দ্য আউটলুককে শেখ হাসিনা: ‘বাংলাদেশ ভালো নেই, দেশকে বাঁচাতে, মানুষের পাশে দাঁড়াতেই ফিরব’

দ্য আউটলুককে শেখ হাসিনা: ‘বাংলাদেশ ভালো নেই, দেশকে বাঁচাতে, মানুষের পাশে দাঁড়াতেই ফিরব’
শেয়ার করুন

❐ বিডি ডাইজেস্ট ডেস্ক


২০২৪-এর জুলাই-আগস্টে সরকার পতনের আন্দোলন-সংঘাতের পর বাংলাদেশের দীর্ঘ সময়ের প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ভারতে একজন প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদায় রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে অবস্থান করছেন। সেখান থেকে প্রভাবশালী দৈনিক দ্য আউটলুককে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন তিনি। বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকারটি নিচে দেওয়া হলো:

প্রশ্ন: বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

শেখ হাসিনা: বাংলাদেশ এখন একটি গভীর রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এটা শুধু এক সরকারের পরিবর্তে আরেক সরকার ক্ষমতায় বসার ঘটনা নয়। বিষয়টি রাষ্ট্রের চরিত্রের সঙ্গে জড়িত। এটি গণতন্ত্র, আইনের শাসন এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ঘিরে। আমাদের সরকার (বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ) ক্ষমতায় থাকাকালে বাংলাদেশকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক, উন্নয়নমুখী ও নিরাপদ রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলেছিল। কিন্তু এখন সেই বাংলাদেশকে ভয়, মব সন্ত্রাস, প্রতিহিংসার রাজনীতি, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং উগ্রবাদের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।

যে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে সমৃদ্ধি, আত্মবিশ্বাস এবং আন্তর্জাতিক মর্যাদার পথে এগিয়ে যাচ্ছিল, সেটিকে এখন ভয়, অনিশ্চয়তা ও অন্ধকারের পরিবেশে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়। এটি বাংলাদেশের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ইউনূস এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ধ্বংসাত্মক রাজনীতির ফল।

প্রশ্ন: তারেক রহমান প্রথম গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য ভারত নয়, চীনকে বেছে নিয়েছেন।

শেখ হাসিনা: প্রত্যেক সরকারেরই নিজস্ব কূটনৈতিক অগ্রাধিকার নির্ধারণ করার অধিকার রয়েছে। তবে একটি স্বাভাবিক রাষ্ট্রে সেই অগ্রাধিকার নির্ধারিত হয় ইতিহাস, ভৌগোলিক বাস্তবতা, জাতীয় স্বার্থ এবং জনগণের কল্যাণের ভিত্তিতে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কখনোই প্রতিবেশী দেশগুলোর, বিশেষ করে আমাদের ঐতিহাসিক বন্ধু ভারতের কাছে ভুল বার্তা দেওয়া উচিত নয়। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক শুধু দুই সরকারের সম্পর্ক নয়। এই সম্পর্ক গড়ে উঠেছে মুক্তিযুদ্ধ, রক্তের ঋণ, ভৌগোলিক বাস্তবতা, নিরাপত্তা এবং দুই দেশের মানুষের গভীর বন্ধনের ওপর।

বাংলাদেশের উচিত সব বন্ধুপ্রতিম দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা। চীন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপসহ সবার সঙ্গে আমাদের কাজ করা উচিত। তবে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক মানে ইতিহাসকে ভুলে যাওয়া নয়। পরীক্ষিত বন্ধুর সঙ্গে অনিশ্চয়তা তৈরি করাও নয়।

প্রশ্ন: অবকাঠামো, বিনিয়োগ এবং কৌশলগত সহযোগিতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। আপনার মতে, ঢাকা কি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে?

শেখ হাসিনা: আমাদের নীতির মূল ভিত্তি ছিল—‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়।’

উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বিদেশি অংশীদারদের অংশগ্রহণে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো—সিদ্ধান্তগুলো কি স্বচ্ছভাবে নেওয়া হচ্ছে? জনগণের স্বার্থ কি সুরক্ষিত থাকছে? বাংলাদেশ কি নিজের সিদ্ধান্তের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতেই রাখছে? বাংলাদেশের উন্নয়ন দরকার। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে অন্য দেশের ওপর নির্ভরশীলতাকে কখনো প্রকৃত উন্নয়ন বলা যায় না।

প্রশ্ন: বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সম্পর্ক যেভাবে এগোচ্ছে, আপনি সেটিকে কীভাবে দেখছেন?

শেখ হাসিনা: বাংলাদেশ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হয়েছে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের স্থানীয় সহযোগীদের চালানো গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও ধ্বংসযজ্ঞ বাংলাদেশের মানুষ ভুলে যায়নি। তাই পাকিস্তানের সঙ্গে যেকোনো সম্পর্ক অবশ্যই ইতিহাসের সত্যকে স্বীকার করার ভিত্তিতে হওয়া উচিত।

কিন্তু বর্তমানে যা দেখা যাচ্ছে, তা শুধু স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নয়। কূটনৈতিক সৌহার্দ্যের নামে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে দুর্বল করার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে পাকিস্তানপন্থী শক্তিকে পুনর্বাসন, সামরিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে পাকিস্তানের প্রভাব বাড়ানো এবং তরুণদের পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দিকে আকৃষ্ট করার প্রচেষ্টা চলছে। এসবের গভীর রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। যারা বাংলাদেশকে আবার পাকিস্তানের প্রভাববলয়ে ফিরিয়ে নিতে চায়, তারা অত্যন্ত বিপজ্জনক একটি খেলা খেলছে।

প্রশ্ন: আপনার আমলে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে নিরাপত্তা, সংযোগ এবং সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতায় যে অগ্রগতি হয়েছিল, তা কি এখন ঝুঁকির মুখে বলে আপনি মনে করেন?

শেখ হাসিনা: বাংলাদেশে এমন কিছু রাজনৈতিক শক্তি আছে, যারা ভারতকে সব সময় রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। ভারতবিরোধী রাজনীতি তাদের অন্যতম প্রধান কৌশল। তারা জাতীয় স্বার্থে নয়, সংকীর্ণ রাজনৈতিক লাভের জন্য এটি করে।

আমাদের সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি, স্থলসীমান্ত চুক্তি, সমুদ্রসীমা বিরোধের নিষ্পত্তি, আঞ্চলিক ট্রানজিট ও যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সহযোগিতা, শরণার্থী প্রত্যাবাসন এবং সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতাসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি করেছে। এগুলো কোনো আকস্মিক সাফল্য ছিল না।

কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাস এবং বর্তমান সরকারের সময়ে তারা এ ধরনের একটি উল্লেখযোগ্য চুক্তিও দেখাতে পারেনি। এখন মানুষ সেই প্রচারণার বাস্তবতা বুঝতে পারছে। বাংলাদেশে যদি উগ্রবাদ বাড়ে, সংখ্যালঘুরা যদি ভয়ের মধ্যে বসবাস করে এবং ভারতবিরোধী রাজনীতি যদি রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা পায়, তাহলে অতীতের এসব অর্জন হুমকির মুখে পড়বে। ঢাকা ও দিল্লির উচিত স্বল্পমেয়াদি কূটনৈতিক সুবিধার বাইরে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা, গণতন্ত্র, নিরাপত্তা এবং জনগণের আস্থার বিষয়টি বিবেচনা করা।

প্রশ্ন: বর্তমান সরকার নাকি দেশের গণমাধ্যমকে আপনার বক্তব্য বা সাক্ষাৎকার প্রচার না করার নির্দেশ দিয়েছে।

শেখ হাসিনা: শুধু আমার কণ্ঠস্বর নয়, আওয়ামী লীগের কণ্ঠও রুদ্ধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আজকের বাংলাদেশে যারা মুক্তিযুদ্ধ, ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি কিংবা প্রগতিশীল মূল্যবোধের পক্ষে কথা বলেন, তাদের জনজীবন থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে। তার জায়গায় ভয়ের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। শিক্ষক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী ও অভিনয়শিল্পীদের মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হচ্ছে অথবা কর্মস্থলে উগ্রবাদী জনতার হামলার শিকার হতে হচ্ছে।

প্রশ্ন: আপনি বারবার দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা বলেছেন। কোন পরিস্থিতিতে আপনি মনে করেন সেই প্রত্যাবর্তন সম্ভব?

শেখ হাসিনা: আমি আগেই বলেছি, এ বছরই দেশে ফিরব। আমি ফিরতে চাই, কারণ বাংলাদেশ ভালো নেই এবং দেশের মানুষ কষ্টে আছে।

অসাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা দখল করা অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকার এবং সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বর্তমান বিএনপি সরকার দেশকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এখানে আইনের শাসন নেই, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নেই, গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চার বাস্তব সুযোগ নেই। মানুষের মধ্যে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আমি দেশের বাইরে থাকতে পারি না। মানুষ চায় আমি দেশে ফিরি। তারা বিশ্বাস করে, আমি তাদের এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে সহায়তা করতে পারব। তাই তাদের পাশে দাঁড়ানো আমার দায়িত্ব।

প্রশ্ন: আপনার দল কীভাবে নিজেদের পুনর্গঠন করবে?

শেখ হাসিনা: প্রতিটি বড় রাজনৈতিক দলকেই কোনো না কোনো সময় কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়। আওয়ামী লীগও এখন তেমন একটি সময় পার করছে। আমি এটিকে দলের স্বাভাবিক আত্মশুদ্ধির প্রক্রিয়া হিসেবে দেখি। যারা আদর্শের জন্য এই দলে এসেছেন, তারা এই কঠিন সময়েও আরও দৃঢ়ভাবে দলের পাশে আছেন। আর যারা ব্যক্তিগত সুবিধা, পদ বা ক্ষমতার জন্য এসেছিলেন, তারা দল বদল করে বা নীরব থেকে নিজেদের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ করছেন। এতে আওয়ামী লীগ দুর্বল হয়নি, বরং আরও পরিশুদ্ধ হয়েছে।

আমি সব সময় তরুণ নেতৃত্বকে উৎসাহ দিয়েছি। এখন অনেক তরুণ নেতা রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন, নির্যাতন ও চাপের মধ্যেও সাহসের সঙ্গে আওয়ামী লীগের পতাকা বহন করছেন। তারাই আমাদের ভবিষ্যৎ। দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে এলে নতুন কাউন্সিলের মাধ্যমে দল পুনর্গঠিত হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী, মেধাবী ও দেশপ্রেমিক তরুণদের নেতৃত্বে আনা হবে। সেই পরিকল্পনা ইতোমধ্যেই করা হয়েছে।

প্রশ্ন: আপনি বর্তমানে নয়াদিল্লিতে অবস্থান করছেন। এই কঠিন সময়ে ভারত আপনার সঙ্গে কেমন আচরণ করেছে?

শেখ হাসিনা: ভারত আমাকে সর্বোচ্চ সম্মান ও মর্যাদা দিয়েছে। আমি নিয়মিত আমার পরিবারের সদস্য, দলের নেতা-কর্মী এবং শুভানুধ্যায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছি। ভারতের জনগণ ও সরকারের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। কঠিন সময়ে তারা আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে, যেমনটি তারা ১৯৭১ সালেও করেছিল।

ভারতে অবস্থান করলে সেই ইতিহাস আরও গভীরভাবে মনে পড়ে। বাংলাদেশ যখনই সংকটে পড়েছে, তখনই ভারত ও বাংলাদেশের মানুষের সম্পর্ক শুধু কূটনৈতিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি মানবিক এবং ঐতিহাসিক বন্ধনের সম্পর্ক।

প্রশ্ন: ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বা জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালসহ ভারতীয় নেতাদের সঙ্গে কি আপনার যোগাযোগ রয়েছে? বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ভারতের অবস্থানকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

শেখ হাসিনা: সব ধরনের কূটনৈতিক বা ব্যক্তিগত যোগাযোগ প্রকাশ্যে আলোচনা করা যায় না। ভারত বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী এবং ঐতিহাসিক বন্ধু। আমি নিশ্চিত, ভারতীয় নীতিনির্ধারকেরা বাংলাদেশের পরিস্থিতি খুব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। ব্যক্তিগত যোগাযোগকে আমি সংবাদের শিরোনাম বানাতে চাই না। তবে আমার বিশ্বাস, তারা বোঝেন যে বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা, ভারতের নিরাপত্তা এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক স্বার্থ একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।

প্রশ্ন: আপনার শেষ কয়েক বছরের শাসনামলে ফিরে তাকালে, এমন কিছু কি আছে যা আপনি ভিন্নভাবে করতে চাইতেন?

শেখ হাসিনা: আমাদের সময়ে সর্বত্র সমালোচনা ছিল। সংবাদপত্র, টেলিভিশন, অনলাইন মাধ্যম, টকশো এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—সব জায়গাতেই আমাকে, আমার সরকারকে এবং আমার দলকে প্রতিদিন সমালোচনা করা হতো। আমি সেই সমালোচনা শুনেছি। যেখানে সংশোধনের প্রয়োজন ছিল, সেখানে সংশোধন করেছি। শুধু সরকারের সমালোচনা করার কারণে কাউকে কখনো রাষ্ট্রের শত্রু ঘোষণা করা হয়নি।

প্রশ্ন: আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য আপনি কেমন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে অপরিহার্য মনে করেন?

শেখ হাসিনা: দুই দেশের জনগণের কল্যাণ এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্থিতিশীল ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের সঙ্গে আমরা যে আস্থার সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলাম, তার ভিত্তি ছিল সীমান্ত নিরাপত্তা, সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, যোগাযোগ ব্যবস্থা, সমুদ্রসীমা ও স্থলসীমা বিরোধের সমাধান এবং দুই দেশের মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক। প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে এমন সম্পর্কই থাকা উচিত।

প্রশ্ন: আপনার মতে, আপনি ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হওয়ার পেছনের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে বিদেশি শক্তির কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা ছিল, নাকি এটি মূলত দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট ছিল?

শেখ হাসিনা: বাংলাদেশে যা ঘটেছে, সেটিকে শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট বলে ব্যাখ্যা করা যায় না। আবার এটিকে সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র আন্দোলন বলেও সৎভাবে বর্ণনা করা সম্ভব নয়। শুরু থেকেই বাংলাদেশবিরোধী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী, উগ্রবাদী নেটওয়ার্ক, বিএনপি-জামায়াত জোটের সংগঠিত অংশ এবং সুযোগসন্ধানী বিভিন্ন মহল সক্রিয় ছিল। একই সঙ্গে প্রচারযুদ্ধ, অর্থায়ন, আন্তর্জাতিক চাপ এবং ভূরাজনৈতিক স্বার্থের বিষয়গুলোও উপেক্ষা করা যায় না।

মুহাম্মদ ইউনূস যুক্তরাষ্ট্রে ক্লিনটন ফাউন্ডেশনের একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিয়ে এই আন্দোলনকে একটি ‘অত্যন্ত সুচিন্তিত পরিকল্পনার ফল’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। তিনি বলেন, এটি একজন ‘মাস্টারমাইন্ডের’ নির্দেশনায় পরিচালিত হয়েছিল। তার নিজের এই বক্তব্যই ঘটনার প্রকৃতি সম্পর্কে অনেক কিছু বলে দেয়।

যদি কোনো আন্দোলন অত্যন্ত পরিকল্পিত হয় এবং কোনো ‘মাস্টারমাইন্ডের’ নেতৃত্বে পরিচালিত হয়, তাহলে সেটিকে আর স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র আন্দোলন বলা যায় না। তখন সেটি একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক অভিযান হয়ে দাঁড়ায়। ২০২৪ সালের কোটা আন্দোলনকে কেবল একটি আড়াল বা উপলক্ষ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।

তাই আমার উত্তর স্পষ্ট—দেশীয় ষড়যন্ত্রকারীরা সক্রিয় ছিল, তবে তারা প্রচারযুদ্ধ, অর্থায়ন, আন্তর্জাতিক চাপ এবং ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের সমর্থন পেয়েছিল। পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করার জন্য অত্যন্ত পরিকল্পিত একটি উদ্যোগ।


দ্য আউটলুক
Visited 23 times, 1 visit(s) today