ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত

ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে। এই চুক্তিকে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেইয়েন “সবচেয়ে বড় বাণিজ্য চুক্তি” বা “মাদার অফ অল ডিলস” হিসেবে অভিহিত করেছেন। এর ফলে প্রায় ২০০ কোটি মানুষের একটি বিশাল মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল গড়ে উঠবে, যা বিশ্বের মোট জিডিপির প্রায় এক-চতুর্থাংশেরও বেশি অংশকে অন্তর্ভুক্ত করবে।

নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ভারত-ইইউ শীর্ষ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, উরসুলা ফন ডার লেইয়েন এবং ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট অ্যান্তোনিও কোস্তা যৌথভাবে এই ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন। প্রধানমন্ত্রী মোদী এটিকে “ঐতিহাসিক মাইলফলক” বলে বর্ণনা করে বলেন, এই চুক্তি ভারতের ১৪০ কোটি মানুষ এবং ইউরোপের লক্ষ লক্ষ নাগরিকের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে।

প্রায় দুই দশক ধরে চলমান আলোচনার অবসান ঘটিয়ে এই চুক্তি সম্পন্ন হলো। ২০০৭ সালে শুরু হওয়া আলোচনা ২০১৩ সালে স্থগিত হয়ে যায়। কিন্তু ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের পরিপ্রেক্ষিতে আবার শুরু হয় এবং সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর শুল্ক নীতির কারণে দ্রুত অগ্রগতি ঘটে। গতকাল (২৬ জানুয়ারি) পর্যন্ত শেষ মুহূর্তের আলোচনায় ইইউ-এর কার্বন বর্ডার ট্যাক্সের মতো বিষয়গুলো নিয়ে সমঝোতা হয়।

চুক্তির মূল বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে রয়েছে:

– ইইউ থেকে ভারতে রপ্তানি হওয়া পণ্যের ৯৬.৬ শতাংশের ওপর আরোপিত শুল্ক সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে তুলে নেওয়া হবে। এর ফলে ইউরোপীয় রপ্তানিকারকদের বছরে প্রায় ৪ বিলিয়ন ইউরো (প্রায় ৪.৭৪ বিলিয়ন ডলার) শুল্ক সাশ্রয় হবে।
– গাড়ির ওপর শুল্ক ধাপে ধাপে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে, সঙ্গে বছরে ২.৫ লক্ষ গাড়ির কোটা থাকবে।
– বিমান ও মহাকাশযানের প্রায় সব পণ্যের শুল্ক তুলে নেওয়া হবে।
– ওয়াইনের শুল্ক ২০-৩০ শতাংশ, স্পিরিটসের ৪০ শতাংশ এবং বিয়ারের ৫০ শতাংশে নামানো হবে। ফলের রস ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের শুল্ক পুরোপুরি তুলে নেওয়া হবে।
– যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক দ্রব্য, ওষুধ ইত্যাদি ক্ষেত্রে ইইউ-এর বড় সুবিধা হবে।
– আর্থিক ও সমুদ্র পরিবহন সেবা খাতে ইইউ প্রদানকারীদের ভারতের বাজারে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

ভারতের জন্য এই চুক্তি টেক্সটাইল, রত্ন ও অলঙ্কার, চামড়াজাত পণ্যের মতো রপ্তানি খাতে বড় সুযোগ তৈরি করবে। ইইউ-এর প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ ভারতে প্রবাহিত হবে। ২০৩২ সালের মধ্যে ইইউ-এর ভারতে রপ্তানি দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বর্তমানে ভারত ও ইইউ-এর মধ্যে পণ্য বাণিজ্য প্রায় ১২০ বিলিয়ন ইউরো এবং সেবা বাণিজ্য ৬০ বিলিয়ন ইউরো। গত দশকে পণ্য বাণিজ্য প্রায় ৯০ শতাংশ বেড়েছে।

এই চুক্তি আইনি পর্যালোচনার পর ৫-৬ মাসের মধ্যে স্বাক্ষরিত হবে এবং স্বাক্ষরের এক বছরের মধ্যে কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, ভূ-রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। ইইউ রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা কমাতে চাইছে এবং ভারত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক চাপের মুখে নতুন বাজার খুঁজছে। এছাড়া ভারত-ইইউ-এর মধ্যে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বও শুরু হয়েছে।

এই চুক্তি ইইউ-এর মার্কোসুর, ইন্দোনেশিয়া, মেক্সিকো, সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে সাম্প্রতিক চুক্তি এবং ভারতের যুক্তরাজ্য, নিউজিল্যান্ড, ওমানের সঙ্গে চুক্তির ধারাবাহিকতায় এসেছে। বিশ্ব বাণিজ্যে নতুন গতিশীলতা তৈরি করবে এই ঐতিহাসিক সমঝোতা।

Visited 30 times, 1 visit(s) today