জামিন হলেও মিলছে না মুক্তি: শ্যোন অ্যারেস্ট আর অদৃশ্য ক্লিয়ারেন্সে বন্দি ন্যায়বিচার, প্রতি ধাপে টাকার খেলা

জামিন হলেও মিলছে না মুক্তি: শ্যোন অ্যারেস্ট আর অদৃশ্য ক্লিয়ারেন্সে বন্দি ন্যায়বিচার, প্রতি ধাপে টাকার খেলা
শেয়ার করুন

❐ নিজস্ব প্রতিবেদক


মামলাগুলো এখন সাধারণ মানুষের জন্য মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। একদিকে চলছে ঢালাওভাবে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন মামলায় আসামি করার অভিযোগ, অন্যদিকে আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পরও কারামুক্তি পেতে পোহাতে হচ্ছে অবর্ণনীয় ভোগান্তি। কাগজের জামিন বাস্তবে কার্যকর হতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পুলিশের ‘পাঁচ স্তরের অদৃশ্য ক্লিয়ারেন্স’ এবং একের পর এক ‘শ্যোন অ্যারেস্ট’-এর বাণিজ্য।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন থানায় দায়ের হওয়া অন্তত ২০টি মামলার নথিতে জামিন পাওয়ার পরও কারামুক্তিতে বিলম্বের প্রমাণ মিলেছে।

আইন অনুযায়ী আদালত জামিন দিলে দ্রুত তা কার্যকর করা প্রশাসনের দায়িত্ব হলেও বাস্তবে জামিননামা পৌঁছানোর পর শুরু হয় নতুন খেলা। প্রথমে ডিসি প্রসিকিউশন, এরপর বিভাগীয় পুলিশ কার্যালয়, গোয়েন্দা বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট থানা হয়ে প্রতিবেদন কারাগারে পৌঁছাতে তৈরি করা হয়েছে দীর্ঘসূত্রতা। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি ধাপ পার করতে গুনতে হচ্ছে বড় অঙ্কের টাকা।

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, স্বজনরা যখন কারাগারের গেটে প্রহর গুনছেন, ঠিক তখনই আরেকটি মামলায় তাকে ‘শ্যোন অ্যারেস্ট’ বা গ্রেপ্তার দেখানো হচ্ছে।

ঢাকা জজকোর্টের আইনজীবী ফারজানা ইয়াসমিন রাখি বলেন, “রাজনৈতিক ও সংঘাতের মামলায় থানাকে ম্যানেজ না করতে পারলে মুক্তি পাওয়া দুঃসাধ্য। এক মামলা থেকে বের হতে গেলেই পাশের থানার অন্য মামলায় নাম ঢুকিয়ে দেওয়া হয়।”

রাজধানীর শাহজাহানপুর থানার একটি জুলাই সংঘাতের মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া এক মাংস ব্যবসায়ীর অভিজ্ঞতা রীতিমতো শিউরে ওঠার মতো। ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বে মামলায় জড়ানো এই ব্যক্তি আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পর একে একে তিনটি ভিন্ন মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। শেষমেশ থানা ‘ম্যানেজ’ করে তবেই তিনি ঘরে ফিরতে পেরেছেন। তার প্রশ্ন— “আদালত মুক্তি দিলেও পুলিশ কেন বারবার আটকে রাখে?”

নিরপরাধ ব্যক্তিদের হয়রানি কমাতে ফৌজদারি কার্যবিধিতে ১৭৩ (ক) ধারা সংযোজন করে ‘অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন’-এর ব্যবস্থা করা হলেও, অভিযোগ উঠেছে এটি এখন দুর্নীতির হাতিয়ার। তদন্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, অর্থের বিনিময়ে জুলাই সংঘাতের সঙ্গে সরাসরি জড়িত তৎকালীন প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হচ্ছে, অথচ প্রকৃত নিরপরাধ মানুষ টাকার অভাবে ধুঁকছেন।

ডিএমপির মুখপাত্র এনএম নাসিরুদ্দিন এই ক্লিয়ারেন্স প্রক্রিয়ার কথা অস্বীকার করে জানিয়েছেন, আদালত জামিন দিলে পুলিশের কোনো আলাদা অনুমতি নেওয়ার নিয়ম নেই। তবে ভুক্তভোগীদের দাবি এবং মাঠ পর্যায়ের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। নির্দিষ্ট ‘অদৃশ্য’ চ্যানেল পার না হলে জেলখানার তালা খুলছে না।

আইন সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, জামিন একটি সাংবিধানিক অধিকার। কিন্তু এই অধিকার যখন প্রশাসনিক স্তরে ‘পণ্যে’ পরিণত হয়, তখন সাধারণ মানুষের বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা চিরতরে ভেঙে পড়ে। এই অশুভ বাণিজ্য বন্ধে ডিজিটাল ট্র্যাকিং এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

Visited 39 times, 1 visit(s) today