পুলিশের অস্ত্র এখন অপরাধীদের হাতে: আতঙ্কে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম

পুলিশের অস্ত্র এখন অপরাধীদের হাতে: আতঙ্কে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম
শেয়ার করুন

❐ বিশেষ প্রতিবেদক


২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পটপরিবর্তনের সেই উত্তাল সময়ে সারাদেশের মত চট্টগ্রামের বিভিন্ন থানা ও পুলিশ ফাঁড়ি থেকে লুট হওয়া অত্যাধুনিক অস্ত্রগুলো এখন সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পুলিশের খোয়া যাওয়া এসব অস্ত্র ব্যবহার করে বন্দরনগরী ও জেলার বিভিন্ন প্রান্তে দেদারসে চলছে ছিনতাই, চাঁদাবাজি এবং খুনের মতো ভয়াবহ অপরাধ। প্রায় দেড়শ পিস্তল এখনও উদ্ধার না হওয়ায় জনমনে বিরাজ করছে চরম আতঙ্ক।

লুটের অস্ত্রের নতুন ‘ঠিকানা’ অপরাধী জগৎ

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পেশাদার অপরাধী ও শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ধরলেই মিলছে পুলিশের লুট হওয়া বিদেশি পিস্তল ও এসএমজি। গত এক বছরে অন্তত এক ডজন এমন অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে, যা আগে সরকারি কাজে ব্যবহৃত হতো।

শিবির নেতা সাজ্জাদ বাহিনীর হাতে এসএমজি: সম্প্রতি নগরীর ২ নম্বর গেট এলাকা থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ বাহিনীর সদস্য মনিরুল হককে গ্রেপ্তারের পর তার কাছ থেকে ডবলমুরিং থানার লুট হওয়া পিস্তল পাওয়া যায়। পরে তার দেওয়া তথ্যে আল-ফালাহ গলির এক বাসা থেকে উদ্ধার হয় পুলিশের একটি অত্যাধুনিক এসএমজি।

চট্টগ্রামের হালিশহর থানার লুটের অস্ত্র উদ্ধার লক্ষ্মীপুরে মাটির নিচ থেকে, জুলাইযোদ্ধা আটক

পুকুরে মিলল রাইফেল: রাউজানে বিএনপিকর্মী খুনের আসামিদের তথ্যে পুকুর সেচে উদ্ধার করা হয়েছে চায়নিজ রাইফেল ও শটগান।

মাটির নিচে বিদেশি পিস্তল: হালিশহর থানা থেকে লুট হওয়া একটি পিস্তল ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার হওয়া এক সন্ত্রাসীর দেওয়া তথ্যে লক্ষ্মীপুর থেকে মাটির নিচ থেকে উদ্ধার করে পুলিশ।

পরিসংখ্যানের এক উদ্বেগজনক চিত্র

চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, লুটপাটের ভয়াবহতা ছিল ব্যাপক। এক নজরে দেখে নেওয়া যাক অস্ত্রের বর্তমান অবস্থা: বিবরণ, সংখ্যা ও তথ্য,

  • লুট হওয়া মোট অস্ত্র (নগর): ৯৪৫টি
  • উদ্ধার হওয়া অস্ত্র: ৮০০টি
  • এখনও নিখোঁজ পিস্তল: প্রায় ১৫০টি

সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত থানা: কোতোয়ালী, পাহাড়তলী, ডবলমুরিং, রাউজান ও লোহাগাড়া।

চট্টগ্রামে থানায় জুলাই-জঙ্গি হামলার এক বছর: পুলিশের ১৫৬ অস্ত্র এখনও অপরাধীদের হাতে

ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে ‘পাবলিক সার্ভিস’ অস্ত্র

পাহাড়তলী থানার ওসি বাবুল আজাদের দেওয়া তথ্যমতে, অনেক পেশাদার ছিনতাইকারী সরাসরি থানায় লুটপাটে অংশ নিয়েছিল শুধুমাত্র অস্ত্র সংগ্রহ করার জন্য। সম্প্রতি পিস্তলসহ ধরা পড়া ছিনতাইকারী মামুন ও জামাল এর বড় উদাহরণ। তারা মালখানা থেকে লুট করা অস্ত্র দিয়েই সাধারণ মানুষের সর্বস্ব কেড়ে নিচ্ছিল।

এছাড়া সাতকানিয়ায় গণপিটুনিতে নিহত এক সন্ত্রাসীর লাশের পাশেও পাওয়া গেছে কোতোয়ালী থানার লুট হওয়া অস্ত্র।

সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা জানান, “লুট হওয়া অস্ত্রগুলো অপরাধীদের হাতে চলে যাওয়ায় অপরাধের ধরন আরও সহিংস হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বিদেশি পিস্তলগুলো ছোট হওয়ায় এগুলো বহন করা সহজ, যা সন্ত্রাসীদের বড় সুবিধা দিচ্ছে।”

যৌথ বাহিনীর তৎপরতা

নিখোঁজ অস্ত্র উদ্ধারে বর্তমানে সেনাবাহিনী ও পুলিশসহ যৌথ বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ২০২৫ সালেও বাগেরহাট, ঢাকা এবং চট্টগ্রামের বিভিন্ন দুর্গম এলাকা থেকে বেশ কিছু অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।

তবে পুলিশের দুশ্চিন্তা কমছে না, কারণ এখনও শতভাগ অস্ত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এই ‘নিখোঁজ’ দেড়শ পিস্তল যে কোনো সময় বড় ধরনের নাশকতার কারণ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।

Visited 10 times, 1 visit(s) today