এলপিজির বাজার অস্থির: সরকারি দাম ১,৭২৮, বিক্রি ২২শ-২৩শ টাকায়

এলপিজির বাজার অস্থির: সরকারি দাম ১,৭২৮, বিক্রি ২২শ-২৩শ টাকায়
শেয়ার করুন

❐ বিশেষ প্রতিবেদক


উত্তরবঙ্গসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডার বিক্রিতে মারাত্মক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এপ্রিল মাসের জন্য নতুন মূল্য নির্ধারণ করলেও বাস্তবে বাজারে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বরং নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রতি সিলিন্ডারে অতিরিক্ত ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ ভোক্তাদের।

গত ২রা এপ্রিল বিইআরসি ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১,৭২৮ টাকা নির্ধারণ করে। এর আগে মার্চ মাসে একই সিলিন্ডারের দাম ছিল ১,৩৪১ টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রপেন ও বিউটেনের মূল্য বৃদ্ধির কারণে এক ধাক্কায় ৩৮৭ টাকা বাড়ানো হয়। তবে দাম বাড়ানোর পরও বাজারে শৃঙ্খলা ফেরেনি; বরং অস্থিরতা আরও বেড়েছে।

আজ দুপুরে নগরীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ১২ কেজি সিলিন্ডার ১,৯০০ থেকে ২,২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এই দাম ২,৩০০ টাকাও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে পাড়া-মহল্লা ও গ্রামীণ এলাকার ছোট দোকানগুলোতে অতিরিক্ত দামে বিক্রির প্রবণতা বেশি।

জানা গেছে,

সিএনজিচালিত অটোরিককশা অনেকেই এলপিজি কিট লাগিয়ে কনভার্ট করে ফেলেছেন সিএনজি সংকটে। এলপিজির দাম কয়েকগুণ হলেও সিলিন্ডার গ্যাস থেকে রিফিল করে অটোরিকশা চালাতে বাধ্য হচ্ছেন চালকরা। এতে একদিকে রান্নার গ্যাসের সংকট এবং দাম বৃদ্ধি চাপে ফেলেছে গৃহস্থালী ব্যবহারকারীদের।

নগরীর বেতপট্টি মোড় ও লালবাগ এলাকার খুচরা বিক্রেতা মো. মহিউদ্দিন জানান, ডিলারদের কাছ থেকেই বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।

আরেক বিক্রেতা আব্দুর রহমান বলেন, “কোম্পানির ডিলাররা সরকারি দামে গ্যাস সরবরাহ করছেন না। পরিবহন খরচ, বাড়তি কমিশনসহ নানা ব্যয় যোগ হয়ে বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।”

তবে এই যুক্তি মানতে নারাজ ভোক্তারা। তাদের অভিযোগ, সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে অনিয়ম ও তদারকির অভাবের কারণে অতিরিক্ত মুনাফা নেওয়া হচ্ছে।

ফাতেমা জাহান নামে এক গৃহিনী বলেন, “টিভি-পত্রিকায় এক দাম দেখি, কিন্তু দোকানে গেলে অন্য দাম দিতে হয়—এটা স্পষ্ট প্রতারণা। কার্যকর নজরদারি না থাকায় আমরা প্রতিনিয়ত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।”

রংপুর মেডিকেল পূর্বগেট এলাকার গৃহিণী ইসরাত খন্দকার বলেন, “আজ ২,২৫০ টাকা দিয়ে সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে। দরদাম করারও সুযোগ নেই, প্রয়োজনের তাগিদে বেশি দামে কিনতেই হচ্ছে।”

স্থানীয় পল্লী চিকিৎসক ফয়জুর রহমান জানান, “দাম ঘোষণার পরদিনই ২,২০০ টাকা দিয়ে গ্যাস নিতে হয়েছে। ঘোষিত দাম বাস্তবে কোনো কাজে আসছে না।”

শুধু শহর নয়, গ্রামাঞ্চলেও একই চিত্র।

কেরানীরহাট এলাকার বাসিন্দা বিকাশ মজুমদার বলেন, সেখানে সিলিন্ডার ২,২০০ থেকে ২,৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ছোট দোকানগুলো কার্যত নিয়ন্ত্রণের বাইরে—দেখার কেউ নেই বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এলপিজি সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি ধাপেই অস্বচ্ছতা রয়েছে। ডিলার পর্যায়ে সরকারি দামে সরবরাহ না হওয়া, পরিবহন খরচের অজুহাত এবং খুচরা পর্যায়ে অতিরিক্ত মুনাফার প্রবণতা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। এর পুরো চাপ শেষ পর্যন্ত বহন করতে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাদের।

ভোক্তাদের দাবি, মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে এ সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়; প্রয়োজন নিয়মিত ও কঠোর তদারকি। বিশেষজ্ঞরাও মনে করছেন, ডিলার থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত স্বচ্ছ মূল্যব্যবস্থা নিশ্চিত না হলে এই নৈরাজ্য বন্ধ করা কঠিন।

রংপুর জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, বাজার পরিস্থিতি নজরদারিতে রাখা হয়েছে।

তিনি বলেন, “অতিরিক্ত দামে গ্যাস বিক্রির অভিযোগে ইতোমধ্যে শহরের দুই ডিলারকে জরিমানা করা হয়েছে। আমাদের অভিযান ও মনিটরিং কার্যক্রম চলমান রয়েছে।”

Visited 12 times, 1 visit(s) today