আওয়ামী লীগ আমলে স্থাপিত ৪৮ জেলার সরকারি হাসপাতালের ১৪টির আইসিইউ বন্ধ, বঞ্চিত হাজার হাজার রোগী

আওয়ামী লীগ আমলে স্থাপিত ৪৮ জেলার সরকারি হাসপাতালের ১৪টির আইসিইউ বন্ধ, বঞ্চিত হাজার হাজার রোগী
শেয়ার করুন

❐ বিডি ডাইজেস্ট ডেস্ক


দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন মো. ইব্রাহিম। অবস্থার জটিলতা বাড়ায় তাকে ভর্তি করা হয় রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। চিকিৎসক তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে অর্থাৎ আইসিইউতে রেখে চিকিৎসার পরামর্শ দেন। কিন্তু সেই সুবিধাই নেই এই হাসপাতালে। ফলে আইসিইউর বদলে সাধারণ ওয়ার্ডে ঝুঁকি নিয়েই চলছিল তার চিকিৎসা।

গত রোববারের এই ঘটনার পর মঙ্গলবারও পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। আইসিইউ সেবা চালু হয়নি। তবে এটি কেবল সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের একক সমস্যা নয় — লোকবল সংকটের কারণে সোহরাওয়ার্দীসহ দেশের বড় ১৪টি সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ সেবা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে আছে।

এতে গত চার মাসে মৃত্যুপথযাত্রী প্রায় ১৪ হাজার রোগী এই প্রাণরক্ষাকারী জরুরি সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

সোহরাওয়ার্দীতে প্রতিদিন ৫০ জনের চাহিদা, সেবা শূন্য

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে প্রতিদিন অন্তত ৫০ জন রোগীর আইসিইউ সেবার প্রয়োজন হয়, কিন্তু সেটি মিলছে না। যাদের আর্থিক সামর্থ্য আছে, তারা বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে এই সেবা নেন। আর দরিদ্র রোগীরা টাকার অভাবে সেই সুযোগ থেকেও বঞ্চিত থাকছেন।

হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. শফিউর রহমান জানান, জনবল সংকটের কারণে চার মাস ধরে এই জরুরি সেবা বন্ধ আছে। জনবল চেয়ে চিঠি দেওয়া হলেও কোনো উত্তর আসেনি।

যেভাবে তৈরি হয়েছিল এই সংকট

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় শ্বাসকষ্টের রোগী হু হু করে বেড়ে যাওয়ায় কোভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যান্ডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস বা ইআরপিপি প্রকল্পের আওতায় ৪৮ জেলায় সরকারি হাসপাতালে ১০ শয্যার আইসিইউ ইউনিট স্থাপন করে আওয়ামী লীগ সরকার।

এর মধ্যে ২৩টি জেলায় সেবা চালুও হয়েছিল। তবে বর্তমানে জনবল সংকটে কিছু জেলায় বন্ধ হয়ে গেছে।

এই প্রকল্পে ৪৮ জেলায় আইসিইউ স্থাপনে বরাদ্দ ছিল ৫১২ কোটি টাকা। সে হিসেবে প্রতিটি আইসিইউ স্থাপনে গড় ব্যয় হয়েছে ১০ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। এখন ১৪টি হাসপাতালের আইসিইউতে পড়ে থাকা যন্ত্রপাতির মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৪৯ কোটি টাকা, যা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে।

ইআরপিপি প্রকল্পের মাধ্যমে অস্থায়ীভিত্তিতে মেডিকেল অফিসার, নার্স, টেকনোলজিস্ট ও স্বাস্থ্যকর্মীসহ মোট ১ হাজার ৪ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তাদের দিয়েই এতদিন আইসিইউ সেবা চালু ছিল।

গত ডিসেম্বরে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলে ওইসব চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী চাকরি হারান এবং একে একে বন্ধ হতে থাকে আইসিইউগুলো।

ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার এসব নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথা ঘামাননি। বরং বিভিন্ন বক্তব্যে ড. ইউনূস সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছেন সরকারি হাসপাতালে না গিয়ে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার জন্য। যা নিয়ে তুমুল সমালোচনার শিকার হন তিনি।

মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব বাতিল, নতুন প্রকল্পের অপেক্ষা

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. শেখ ছাইদুল হক জানান, প্রকল্পের অস্থায়ী জনবলকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের প্রস্তাব সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছিল। সেটি মন্ত্রণালয় বাতিল করে দিয়েছে।

তিনি বলেন, এসব আইসিইউ সচল করতে নতুন প্রকল্প নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, তবে সেটি সময়সাপেক্ষ। নতুন প্রকল্প অনুমোদন না হওয়া পর্যন্ত আইসিইউগুলো বন্ধ রাখতে হচ্ছে।

১৪ হাসপাতালের তালিকা ও জেলার চিত্র

যেসব হাসপাতালে আইসিইউ সেবা বন্ধ রয়েছে সেগুলো হলো — ঢাকার সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বগুড়ার জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, নারায়ণগঞ্জের জেনারেল হাসপাতাল (ভিক্টোরিয়া), শেরপুর ২৫০ শয্যা হাসপাতাল, টাঙ্গাইল ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল, যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতাল, সুনামগঞ্জ ২৫০ শয্যা হাসপাতাল, চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতাল, বাগেরহাট জেলা সদর হাসপাতাল, মাদারীপুর জেলা সদর হাসপাতাল এবং মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল।

ঢাকার বাইরের চিত্র আরও উদ্বেগজনক।

নারায়ণগঞ্জের জেনারেল হাসপাতালে গত ডিসেম্বরে ১০ শয্যার আইসিইউ সেবা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ জন মুমূর্ষু রোগীকে ঢাকায় স্থানান্তর করতে হচ্ছে। এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে রোগীরা আরও বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন।

বাগেরহাট জেলা সদর হাসপাতালে জানুয়ারি থেকে আইসিইউ সেবা বন্ধ। মাসে ৪০ থেকে ৫০ জন রোগীকে খুলনা বা ঢাকায় পাঠাতে হচ্ছে, এবং পথেই অনেক রোগীর মৃত্যু হচ্ছে বলে হাসপাতাল সূত্র জানায়।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক অসীম কুমার সমাদ্দার জানান, দ্রুত এ সেবা চালুর বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে চার মাস ধরে ১০ শয্যার আইসিইউতে কোনো রোগী ভর্তি নেওয়া হচ্ছে না। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. সাদেকুর রহমান জানান, আইসিইউ চালাতে সার্বক্ষণিক মেডিসিন বিশেষজ্ঞ প্রয়োজন।

চারজনের প্রয়োজন হলেও হাসপাতালে এই মুহূর্তে একজনও নেই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে বারবার তাগাদা দিয়েও কোনো সুরাহা হচ্ছে না।

মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২০২৩ সালের ১৪ই নভেম্বর ১০ শয্যার আইসিইউ ইউনিট চালু হয়েছিল। কিন্তু সেটি দেড় বছর ধরে তালাবদ্ধ পড়ে আছে। হাসপাতাল পরিচালক ডা. মো. সফিকুল ইসলাম জানান, জনবলের অভাবেই আইসিইউ চালু করা যায়নি।

সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের পরিস্থিতি আরও হতাশাজনক। দুই বছর আগে ১০ শয্যার আইসিইউ স্থাপন হলেও স্থাপনের দিন থেকে আটতলার সেই আইসিইউ কক্ষের দরজা তালাবদ্ধ।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মাহবুবুর রহমান জানান, ১০ বেডের আইসিইউ চালু রাখতে সাতজন মেডিকেল অফিসার ও তিনজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের প্রয়োজন — এই জনবল কখনোই পাওয়া যায়নি।

মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে ভেন্টিলেটর ও বেডসহ সব ধরনের যন্ত্রপাতি দিয়ে সাজানো আইসিইউ ইউনিটটি এখন অযত্নে পড়ে নষ্ট হচ্ছে। হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মো. আরিফুজ্জামান সরাসরি বলেন, ‘লোক নেই, তাই আইসিইউ ও সিসিইউ চালু করতে পারছি না।’

মাদারীপুর সদর হাসপাতালেও স্থাপনের পর থেকেই আইসিইউ অব্যবহৃত পড়ে আছে। সিভিল সার্জন ডা. শরিফুল আবেদীন কমল জানান, পরিপূর্ণ যন্ত্রপাতি ও লোকবল ছাড়া আইসিইউ সেবা দেওয়া সম্ভব নয়, এবং দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় যন্ত্রপাতি ধীরে ধীরে অকেজো হয়ে যাচ্ছে।

শেরপুর জেলা সদর হাসপাতালে কিছুদিন আইসিইউ চলার পর জনবলের কারণে আবার বন্ধ হয়ে যায়। সেখান থেকেও রোগীদের অন্য হাসপাতালে পাঠাতে হচ্ছে বলে জানান সাবেক তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. জসীম উদ্দিন।

করোনাকালে চালু হওয়া যশোর জেনারেল হাসপাতালের ১০ শয্যার আইসিইউ এখন চলছে ধুঁকে ধুঁকে। মাঝেমধ্যে চিকিৎসক না থাকায় রোগী ভর্তি রাখা হয় না।

হাসপাতালের পরিচালক ডা. আহসান কবীর বাপ্পী বলেন, আইসিইউতে চিকিৎসা নিশ্চিত করতে শুধু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক থাকলেই হয় না, একটি প্রশিক্ষিত দলের প্রয়োজন, যার ঘাটতি এই হাসপাতালে রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উচ্চ পর্যায়ের উদ্যোগ এখনই দরকার

জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক বেনজির আহমেদ বলেন, ১৪ হাসপাতালে আইসিইউ সেবা সচল রাখা গেলে বহু মানুষের জীবন রক্ষা পেত। দুঃখের বিষয়, সচল করা যাচ্ছে না। এতে একদিকে রোগীর ভোগান্তি বাড়ছে, অন্যদিকে সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

তিনি আরও সতর্ক করে দিয়ে বলেন, আইসিইউর যন্ত্র অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকলে অধিকাংশই অকেজো হয়ে পড়বে। এগুলো সচল রাখতে উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করে সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

৫১২ কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে ওঠা এই জীবনরক্ষাকারী অবকাঠামো আজ লোকবলের অভাবে তালাবদ্ধ, আর কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি জং ধরছে নীরবে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই অপচয় যেমন অব্যাহত থাকবে, তেমনি অসহায় রোগীদের প্রাণহানির দায়ও এড়ানো যাবে না।

Visited 19 times, 1 visit(s) today