যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার তেল খাতে অন্তত ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন। তবে হোয়াইট হাউসে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ তেল কোম্পানিগুলোর নির্বাহীরা এই প্রস্তাবে সতর্ক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। এক্সন মবিলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড্যারেন উডস স্পষ্টভাবে বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ভেনেজুয়েলা “বিনিয়োগের অযোগ্য”।
বৈঠকে উপস্থিত তেল কোম্পানির কর্মকর্তারা স্বীকার করেন, বিপুল তেল ও গ্যাস মজুতের কারণে ভেনেজুয়েলা সম্ভাবনাময় একটি দেশ। তবে তারা বলেন, বিনিয়োগের জন্য দেশটির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন। ফলে বৈঠক শেষে কোনো বড় আর্থিক প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়নি।
গত ৩ জানুয়ারি রাজধানী কারাকাসে অভিযানের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপসারণের পর ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ভেনেজুয়েলার তেল শিল্পকে নতুন করে উন্মুক্ত করা হবে। তিনি বলেন, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম আরও কমবে।
তবে তেল খাতের শীর্ষ নির্বাহীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এক্সনের প্রধান বলেন, অতীতে দুইবার ভেনেজুয়েলায় তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। এমন অভিজ্ঞতার পর তৃতীয়বার সেখানে বিনিয়োগ করতে হলে মৌলিক ও বাস্তব পরিবর্তন অপরিহার্য। তার ভাষায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশটি বিনিয়োগের জন্য উপযুক্ত নয়।
ভেনেজুয়েলার সঙ্গে আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোর সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই জটিল। এক শতাব্দীরও বেশি আগে দেশটিতে তেল আবিষ্কারের পর থেকে জাতীয়করণ, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং নিষেধাজ্ঞার কারণে বিদেশি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র বড় তেল কোম্পানি হিসেবে শেভরন সেখানে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি স্পেন ও ইতালির কয়েকটি কোম্পানিও সীমিত আকারে উৎপাদনে যুক্ত রয়েছে।
ট্রাম্প জানিয়েছেন, কোন কোম্পানি ভেনেজুয়েলায় কাজ করবে তা তার প্রশাসনই নির্ধারণ করবে। তিনি স্পষ্ট করেন, তেল কোম্পানিগুলো সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করবে, ভেনেজুয়েলা সরকারের সঙ্গে নয়।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রিতে বাধা সৃষ্টি করা কিছু নিষেধাজ্ঞা ধাপে ধাপে শিথিল করার বিষয়ে কাজ চলছে। তবে একই সঙ্গে তেল বিক্রির ওপর যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে, যাতে অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা যায়। ইতোমধ্যে নিষেধাজ্ঞাভুক্ত তেল বহনকারী কয়েকটি ট্যাংকার জব্দ করা হয়েছে এবং বিক্রির অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন হিসাবে জমা দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
শুক্রবার ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছেন, যার মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার তেল থেকে প্রাপ্ত অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের কোষাগারে সংরক্ষিত থাকলেও তা যেন কোনো আদালত জব্দ করতে না পারে—সেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। হোয়াইট হাউসের মতে, এতে ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টা সুরক্ষিত থাকবে।
দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগের অভাব, অব্যবস্থাপনা এবং নিষেধাজ্ঞার কারণে ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে গেছে। বর্তমানে দৈনিক উৎপাদন প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল, যা বৈশ্বিক সরবরাহের এক শতাংশেরও কম। শেভরন উৎপাদন বাড়ানোর আশাবাদ ব্যক্ত করেছে, অন্যদিকে এক্সন পরিস্থিতি মূল্যায়নে প্রযুক্তিগত দল পাঠানোর পরিকল্পনা করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তবে তেল উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে সময়, স্থিতিশীলতা এবং বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন। তাদের ধারণা, তেল কোম্পানিগুলো আপাতত রাজনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় সমর্থনসূচক বক্তব্য দিলেও বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগে এখনো প্রস্তুত নয়।
