চুক্তির শর্ত প্রকাশ না করেই হস্তান্তরের চুক্তি স্বাক্ষর,
বন্দর অচল করার হুঁশিয়ারি শ্রমিকদের
নিজস্ব প্রতিবেদক। ৮ অক্টোবর, ২০২৬। ঢাকা
দেশের সবচেয়ে বড় কনটেইনার হ্যান্ডলিং স্থাপনাগুলোর একটি চট্টগ্রাম বন্দরের নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি)। গত বছর চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনার ওঠানামার প্রায় ৪৪ শতাংশ পরিচালিত হয়েছে এই টার্মিনালে। বছরে প্রায় ১৩ লাখ TEU কনটেইনার হ্যান্ডলিং করা এই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব আগামী ১৫ বছরের জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক DP World-এর হাতে তুলে দিতে যাচ্ছে সরকার।
কিন্তু দেশের গুরুত্বপূর্ণ ও আয়সম্ভাবনাময় এই স্থাপনা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার অর্থনৈতিক যুক্তি কী, চুক্তি থেকে বাংলাদেশ কতটা আর্থিক সুবিধা পাবে এবং বিদ্যমান শ্রমিকদের কর্মসংস্থান কতটা সুরক্ষিত থাকবে—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর ছাড়াই চুক্তি সইয়ের উদ্যোগ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
শ্রমিক সংগঠনগুলোর ধারাবাহিক প্রতিবাদ, চুক্তির শর্ত প্রকাশের দাবি এবং প্রয়োজনে বন্দর অচল করে দেওয়ার হুঁশিয়ারির মধ্যেই গতকাল (বুধবার) বিকেল ৩টায় রাজধানীতে ইনভেস্ট বাংলাদেশের অডিটোরিয়ামে চুক্তি সইয়ের কথা রয়েছে। সরকারের দাবি, এই উদ্যোগ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ, দক্ষতা ও আধুনিক বন্দর ব্যবস্থাপনার নতুন সুযোগ তৈরি করবে। তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা বাড়ানোর বিনিময়ে যদি রাষ্ট্রের রাজস্ব ও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কিংবা শ্রমিকদের চাকরি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তাহলে সেই প্রবৃদ্ধির সুফল শেষ পর্যন্ত কার ঘরে যাবে?
তিনটি বড় প্রশ্নে চুক্তি
১. রাষ্ট্রের আর্থিক লাভ কতটা?
চুক্তির আর্থিক শর্ত, রাজস্ব ভাগাভাগি, ফি ও অন্যান্য দায় প্রকাশ না হলে বিদেশি অপারেটর নিয়োগে রাষ্ট্রের প্রকৃত লাভ-ক্ষতি নির্ধারণ করা কঠিন।
২. শ্রমিকদের চাকরি কি সুরক্ষিত?
বিদেশি ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়লেও কর্মীসংখ্যা কমানো হলে শ্রমিকদের জীবিকা ও স্থানীয় কর্মসংস্থানের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। চাকরি সুরক্ষার নিশ্চয়তা তাই চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
৩. প্রবৃদ্ধির সুফল পাবে কে?
দ্রুত পণ্য খালাস, কম লজিস্টিক ব্যয় ও বেশি বাণিজ্য অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক হতে পারে। কিন্তু সেই সুবিধার বিপরীতে রাষ্ট্রের আয়, শ্রমিকের অধিকার ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের হিসাবও প্রকাশ করা প্রয়োজন।
২০ হাজার শ্রমিকের উদ্বেগ
বাংলাদেশ লেবার ওয়েলফেয়ার ফেডারেশন চট্টগ্রাম, শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ ও বন্দর রক্ষা কমিটি পৃথক বিবৃতিতে সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছে। তাদের দাবি, চুক্তি সইয়ের আগে শ্রমিক, বন্দর ব্যবহারকারী, বিশেষজ্ঞ ও অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। একই সঙ্গে চুক্তির শর্ত, পরিচালনাগত অধিকার, আর্থিক দায় এবং শ্রমিকদের অধিকার-সংক্রান্ত বিধান প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন তারা।
শ্রমিক নেতাদের আশঙ্কা, প্রায় ২০ হাজার বন্দর শ্রমিক ও কর্মচারীর উদ্বেগ উপেক্ষা করা হলে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকনও চুক্তির আগে সরকারের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার দাবি জানিয়েছেন। চুক্তি সই হলে বন্দর কার্যক্রম ও জাহাজ চলাচল বন্ধের হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবাদ ও বিবৃতি
অর্থনীতিবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ এই সিদ্ধান্তকে জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেছেন। তার মতে, একটি নির্বাচিত সরকারের উচিত চুক্তি সইয়ের আগে এর শর্ত জনগণের সামনে প্রকাশ করা। তিনি আগের শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত বর্তমান সরকার এগিয়ে নিয়ে যাওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন।
পতেঙ্গা ও লালদিয়ার পর এবার এনসিটি
চট্টগ্রাম বন্দরে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। সৌদি আরবভিত্তিক Red Sea Gateway Terminal ২২ বছরের কনসেশনের আওতায় পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা করছে। ডেনমার্কভিত্তিক APM Terminals দীর্ঘমেয়াদি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের আওতায় লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের দায়িত্ব পেয়েছে।
এনসিটিও বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে গেলে বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর পরিচালনায় বিদেশি অংশগ্রহণ আরও বাড়বে। তাই শুধু দ্রুত ও দক্ষ পরিচালনা নয়, চুক্তির স্বচ্ছতা, রাষ্ট্রের রাজস্ব, শ্রমিকদের চাকরির নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
দক্ষতা বাড়লেই কি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি?
বিদেশি অপারেটর নিয়োগ মানেই অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়। উন্নত প্রযুক্তি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও দ্রুত পণ্য খালাসের মাধ্যমে বন্দরের কার্যকারিতা বাড়লে বাংলাদেশ লাভবান হতে পারে। কিন্তু সেই সম্ভাব্য লাভ যাচাই করতে কয়েকটি তথ্য অপরিহার্য:
-
বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে কত ফি বা রাজস্ব দিতে হবে?
-
রাষ্ট্র কী পরিমাণ আয় পাবে এবং কী কী আর্থিক ঝুঁকি বহন করবে?
-
বর্তমান শ্রমিকদের চাকরি, বেতন, জ্যেষ্ঠতা ও অন্যান্য অধিকার কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে?
-
রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় এনসিটির কার্যক্রম উন্নত করার বিকল্পের সঙ্গে বিদেশি অপারেটরের প্রস্তাব তুলনা করা হয়েছে কি?
-
চুক্তির মেয়াদ শেষে সম্পদ, পরিচালনাগত নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক সুবিধার বণ্টন কীভাবে হবে?
এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া চুক্তিকে অর্থনৈতিক সাফল্য বা ব্যর্থতা—কোনোটিই নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। তবে শর্ত প্রকাশ না করে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করা হলে জবাবদিহি ও জনস্বার্থ নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
শেষ পর্যন্ত মূল প্রশ্ন একটাই: বন্দরের দক্ষতা বাড়ানোর নামে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার আগে সরকার কি প্রমাণ করতে পারবে যে এতে দেশের আয় বাড়বে, বাণিজ্য সহজ হবে এবং শ্রমিকদের কর্মসংস্থান অযথা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না? জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর চুক্তি সইয়ের আগেই স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
