❐ নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের আর্থিক খাতের দীর্ঘদিনের সংকট অবশেষে অবসায়নের পর্যায়ে পৌঁছেছে। টানা লোকসান, বিপুল খেলাপি ঋণ এবং আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়া পাঁচটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (এনবিএফআই) পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি কার্যত এসব প্রতিষ্ঠানের অবসায়ন বা বন্ধের প্রক্রিয়ার সূচনা।
মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় দীর্ঘদিন ধরে সংকটে থাকা নয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হয়।
এর মধ্যে পাঁচটিকে অবসায়নের পথে নেওয়া হলেও বাকি চারটিকে শেষ সুযোগ হিসেবে তিন মাস সময় দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, অবসায়নের তালিকায় রয়েছে এফএএস ফাইন্যান্স, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, আভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি), প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স ও প্রাইম ফাইন্যান্সকে পুনরুদ্ধারের জন্য তিন মাস সময় দেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, অবসায়নের সিদ্ধান্ত হওয়া পাঁচ প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২৭ হাজার ব্যক্তি আমানতকারীর ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকার আমানত রয়েছে। প্রশাসক নিয়োগের পর আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে।
তবে একজন ব্যক্তি আমানতকারী সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত পাবেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
তবে এখানেই বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। যেসব আমানতকারীর জমা অর্থ ১০ লাখ টাকার বেশি, তাদের বাকি অর্থ কীভাবে এবং কত সময়ে ফেরত দেওয়া হবে—এ বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো রূপরেখা প্রকাশ করা হয়নি। ফলে হাজারো গ্রাহকের মধ্যে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বন্ধের তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর খেলাপি ঋণের হার প্রায় সম্পূর্ণ ঋণপোর্টফোলিও গ্রাস করেছে। গত ডিসেম্বর শেষে এফএএস ফাইন্যান্সের খেলাপি ঋণ ছিল ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ, ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের ৯৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ এবং ফারইস্ট ফাইন্যান্সের ৯৮ দশমিক ৫০ শতাংশ। অর্থাৎ এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ ঋণই আদায়ের বাইরে চলে গেছে।
প্রশ্ন উঠছে, এমন পরিস্থিতি একদিনে তৈরি হয়নি। বছরের পর বছর অনিয়ম, দুর্বল তদারকি, রাজনৈতিক প্রভাব এবং জবাবদিহির অভাবের কারণে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এই অবস্থায় পৌঁছেছে। অথচ সংকট গভীর হওয়ার আগেই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হলে আমানতকারীদের ক্ষতির ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব ছিল।
খাতসংশ্লিষ্টদের দাবি, পূর্বেকার সময়ে সংঘটিত নানা আর্থিক কেলেঙ্কারি ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ঋণ জালিয়াতির কারণে একাধিক প্রতিষ্ঠান কার্যত দেউলিয়া হয়ে পড়ে।
আলোচিত ব্যক্তি পি কে হালদারের বিরুদ্ধে চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্তত সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। যদিও এ অর্থ উদ্ধারে এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি সীমিত।
বাংলাদেশ ব্যাংক গত বছরের মে মাসে উচ্চ খেলাপি ঋণ ও আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ায় ২০টি এনবিএফআইকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছিল। পরে পর্যায়ক্রমে মূল্যায়নের পর কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে পুনরুদ্ধারের সুযোগ দেওয়া হলেও পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সেই সম্ভাবনা আর দেখছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দুর্বল আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা প্রয়োজন হতে পারে, তবে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো দায় নির্ধারণ। যেসব ব্যক্তি, পরিচালক বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে একই সংকট ভবিষ্যতেও ফিরে আসতে পারে।
বছরের পর বছর আমানত ফেরত না পেয়ে ভোগান্তিতে থাকা গ্রাহকদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত কিছুটা আশার সঞ্চার করলেও, অবসায়ন প্রক্রিয়া কত দ্রুত সম্পন্ন হবে এবং কত টাকা আদায় করে আমানতকারীদের ফেরত দেওয়া সম্ভব হবে—সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো অনিশ্চিত।
