❐ বিশেষ প্রতিবেদক
বাংলাদেশের ইপিআই (Expanded Programme on Immunization) টিকাদান কর্মসূচি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশের সবচেয়ে সফল জনস্বাস্থ্য প্রকল্পগুলোর অন্যতম হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত।
এই কর্মসূচির দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুলের “গত আট বছর হামের টিকা দেওয়া হয়নি” মন্তব্যের বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অন্তত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, ইপিআই, ডব্লিউএইচও এবং ইউনিসেফ-এর ফ্যাক্টশিট ও তথ্য বলছে ভিন্ন কথা।
সম্প্রতি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় শিশুদের মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী রোববার এক অনুষ্ঠানে জানান, পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রায় ৬০৪ কোটি টাকা নতুন করে টিকা ক্রয়ের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলে তিনি দাবি করেন, অতি সংক্রামক এ রোগের টিকা গত ৮ বছর না দেওয়ার কারণেই এখন প্রকোপ দেখা যাচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, আগামী জুলাই-আগস্টে বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে দেশজুড়ে শিশুদের হামের টিকা দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
অথচ সরকারি তথ্য ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে।
ইপিআই কর্মসূচি ১৯৭৯ সালে শুরু হয়। শুরুতে পূর্ণ টিকাপ্রাপ্ত শিশুর হার ছিল মাত্র ২%। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০২৪-২৫ সালের তথ্য অনুসারে এটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮১.৬% থেকে ৮৪% এর কাছাকাছি। WHO ও UNICEF-এর যৌথ অনুমান (WUENIC) অনুসারে, ২০২৪ সালে হাম-সম্বলিত ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ (MCV1/MR1) কাভারেজ ছিল ৯৭% এবং দ্বিতীয় ডোজ (MCV2/MR2) কাভারেজ ছিল ৯৩%।

বাংলাদেশের EPI Factsheet 2023 (WHO IRIS-এ প্রকাশিত) অনুসারে, এই উচ্চ কাভারেজের ফলে ২০২২ সালে নিশ্চিত হামের কেস ছিল মাত্র ৩১১টি এবং ২০২৩ সালে ২৮০টি, যা পূর্ববর্তী বছরগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
হামের টিকা (MR vaccine) প্রথম ডোজ ৯ মাস বয়সে এবং দ্বিতীয় ডোজ ১৫ মাস বয়সে দেওয়ার জাতীয় তফসিল অনুসরণ করে দেশব্যাপী আউটরিচ, কমিউনিটি ক্লিনিক ও ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে এই কভারেজ অর্জিত হয়েছে।
এই কর্মসূচি শুধু টিকাদান নয়, শিশু ও মায়েদের স্বাস্থ্যসেবার একটি ব্যাপক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে।
বর্তমানে ইপিআই ১০টি রোগের বিরুদ্ধে টিকা প্রদান করে- BCG, পেন্টাভ্যালেন্ট, OPV/IPV, হাম-রুবেলা (MR), PCV, রোটাভাইরাস, টাইফয়েড ইত্যাদি।
প্রতি বছর প্রায় ৩.৮ মিলিয়ন শিশু এবং ৬ মিলিয়ন নারীকে টিকা দেওয়া হয়। এটি প্রতি বছর প্রায় ৯৪,০০০ শিশুর মৃত্যু প্রতিরোধ করছে এবং ৫০ লক্ষ শিশুর অসুস্থতা এড়িয়ে যাচ্ছে। প্রতি ১ ডলার বিনিয়োগে ২৫ ডলারের স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া যায়।
পোলিও নির্মূল, মাতৃ ও নবজাতক টিটেনাস (MNT) নির্মূল এবং হেপাটাইটিস নিয়ন্ত্রণে ইপিআই-এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। শিশুমৃত্যু হারে ব্যাপক হ্রাস ঘটেছে।
১৯৭৯ সালে প্রতি ১০০০ জীবিত শিশুর মধ্যে ২১১ জনের মৃত্যু হতো (৫ বছরের কম বয়সীদের মৃত্যুহার)। বর্তমানে তা কমে ৩১ জন প্রতি ১০০০-এ দাঁড়িয়েছে — অর্থাৎ ৮১.৫% হ্রাস। এটি বিশ্বের মাত্র ছয়টি দেশের মধ্যে একটি বিরল অর্জন।
ভ্যাকসিন-প্রতিরোধযোগ্য রোগ যেমন হাম, হুপিং কাশি, ধনুষ্টংকার, নিউমোনিয়া, পোলিও ইত্যাদি থেকে শিশুদের রক্ষা করে ইপিআই সরাসরি ৫ বছর বয়সী শিশুদের মৃত্যুর হার কমিয়েছে এবং Millennium Development Goal 4 অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

Gavi, the Vaccine Alliance ২০০১ সাল থেকে বাংলাদেশকে সমর্থন দিয়ে আসছে। Gavi-এর সহায়তায় PCV-10, IPV, HPV-সহ নতুন টিকা চালু হয়েছে। ২০০৯ ও ২০১২ সালে Gavi Best Performance Award লাভ করেছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ২০১৯ সালে Vaccine Hero Award দেওয়া হয়েছে। Gavi-এর সহায়তা ২০২৬ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফোরাম ফর হেলথ অ্যান্ড ওয়েলবিং-এর অনুরোধে তা ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
২০২৩ সালের ১২ই জানুয়ারি পর্যন্ত, গাভি বাংলাদেশকে সব ধরনের সহায়তা (নিয়মিত টিকা, নতুন টিকার প্রবর্তন, কোল্ড চেইন সরঞ্জাম, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ এবং অন্যান্য ইপিআই-সম্পর্কিত কার্যক্রমসহ) বাবদ প্রায় ৪৮৯.৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের অনুমোদিত প্রতিশ্রুতির মধ্যে ৩০৬.৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিতরণ করেছে।

HPV, টাইফয়েড কনজুগেট ভ্যাকসিন (TCV), কোভিড-১৯, হাম-রুবেলা ও পেন্টাভ্যালেন্ট টিকাসহ বিভিন্ন টিকায় Gavi-এর অর্থায়ন অব্যাহত রয়েছে।
WHO ও UNICEF ইপিআই-কে সার্বজনীন টিকাদান কর্মসূচি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং বাংলাদেশের সাফল্যকে অন্যান্য দেশের জন্য রোল মডেল হিসেবে উল্লেখ করেছে।
WHO-এর EPI factsheet 2024-এ বাংলাদেশের উচ্চ কাভারেজ ও সিস্টেমের প্রশংসা করা হয়েছে। বাংলাদেশের সার্ভিস ডেলিভারি মেকানিজম (আউটরিচ সেশন, কমিউনিটি ক্লিনিক, ডিজিটাল টুলস, সামাজিক মোবিলাইজেশন) অনেক দেশে অনুসরণ করা হয়।
এটি ভিটামিন এ, কৃমিনাশকসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবার প্ল্যাটফর্ম হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, Gavi-এর সহায়তা প্রাপ্তির হার ধাপে ধাপে কমে আসবে, তাই নিজস্ব অর্থায়ন বাড়ানো প্রয়োজন।
খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, ইপিআই-এর দীর্ঘ সাফল্যের ভিত্তিতে হামের বর্তমান প্রাদুর্ভাব সাময়িক চ্যালেঞ্জ। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এই কর্মসূচির ধারাবাহিক উন্নয়ন এবং Gavi-এর সাথে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব প্রমাণ করে যে, সরকারি প্রতিশ্রুতি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিষ্ঠায় অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়।
ভবিষ্যতে শূন্য-ডোজ শিশু নির্মূল এবং স্ব-টেকসই অর্থায়ন নিশ্চিত করে এই সাফল্য আরও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।
তথ্যসূত্র: WHO EPI Factsheet, UNICEF/Gavi/WHO যৌথ অনুমান (২০২৪-২৫), Gavi প্রতিবেদন, বাংলাদেশ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য
