জেলা প্রতিনিধি
জামালপুরের বকশীগঞ্জে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক শিক্ষক দেলোয়ার হোসেনের (৮৫) দাফনে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া হয়নি।
উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ও উপজেলা বিএনপির মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক নওশেদ আলীসহ কয়েকজনের আপত্তির কারণে শেষ মুহূর্তে গার্ড অব অনার দেওয়া স্থগিত করা হয় বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
বৃহস্পতিবার বিকেলে সাধুরপাড়া ইউনিয়নের মদনেরচর গ্রামে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দেলোয়ার হোসেনকে দাফন করা হয়।
প্রশাসন জানিয়েছে, রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়ার জন্য পুলিশসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়ে ঘটনাস্থলের দিকে যাচ্ছিলেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আসমা উল হুসনা। পথে নওশেদ আলীসহ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা তাদের গতিরোধ করে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা না দেওয়ার দাবি জানান। পরে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে গার্ড অব অনার স্থগিত করা হয়।
নওশেদ আলীর দাবি, দেলোয়ার হোসেন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা নন। নিয়মবহির্ভূতভাবে তাঁর নাম মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানের কথা বিবেচনা করেই তিনি রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদানে আপত্তি জানিয়েছেন বলে দাবি করেন নওশেদ।
তবে দেলোয়ার হোসেনের পরিবারের দাবি, তিনি দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেয়ে আসছিলেন।
তাঁর ছেলে শামীম মিয়া বলেন, কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার বাধার কারণে তাঁর বাবাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ছাড়াই দাফন করতে হয়েছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, দেলোয়ার হোসেনের মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে যদি কোনো আইনগত বা প্রশাসনিক আপত্তি থেকে থাকে, সেটি সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই ও নিষ্পত্তির বিষয়। একজন রাজনৈতিক নেতা বা স্থানীয় কোনো ব্যক্তির আপত্তির ভিত্তিতে একজন স্বীকৃত মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় মর্যাদা বন্ধ করা কতটা যুক্তিসংগত—এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বকশীগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি আবদুল লতিফ লায়ন বলেন, দেলোয়ার হোসেন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেতেন।
তিনি বলেন, ‘তিনি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা না হলে এতদিন কীভাবে এসব সরকারি সুবিধা পেয়েছেন? সরকার যেখানে তাঁকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সম্মানি দিচ্ছে, সেখানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দিতে বাধা দেওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক।’
এদিকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ঠেকানোর ক্ষেত্রে নওশেদ আলীর ভূমিকা নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তিনি একই সঙ্গে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার এবং উপজেলা বিএনপির মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক। ফলে তাঁর ব্যক্তিগত আপত্তি, সাংগঠনিক অবস্থান এবং মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের দায়িত্ব—এই তিনটি বিষয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
তবে দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে তাঁর কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ বা ব্যক্তিগত স্বার্থের সম্পর্ক ছিল কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
সহকারী কমিশনার (ভূমি) আসমা উল হুসনা বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়ার সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। পথে নওশেদ আলীসহ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা তীব্র আপত্তি জানান। তাঁদের বাধার মুখে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে তাৎক্ষণিকভাবে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদান স্থগিত করা হয়। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
দেলোয়ার হোসেন সাধুরপাড়া নজরুল ইসলাম উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি। বুধবার দিবাগত রাত ৩টার দিকে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়।
