৪০০ বিলিয়ন রপ্তানির কানাডা বলছে ‘না’, অথচ ৮ বিলিয়ন রপ্তানির বাংলাদেশ মানছে সব মার্কিন শর্ত

৪০০ বিলিয়ন রপ্তানির কানাডা বলছে ‘না’, অথচ ৮ বিলিয়ন রপ্তানির বাংলাদেশ মানছে সব মার্কিন শর্ত
শেয়ার করুন

❐ আন্তর্জাতিক ডেস্ক


যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরোপিত নতুন শুল্কের বিরুদ্ধে কড়া জবাব দিতে যাচ্ছে কানাডা। প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি নিশ্চিত করেছেন, আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর “ডলারের বিপরীতে ডলার” ভিত্তিতে সমপরিমাণ শুল্ক আরোপ করবে কানাডা। ইস্পাত, দুগ্ধজাত পণ্য, গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি ও ইলেকট্রনিক্স খাত এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

কার্নি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা এখন একটি বাণিজ্য যুদ্ধের মধ্যে রয়েছে। শনিবার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “তারা অনেক বেশি চেয়েছে, কিন্তু দিয়েছে খুবই সামান্য। আপনি যখন আক্রান্ত হন, তখনই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। আমরা আক্রান্ত হয়েছি।”

আলোচনা যেভাবে ভেস্তে গেল

সপ্তাহের শুরুতে উভয় দেশই একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর ব্যাপারে আশাবাদী ছিল। তবে শুক্রবার রাতে আলোচনা ভেঙে পড়ে, যখন উভয় পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে শেষ মুহূর্তে শর্ত পরিবর্তনের অভিযোগ তোলে।

এরপরই যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ২,০০০ কোটি ডলার মূল্যের কানাডীয় পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর করে, যার মধ্যে রয়েছে ওয়াইন, আসবাবপত্র, দুগ্ধজাত পণ্য, সিমেন্ট, পোশাক ও হকি সরঞ্জাম।

জবাবে কানাডাও একই পরিমাণ মূল্যের মার্কিন পণ্যের ওপর শুল্ক বসানোর ঘোষণা দেয়, যা কার্যকর হবে ৮ সেপ্টেম্বর থেকে।

কানাডার নাগরিকদের উদ্দেশে মার্কিন নাগরিকদের বার্তা

“৫১তম রাজ্য হব না” — কার্নির দৃঢ় ঘোষণা

সাম্প্রতিক উত্তেজনার মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী কার্নি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, কানাডা কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম রাজ্যে পরিণত হবে না। তিনি বলেন, ওয়াশিংটন থেকে যে ঝড় বয়ে আসছে, তা কানাডা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলেও নিজস্ব পথ তৈরি করবে এবং বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য সম্পর্ক বৈচিত্র্যময় করবে।

“মেড ইন কানাডা” পণ্য কেনার আহ্বান

এই বাণিজ্য সংকটের মধ্যে কানাডার শিল্পমন্ত্রী মেলানি জোলি দেশটির নাগরিকদের প্রতি মার্কিন পণ্যের পরিবর্তে দেশীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্য কেনার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “একটি শক্তিশালী কানাডাই আমাদের একমাত্র বিকল্প।”

সরকারের এই আহ্বান মূলত কানাডীয় অর্থনীতিকে মার্কিন নির্ভরতা থেকে বের করে আনার বৃহত্তর কৌশলের অংশ, যার আওতায় দেশীয় শিল্প ও উৎপাদনকে উৎসাহিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: একটি বৈপরীত্য

বছরে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৪০০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি করা কানাডার মতো ধনী ও প্রভাবশালী রাষ্ট্র যেখানে মার্কিন শুল্কের বিরুদ্ধে সমানে-সমান জবাব দেওয়ার সামর্থ্য ও রাজনৈতিক সাহস দেখাচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের বার্ষিক রপ্তানি আয় মাত্র প্রায় ৮০০ কোটি ডলার—কানাডার অর্থনীতির তুলনায় নগণ্য। এই সীমিত রপ্তানি বাজার টিকিয়ে রাখতে গিয়ে বাংলাদেশকে গত ফেব্রুয়ারিতে (৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬) যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি “পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি” স্বাক্ষর করতে হয়েছে, যার মাধ্যমে শুল্কহার ৩৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশে আনা হয়েছে।

তবে এই স্বস্তির বিনিময়ে বাংলাদেশকে মেনে নিতে হয়েছে বিশাল অঙ্কের ক্রয়-বাধ্যবাধকতা। চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ বিমান বোয়িং থেকে ২৫টি পর্যন্ত উড়োজাহাজ কিনবে (ইতিমধ্যে ১৪টির জন্য প্রায় ৩৭০ কোটি ডলারের চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে), আগামী ১৫ বছরে প্রায় ১৫০০ কোটি ডলারের এলএনজি আমদানি করবে, এবং গম, সয়াবিনসহ বিভিন্ন মার্কিন কৃষিপণ্য কিনবে।

বিশ্লেষকদের হিসাবে, মোট ক্রয়-বাধ্যবাধকতার পরিমাণ প্রায় ২১৫০ কোটি ডলার—যা বাংলাদেশের মোট মার্কিন রপ্তানি আয়ের প্রায় আড়াই গুণেরও বেশি। পাশাপাশি মার্কিন পণ্যমান স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়া, জিএমও কৃষিপণ্যের বাজার উন্মুক্ত করা এবং ভর্তুকির তালিকা ডব্লিউটিওতে জমা দেওয়ার মতো শর্তও যুক্ত হয়েছে চুক্তিতে।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এত বড় মূল্য দেওয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়েনি, বরং কমেছে। মার্কিন বাণিজ্য বিভাগের তথ্য (ওটেক্সা) অনুযায়ী, চুক্তি স্বাক্ষরের পর জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে রপ্তানি কমেছে ৮ দশমিক ৫৩ শতাংশ, মার্চে একক মাসে কমেছে ৮ দশমিক ০৮ শতাংশ, এবং প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) সার্বিকভাবে কমেছে ৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ।

জানুয়ারি-জুন সময়ে সামগ্রিক তৈরি পোশাক রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশ কমে গেছে। এই সময়ে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার মতো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো বরং প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পেরেছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, চুক্তির শর্ত মেনে বিপুল অর্থ ব্যয় করেও কাঙ্ক্ষিত রপ্তানি প্রবৃদ্ধি না পাওয়া বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক দর-কষাকষির দুর্বল অবস্থানকেই তুলে ধরে। বিপরীতে কানাডার মতো অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশ নিজস্ব শর্তে পাল্টা শুল্ক আরোপ করে সার্বভৌম অবস্থান বজায় রাখতে পারছে—যা ছোট ও রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির পক্ষে কার্যত অসম্ভব।

এখন পরিস্থিতি কী

মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার জানিয়েছেন, আপাতত কানাডার সঙ্গে নতুন কোনো আলোচনার পরিকল্পনা নেই যুক্তরাষ্ট্রের। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কানাডার বাণিজ্যনীতির সমালোচনা করে বলেছেন, কানাডা বহু বছর ধরে মার্কিন কৃষকদের ওপর ব্যাপক শুল্ক আরোপ করে আসছে।

দুই ঘনিষ্ঠ মিত্র ও বাণিজ্য অংশীদারের মধ্যকার এই উত্তেজনা আগামী দিনে আরও কীভাবে গড়ায়, সেদিকে নজর রাখছে বিশ্ব অর্থনীতি বিশ্লেষকরা।

Visited 171 times, 1 visit(s) today