিটি সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা বাড়ছে। এটি কোনো সুসংগঠিত ‘ইসলামিস্ট জয়’ নয়; বরং এটি একটি অরাজকতার ফল, যেখানে সরকারের দুর্বল শাসন রক্ষণশীল মবগুলোকে সুযোগ দিচ্ছে।

উদাহরণস্বরূপ, লালবাগ কেল্লার ঘটনায় পুলিশের দ্রুত হস্তক্ষেপে অনুষ্ঠানটি রক্ষা পেয়েছে, যা প্রমাণ করে যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এখনও কার্যকর হতে পারে। কিন্তু এই ধরনের হস্তক্ষেপ যদি নিয়মিত না হয়, তবে ভুল পক্ষের ক্ষমতায়ন আরও প্রকট হবে।

কী হচ্ছে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যময়তার?

উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সঙ্গীত ছিল ধর্ম-নিরপেক্ষতার প্রতীক, যা হিন্দুস্তানি রাগের মাধ্যমে ইসলাম, হিন্দু ধর্ম এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে একত্রিত করেছিল। এই ঐতিহ্যকে ‘ধর্মবিরোধী’ বলে আক্রমণ করা কেবল সেক্যুলারিজম নয়, ইসলামের নিজস্ব বৈচিত্র্যের ওপরও আঘাত।

এই প্রবণতা যদি অব্যাহত থাকে, তবে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আত্মা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে, এটিকে ইসলামিস্টদের ‘জয়’ বলা অতিসরলীকরণ হবে। এটি বরং সঠিক বিপ্লবের অসম্পূর্ণ বাস্তবায়নের ফল। আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল সহনশীলতার জন্য, কিন্তু রাষ্ট্রের দুর্বলতার কারণে ভুল পক্ষ এখন মাথাচাড়া দিচ্ছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। লালবাগের ঘটনা দেখিয়েছে, পুলিশি হস্তক্ষেপ কার্যকর হতে পারে। ছাত্রদের, যারা বিপ্লবের মূল শক্তি, তাদের আবার সামনে আনতে হবে—তারা রক্ষণশীলতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে। ২০২৬-এর নির্বাচনের আগে যদি এই শূন্যতা পূরণ করা না যায়, তবে বিপ্লবের স্বপ্ন বিপন্ন হবে। উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর সঙ্গীত আমাদের মনে করিয়ে দেয়: বাংলাদেশের আত্মা বৈচিত্র্যে, সহনশীলতায়। এই আত্মাকে রক্ষা করতে হলে ভুল পক্ষের ক্ষমতায়ন বন্ধ করতে হবে—না হলে সঠিক বিপ্লবও ‘ভুল’ বলে ইতিহাসে লেখা হয়ে যাবে।

Visited 6 times, 1 visit(s) today