ঋণমানের আউটলুক নেতিবাচক, নতুন বিদেশি বিনিয়োগে ভাটা; ব্যাংকঋণ ও বিদেশি ঋণনির্ভর হচ্ছে সরকার

ঋণমানের আউটলুক নেতিবাচক, নতুন বিদেশি বিনিয়োগে ভাটা; ব্যাংকঋণ ও বিদেশি ঋণনির্ভর হচ্ছে সরকার
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা | ১৩ অক্টোবর ২০২৬


ব্যাংক খাতের সংকট ও ঋণমানের চাপের মধ্যে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী এপ্রিল-জুনে নতুন ইক্যুইটি বিনিয়োগ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪.৭৭ শতাংশ কমে ৭ কোটি ৭৪ লাখ ডলারে নেমেছে। তবে একই সময়ে পুনর্বিনিয়োগের জোরে মোট নিট এফডিআই ১২.৭৮ শতাংশ বেড়ে ৩৪ কোটি ৬৯ লাখ ডলার হয়েছে। অর্থাৎ বিদ্যমান বিদেশি কোম্পানিগুলোর মুনাফা পুনর্বিনিয়োগই মোট প্রবাহকে ধরে রেখেছে, নতুন বিনিয়োগকারী আসছেন না।

রাজস্ব ঘাটতি বাড়ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এনবিআর সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৮৭ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা কম আদায় করেছে। আদায় আগের বছরের চেয়ে ১২ শতাংশ বাড়লেও লক্ষ্য পূরণ হয়নি। এর ওপর চলতি অর্থবছরে এনবিআরকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে, যার জন্য ৪৫ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি দরকার। ঘাটতি মেটাতে সরকার ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিচ্ছে। গত মার্চেই সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ বার্ষিক লক্ষ্যের ৯৮.৫ শতাংশে পৌঁছে যায়। নতুন অর্থবছরের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ১.১২ ট্রিলিয়ন টাকা।

ব্যাংক খাতের অবস্থাও দুর্বল। জুন শেষে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা মোট ঋণের ৩২.৭৮ শতাংশ। জুনে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ৪.৪৭ শতাংশে নেমে রেকর্ড সর্বনিম্ন হয়েছে।

এসব কারণে ঋণমান সংস্থাগুলো সতর্ক হয়েছে। ফিচ মে মাসে বাংলাদেশের আউটলুক নেতিবাচক করেছে এবং ‘বি প্লাস’ রেটিং বহাল রেখেছে। জুলাইয়ে এস অ্যান্ড পি দুর্বল ব্যাংক খাত, রাজস্ব সীমাবদ্ধতা ও বাহ্যিক ঝুঁকির কারণে আউটলুক নেতিবাচক করেছে। উল্টো দিকে মুডিজ সম্প্রতি আউটলুক নেতিবাচক থেকে স্থিতিশীল করেছে, তবে কাঠামোগত দুর্বলতা রয়ে গেছে বলে জানিয়েছে।

বিদেশি ঋণের চাপও বাড়ছে। আইএমএফ প্রথমবারের মতো ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য বিদেশি ঋণ গ্রহণের সীমা ৮৪৪ কোটি ডলার বেঁধে দিয়েছে।

আয় কমতির মধ্যে চড়া সুদ ও কড়া শর্তের বিদেশি ঋণের পরিণতি

২৪ নভেম্বর বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণ করবে, ফলে বিশ্বব্যাংকের আইডিএ ও এডিবির রেয়াতি ঋণ ধীরে ধীরে বাজারভিত্তিক শর্তে যাবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আগের হিসাবে এলডিসি হিসেবে গড় সুদ ছিল ১.১ শতাংশ, আর উত্তরণের পর ৩০ বছরের পরিশোধকাল অর্ধেক হবে।

প্রতি ১০০ কোটি ডলার ঋণে ১-২% সুদে বছরে সুদ লাগে ১ থেকে ২ কোটি ডলার। সুদ ৬-৮% হলে তা ৬ থেকে ৮ কোটি ডলার হয়। গ্রেস পিরিয়ড ছোট হলে আসলও আগে শোধ করতে হয়। অর্থাৎ একই ঋণের বোঝা কয়েক গুণ বাড়ে।

 

ঋণ দিয়ে ঋণ শোধের ফাঁদ।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে প্রাপ্ত বিদেশি ঋণের ৮৯ শতাংশ গেছে আগের ঋণ ও সুদ পরিশোধে। বার্ষিক বিদেশি ঋণ পরিশোধ ২০২৯ সালের মধ্যে দ্বিগুণ হবে বলে একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে। তাই নতুন ঋণ উন্নয়নে কম, পুরোনো দেনা মেটাতে বেশি খরচ হয়।

রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ৮ শতাংশের নিচে, যা এশিয়ার সর্বনিম্নগুলোর একটি। ২০২৪ অর্থবছরে ঋণ-রপ্তানি অনুপাত ১৬২.৭ শতাংশে উঠেছিল, যা আইএমএফের আগের প্রক্ষেপণ ১১৬-১১৮ শতাংশের চেয়ে অনেক বেশি। আয় ও রপ্তানির তুলনায় ঋণ বাড়লে ঝুঁকি বাড়ে, আর তখন ঋণদাতারা সুদ বেশি চায়।

বিদেশি ঋণ কম পড়লে সরকার ব্যাংকের ওপর আরও ঝুঁকবে। অর্থনীতিবিদদের সংগঠন বিইএ সতর্ক করেছে যে এতে বেসরকারি খাতের ঋণের জায়গা সংকুচিত হবে। ফলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান কমে, আর রাজস্ব বাড়ার সম্ভাবনাও কমে।

এস অ্যান্ড পি সতর্ক করেছে, বাহ্যিক ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়লে রেটিং আরও নামতে পারে। রেটিং নামলে নতুন ঋণ আরও ব্যয়বহুল হয় এবং এলসি খরচও বাড়ে।

সংকট আসন্ন বলার সুযোগ নেই। জুন শেষে মোট রিজার্ভ ৩৭.৫৮ বিলিয়ন ডলার ছিল এবং এপ্রিল-জুনে রেমিট্যান্স এসেছে ৯.৩৮ বিলিয়ন ডলার। ঋণ-জিডিপি অনুপাত এখনো আইএমএফের “নিরাপদ” সীমার মধ্যে। তাই এটি ঝুঁকি, সংকট নয়। তবে নীতিগত ভুল হলে ঝুঁকি সংকটে বদলাতে পারে।

 

Visited 2 times, 2 visit(s) today