মাদ্রাসায় শিশু বলাৎকারের মচ্ছব: বারবার আলোচনায় উঠে আসছে ভয়াবহ চিত্র

মাদ্রাসায় শিশু বলাৎকারের মচ্ছব: বারবার আলোচনায় উঠে আসছে ভয়াবহ চিত্র
শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদক

দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিশু শিক্ষার্থীদের বলাৎকার ও যৌন নিপীড়নের ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক সামনে আসছে, যা অভিভাবক ও শিশু অধিকার সংগঠনগুলোর মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। ২০২৪ সালে মাদ্রাসাগুলোতে ৮৯৮, ২০২৫ সালে ৯১৪ এবং ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত ৪৬৫ জন শিশু বলৎকারের ঘটনা লিপিবদ্ধ হয়েছে।

চলতি বছরের কয়েক মাসেই দেশের ভিন্ন ভিন্ন জেলায় এমন একাধিক ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। মার্চ মাসে কুষ্টিয়ার একটি মাদ্রাসায় ১০ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে মাদ্রাসা প্রধানসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ) তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলে, ভয় ও নীরবতার কারণে মাদ্রাসায় শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতার ঘটনা সচরাচর প্রকাশ পায় না এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে গুরুতর শারীরিক ক্ষতি বা মৃত্যুর মতো ঘটনা না ঘটলে এসব বিষয় সামনে আসে না।

এপ্রিল মাসে মেহেরপুরের মুজিবনগরে এক মাদ্রাসা শিক্ষকের বিরুদ্ধে ১১ বছর বয়সী এক শিশুকে বলাৎকারের অভিযোগ ওঠে, যিনি বোর্ডিংয়ে থেকে পড়াশোনা করছিল। একই মাসে গাজীপুরের গাছা থানা এলাকায় শিশু ছাত্রকে বলাৎকারের অভিযোগে এক শিক্ষকসহ চারজনকে আটক করা হয়, যেখানে অভিযুক্তকে রক্ষা করতে গিয়ে মাদ্রাসার প্রিন্সিপালসহ অন্য শিক্ষকরাই পুলিশের কাজে বাধা দেন। মে মাসে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীতে ১০ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীকে বলাৎকারের অভিযোগে একজন হাফেজ শিক্ষককে আটক করা হয়, আর নোয়াখালীর চাটখিলে চার ছাত্রকে বলাৎকারের অভিযোগে আরেক শিক্ষক গ্রেপ্তার হন।

শিশু অধিকার সংগঠনগুলোর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রকাশ্যে আসা এসব ঘটনা প্রকৃত চিত্রের একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম (বিএসএএফ), আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এবং শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দেশে শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত যৌন সহিংসতার বহু ঘটনাই অভিযোগ পর্যন্ত পৌঁছায় না। সামাজিক লজ্জা, ধর্মীয় আবেগ, স্থানীয় প্রভাব, বিচারহীনতার আশঙ্কা এবং ভুক্তভোগী পরিবারের ওপর চাপের কারণে অনেক ঘটনাই নীরবে চাপা পড়ে যায়।

বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার সামাজিক আন্দোলনও হয়েছে। এক পর্যায়ে একটি সংগঠন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে দাবি করে যে, এক মাসেই সারা দেশে ৪০ জন মাদ্রাসা শিক্ষার্থী বলাৎকারের শিকার হয়ে তিনজন মারা গেছে এবং আত্মহত্যা করেছে আরও একটি শিশু। এ নিয়ে বলাৎকারের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত এবং মাদ্রাসাগুলোতে যৌন নিপীড়নবিরোধী সেল গঠনের দাবি জানিয়েছিলেন বিশিষ্টজনেরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ সমস্যার মূলে রয়েছে নজরদারির ঘাটতি, জবাবদিহির অভাব এবং সামাজিক চাপের কারণে অভিযোগ না করার প্রবণতা। তাদের দাবি, শুধু অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করাই যথেষ্ট নয়—প্রয়োজন কঠোর আইনি প্রয়োগ, নিরপেক্ষ তদন্ত, দ্রুত বিচার এবং প্রতিষ্ঠানিক সংস্কার। একই সঙ্গে অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠনের তাগিদ দিয়েছেন তারা, যাতে শিশুরা মাদ্রাসা, স্কুল কিংবা পরিবারের মতো সব জায়গাতেই সুরক্ষিত থাকতে পারে।

Visited 490 times, 1 visit(s) today