এনরিকের পিএসজি: যখন অজেয় আক্রমণ ভাগ আর ইস্পাতকঠিন রক্ষণ মিলেমিশে একাকার

এনরিকের পিএসজি: যখন অজেয় আক্রমণ ভাগ আর ইস্পাতকঠিন রক্ষণ মিলেমিশে একাকার
শেয়ার করুন

গত এক বছর ধরে ইউরোপের ফুটবল মাঠে প্যারিস সেন্ট-জার্মেই (পিএসজি) মানেই ছিল এক রোমাঞ্চকর ঝড়ের নাম। কিন্তু গত বুধবার বায়ার্ন মিউনিখের বিপক্ষে লুইস এনরিকের শিষ্যরা দেখাল মুদ্রার উল্টো পিঠ।

শুধুমাত্র আক্রমণ নয়, দাঁতে দাঁত চেপে রক্ষণ সামলানোর অদম্য জেদ নিয়ে তারা মাঠ ছাড়ল এবং নিশ্চিত করল টানা দ্বিতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনাল।

সেমিফাইনালের প্রথম লেগটা ছিল যেন গোলবন্যার এক মহাকাব্য। ৫-৪ ব্যবধানের সেই জয়ে দুই দলের ফুটবলাররা শৈল্পিক আক্রমণের যে পসরা সাজিয়েছিলেন, তা ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নিয়েছে। তবে ফিরতি লেগে আলিয়াঞ্জ অ্যারেনায় পিএসজি ছিল একদম হিসেবি। ম্যাচের শুরুতেই দুর্দান্ত এক গোল, আর বাকি সময়টা জুড়ে ছিল নিজেদের দুর্গ রক্ষার এক বীরত্বপূর্ণ লড়াই।

ম্যাচের বয়স তখন মাত্র তিন মিনিট। পাল্টা আক্রমণের এক বিধ্বংসী ঝাপটায় গোল করে বসলেন উসমান দেম্বেলে। এরপর থেকেই শুরু হলো বায়ার্নকে ঠেকিয়ে রাখার মিশন। বায়ার্ন মিউনিখ, যারা এই মৌসুমে প্রতি ম্যাচে গোল করতে অভ্যস্ত, তারা যেন এদিন পিএসজির রক্ষণের দেয়ালের সামনে দিশেহারা হয়ে পড়ল। শেষ মুহূর্তে হ্যারি কেইন গোল করে সমতা ফেরালেও তা বায়ার্নের বিদায় আটকাতে পারেনি। দুই লেগ মিলিয়ে ৬-৫ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে ফাইনালের টিকিট হাতে পায় প্যারিস।

ম্যাচ শেষে এনরিকের কণ্ঠে ছিল তৃপ্তির সুর। তিনি বললেন, ‘আজ রাতে আমরা বিশ্বকে দেখিয়েছি আমরা কেমন দল। আমরা প্রমাণ করেছি যে আমাদের মধ্যে সেই পরিপক্কতা আছে, যা দিয়ে আক্রমণের পাশাপাশি রক্ষণও সামলানো যায়।’ দলের তরুণ তুর্কি দাজি দুয়ে যোগ করলেন, ‘প্রতিটি ম্যাচ তো আর জাদুকরী ফুটবল দিয়ে জেতা সম্ভব নয়। আজ আমাদের অনেক রক্ষণ করতে হয়েছে, আর আমরা সেটা করেছি নিখুঁতভাবে।’
এই রক্ষণভাগের অতন্দ্র প্রহরী হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন ইকুয়েডরের উইলিয়ান পাচো। মাঠের প্রতিটি দ্বন্দ্বে তিনি ছিলেন অজেয়। আর চোটের কারণে আশরাফ হাকিমি না থাকায় রাইট-ব্যাকের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন ২০ বছরের তরুণ ওয়ারেন জাইর-এমেরি। মাঝমাঠের এই সেনানি যেন পুরো মৌসুমে পিএসজির সাফল্যের মূল কারিগর। গত মৌসুমে অনিয়মিত থাকলেও এবার তিনি লড়াকু মানসিকতা দিয়ে দলের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছেন।

২০১১ সালে কাতারি মালিকানা আসার পর থেকে পিএসজির একমাত্র স্বপ্ন ছিল ইউরোপের শ্রেষ্ঠত্ব। সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে গত বছর। আর এবার তারা দাঁড়িয়ে ইতিহাসের দোরগোড়ায়। ২০১৯ সালের লিভারপুলের পর প্রথম দল হিসেবে টানা দুইবার ফাইনালে পৌঁছাল তারা। আগামী ৩০ মে বুদাপেস্টে আর্সেনালকে হারাতে পারলেই জিনেদিন জিদানের রিয়াল মাদ্রিদের পর দ্বিতীয় দল হিসেবে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা ধরে রাখার অনন্য রেকর্ড গড়বে তারা।

পিএসজি সভাপতি নাসের আল-খেলাইফির মুখে এখন চওড়া হাসি। এমবাপ্পে, নেইমার কিংবা মেসির মতো মহাতারকাদের বিদায়ের পর ক্লাবটি যে এত দ্রুত এবং সফলভাবে ঘুরে দাঁড়াবে, তা হয়তো তিনি নিজেও ভাবেননি। লুইস এনরিকের জাদুর কাঠিতে উসমান দেম্বেলে এখন এক ভয়ঙ্কর ফরোয়ার্ড, আর ক্ষভিচা কভারাতসখেলিয়া হয়ে উঠেছেন এই মৌসুমের সেরা ফুটবলার।

সাবেক ফুটবলার সামির নাসরির মতে, এই পিএসজি এখন প্রতিপক্ষের জন্য এক আতঙ্কের নাম। কারণ তারা জানে কীভাবে বিপদের মুখেও নিজেদের শান্ত রেখে জয় ছিনিয়ে আনতে হয়। এখন সবার চোখ বুদাপেস্টের দিকে—এনরিকের এই ‘ভয়ঙ্কর’ বাহিনী কি পারবে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ইউরোপ জয় করতে?

Visited 4 times, 1 visit(s) today