❐ নিজস্ব প্রতিবেদক
ভোক্তা পর্যায়ে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম বাড়ানোর নতুন প্রস্তাব দিয়েছে সরকারি ও বেসরকারি খাতের একাধিক প্রতিষ্ঠান। একই সঙ্গে এলপিজি মজুদ ও বোতলজাতকরণ খরচ এবং পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাবও এসেছে।
এসব প্রস্তাবের ওপর আগামী ২৯শে অক্টোবর গণশুনানি করবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। শুনানিতে প্রস্তাবগুলো অনুমোদন পেলে এলপিজির দাম ও বাজারজাতকরণ ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
বিইআরসির বুধবারের গণবিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ২৯শে অক্টোবর সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত রাজধানীর নিউ ইস্কাটনে বিয়াম ফাউন্ডেশনের শহীদ এ কে এম শামসুল হক খান মেমোরিয়াল হলে এ শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।
আগ্রহী ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাকে প্রস্তাবের বিষয়ে লিখিত মতামত দিতে এবং শুনানিতে অংশ নিতে আগামী ২৭শে অক্টোবরের মধ্যে নিবন্ধন করতে বলা হয়েছে।
কমিশন জানিয়েছে, রাষ্ট্রায়ত্ত এলপি গ্যাস লিমিটেড (এলপিজিএল) সরকারি এলপিজির বর্তমান দাম পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছে।
অন্যদিকে বেসরকারি খাতের কয়েকটি মজুদ ও বোতলজাতকারী প্রতিষ্ঠান এলপিজির দাম, মজুদ ও বোতলজাতকরণ খরচ এবং পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন পরিবর্তনের প্রস্তাব করেছে। কয়েকটি পরিবেশক প্রতিষ্ঠানও কমিশন বাড়ানোর জন্য পৃথক প্রস্তাব জমা দিয়েছে।
গণশুনানিতে এসব প্রস্তাবের যৌক্তিকতা, সংশ্লিষ্ট ব্যয় ও কমিশনের হিসাব পর্যালোচনা করা হবে। নিবন্ধিত অংশগ্রহণকারীরা এ বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত ও প্রয়োজনীয় নথি উপস্থাপনের সুযোগ পাবেন। তবে প্রস্তাবগুলোর বিপরীতে কমিশন কী সিদ্ধান্ত নেবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
এরই মধ্যে চলতি মাসে বেসরকারি এলপিজির দাম এক দফা বেড়েছে। গত ৪ঠা অক্টোবর ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করে বিইআরসি। এর আগে সেপ্টেম্বরে একই সিলিন্ডারের দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা।
অন্যদিকে সরকারি সাড়ে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম অপরিবর্তিত রেখে ৭৭৬ টাকা ৯৩ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে।
নির্ধারিত দাম বাড়লেও বাজারে সেই দামে এলপিজি না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এরমধ্যে নতুন করে দাম ও কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাব সামনে আসায় ভোক্তাদের ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে রান্নার জ্বালানি হিসেবে এলপিজির ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে।
এদিকে, কমিশন বাড়ানোর দাবিতে আগামী ১৫ ও ১৬ই অক্টোবর সারা দেশে এলপিজি বিক্রয় প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার কর্মসূচি দিয়েছিল এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড।
তবে বুধবার বিইআরসি চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠকের পর কর্মসূচি প্রত্যাহার করে সংগঠনটি। সমিতির ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যবসায়ীদের দাবি পর্যালোচনা ও সমাধানের লক্ষ্যে গণশুনানি আয়োজনের আশ্বাস পাওয়ার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২১ সালের ১২ই এপ্রিল প্রথমবারের মতো সরকারি ও বেসরকারি এলপিজির দাম নির্ধারণ করে বিইআরসি। পরে বেসরকারি এলপিজির ক্ষেত্রে সৌদি আরামকোর ঘোষিত মাসিক চুক্তিমূল্যের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রতি মাসের প্রথম সপ্তাহে দাম নির্ধারণের ব্যবস্থা চালু হয়।
নতুন গণশুনানিতে দাম ও কমিশনসংক্রান্ত প্রস্তাবগুলোর বিষয়ে কমিশনের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে এলপিজির পরবর্তী মূল্য পরিস্থিতি।
৭ মাসে মূল্যবৃদ্ধি ৩৫%: এলপিজি সিন্ডিকেটের কাছে কি সরকার জিম্মি নাকি গোপন সমঝোতা?
রান্নার জ্বালানি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) নিয়ে ব্যবসায়ীদের কাছে সরকার কার্যত জিম্মি হয়ে পড়েছে। তাদের চাপেই বর্তমান সরকারের সাড়ে সাত মাসে এই অত্যাবশ্যকীয় জ্বালানির দাম বেড়েছে ৩৫ শতাংশ। তারপরও ক্রেতাদের সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ২৫০ থেকে ৪০০ টাকা বেশি দিয়ে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে।
দফায় দফায় দাম বাড়িয়ে ১২ কেজি সিলিন্ডারের মূল্য ১,৮৩৭ টাকা ঠিক করা হলেও দেশের কোথাও এই দামে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বলতার সুযোগ কাজে লাগিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা ১,৮৩৭ টাকার সিলিন্ডার বিক্রি করছেন ২,২০০ থেকে ২,৩০০ টাকায়। ফলে ভোক্তার খরচ প্রতিদিনই বাড়ছে।
আর এ কারণেই নাভিশ্বাস চরমে পৌঁছে যাওয়া ভোক্তাদের অভিযোগ, সরকারের একটি অংশ এলপিজি কোম্পানিগুলোর সাথে সমঝোতার মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ কেটে নিচ্ছে জনগণের পকেট থেকে। নইলে এই সিন্ডিকেট ভাঙা দূরে থাক, সিন্ডিকেটের কথা স্বীকার পর্যন্ত করছে না সরকার।
বাজার ঘুরে সাধারণ ভোক্তাদের এমন প্রতিক্রিয়া মিলেছে।
এলপিজির গ্রাহক দেশে এক কোটির বেশি। পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহে সংকট থাকায় অনেককে বাধ্য হয়েই এলপিজির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। তাই বাড়তি দামের চাপ সামলাতে হচ্ছে তাদেরই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না, এটাই এর কারণ।
এলপিজি আমদানিতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) সক্ষমতা দেখাতে পারছে না, এমন অভিযোগও আছে। বেসরকারি আমদানিকারকরা যেখানে প্রায় ২০০ ডলারে এলপিজি আনছেন, সেখানে বিপিসির জন্য চাওয়া হচ্ছে ২৭০ ডলার।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর কয়েকটি বাজার ঘুরে এবং বিভিন্ন পর্যায়ের ক্রেতা-বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, সরকার নির্ধারিত দামে দেশের কোথাও এলপিজি মিলছে না।
খুচরা বিক্রেতাদের বক্তব্য, চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস তারা কিনতে পারছেন না, কারণ কোম্পানিগুলো ঠিকমতো সরবরাহ দিচ্ছে না। তাই বিকল্প পথে বাড়তি দামে সিলিন্ডার কিনে সামান্য লাভ রেখে তারা সেগুলো বাড়তি দামেই বিক্রি করছেন।এ
খুচরা বিক্রেতাদের এই অভিযোগ মানছেন না পাইকারি বিক্রেতারা। তাদের ভাষ্য, খুচরা বিক্রেতাদের হাতে আগে থেকেই গ্যাস মজুদ থাকায় পিলার পয়েন্ট থেকে নতুন করে গ্যাস তুলতে তারা আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।
ডিলার ও ডিস্ট্রিবিউটরদের অভিযোগ, চাহিদামতো সিলিন্ডার দিচ্ছেন না অপারেটররা। এ নিয়ে অপারেটর, ডিস্ট্রিবিউটর ও ডিলারদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ থাকলেও প্রকাশ্যে মুখ খুলতে কেউ রাজি নন।
খুচরা বিক্রেতারা এর কারণ ব্যাখ্যা করে বলছেন, বড়দের বিরুদ্ধে কথা বললে বর্তমানে যে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে, সেটুকুও বন্ধ হয়ে যাবে। তাদের অভিযোগ, আমদানি ও মজুদ থাকা সত্ত্বেও প্ল্যান্ট থেকে সরবরাহ সীমিত রাখা হচ্ছে। ফলে ডিস্ট্রিবিউটররা প্রয়োজনীয় পণ্য পাচ্ছেন না, আর তার প্রভাব গিয়ে পড়ছে খুচরা বাজারে।
অপারেটরদের দাবি, দেশে এলপিজি পর্যাপ্তই আছে। তাদের মতে, সরবরাহ কমে যাওয়ার সুযোগে ডিস্ট্রিবিউটর, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের একাংশ সিলিন্ডার মজুদ করে বেশি দামে বিক্রি করছেন। সমস্যাটি খুচরা পর্যায়ের বিক্রেতাদের কারণেও তৈরি হয়ে থাকতে পারে।
বাংলাদেশ এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের (লোয়াব) সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক জানান, কোনো অপারেটর বেশি দামে বিক্রি করছে—এমন প্রমাণ মিললে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি), প্রতিযোগিতা কমিশন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও বিএসটিআইসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কার্যকর নজরদারি চালাক।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এম শামসুল আলমের দাবি, বিইআরসি ব্যবসায়ীদের সুযোগ করে দিচ্ছে।
তিনি বলেন, ২০২১ সালের আগে ব্যবসায়ীরা ইচ্ছামতো দামে এলপিজি বিক্রি করতেন। আদালতের আদেশে দাম ঠিক করার ক্ষমতা পায় বিইআরসি। কিন্তু ব্যবসায়ীদের চাপে তারা আশপাশের দেশগুলোর চেয়ে বেশি দাম নির্ধারণ করে দেয়, তারপরও সেটা কার্যকর করতে পারে না।
সাত মাসে দাম বেড়েছে ৩৫ শতাংশ
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তারেক রহমানের বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় এলপিজির প্রতি কেজির দাম ছিল ১১৩ টাকা, আর ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ১,৩৫৬ টাকা। সাড়ে সাত মাস পর গত ৪ঠা অক্টোবর প্রতি কেজির দাম ঠিক করা হয় ১৫৩ টাকা, ফলে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম গিয়ে দাঁড়ায় ১,৮৩৭ টাকায়।
মাঝের সময়ে দুই দফা কয়েক টাকা কমলেও সার্বিকভাবে এই সরকারের সাড়ে সাত মাসে এলপিজির দাম বেড়েছে ৩৫ শতাংশ। বাড়তি দামেও ক্রেতারা এলপিজি কিনতে পারছেন না বলে জনমনে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
বিইআরসি ২০২১ সালের এপ্রিলে প্রথমবার ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৯৭৫ টাকা নির্ধারণ করেছিল। তারেক রহমানের শাসনামলে চলতি বছরের এপ্রিলে দুই দফায় মোট ৫৯৯ টাকা বাড়িয়ে দাম করা হয় ১,৯৪০ টাকা। জুনে কমানো হয় ৫৫ টাকা, জুলাইয়ে ৩৫৭ টাকা।
আগস্টে ফের ৭০ টাকা বাড়িয়ে দাম ঠিক করা হয় ১,৫৯৮ টাকা। সেপ্টেম্বরে আরো ১৩ টাকা কমিয়ে তা নির্ধারণ করা হয় ১,৫৮৫ টাকায়।
দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ দাম
পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে এলপিজির দাম এখন সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশে। দেশে প্রতি কেজির দাম ১৫৩ টাকা ঠিক করা হলেও ভারতে এর ভর্তুকিমূল্য বাংলাদেশি টাকায় ৮৭, আর ভর্তুকি ছাড়া ১০৮ টাকা। পাকিস্তানে দাম ১২৪.১৬, নেপালে ১১৫.৩৫ এবং শ্রীলঙ্কায় ১১৬ টাকা।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুর তথ্য বলছে, ভর্তুকি বাদ দিলেও দেশটিতে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম থাকে ১,৩০০ টাকার আশপাশে। শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোয় সাড়ে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৪,৯৬৫ রুপি, অর্থাৎ ১,৪০০ টাকা।
পাকিস্তানে প্রতি কেজির দাম ২৭৯ রুপি। বাংলাদেশি মুদ্রায় ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম সেখানে দেড় হাজার টাকার কিছু কম। পাকিস্তানে নির্ধারিত দামের চেয়ে কিছুটা বেশিতে এলপি গ্যাস বিক্রির অভিযোগ থাকলেও ভারত, শ্রীলঙ্কা ও নেপালে মোটামুটি সরকার নির্ধারিত দামেই বিক্রি হয় বলে জানা গেছে।
নির্দিষ্ট কয়েকটি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে ৬৮ ভাগ বাজার, গোয়েন্দা তথ্যে মিলল কারসাজির প্রমাণ
বিইআরসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে এলপিজি ব্যবহৃত হয় অন্তত দেড় লাখ টন। এর ৮০ শতাংশ যায় রান্নায়, ১২ শতাংশ শিল্পে, আর ৮ শতাংশ গাড়ির জ্বালানি অটোগ্যাস হিসেবে। এলপিজির ৯৮-৯৯ ভাগ বাজার বেসরকারি উদ্যোক্তাদের দখলে।
আগস্টে দেশে আমদানি হয় এক লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০ টন এলপিজি। সেপ্টেম্বরে এসেছে দেড় লাখ টনের বেশি। দেশে মোট ২৯টি এলপিজি কোম্পানি চালু থাকলেও সেপ্টেম্বরে আমদানি করেছে কেবল ১০টি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আমদানি করেছে ইউনাইটেড আইগ্যাস।
সরকারের জ্বালানি বিভাগের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের মোট এলপিজি বাজারের ৬৮ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে মাত্র চারটি কোম্পানি—ওমেরা, পেট্রোমেক্স, মেঘনা ও যমুনা।
এ ছাড়া বিএম এনার্জির দখলে বাজারের ৮ শতাংশ, ইউনাইটেড আইগ্যাসের ৭ শতাংশ, ডেল্টার ৪ শতাংশ, আর জেএমআই ও প্রিমিয়াম এলপিজির ৩ শতাংশ করে।
শ্লেষকদের ভাষ্য, পুরো বাজার হাতে গোনা কয়েকটি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে থাকায় বাজারের ওপর যেকোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব বিস্তার তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে।
এলপি গ্যাস নিয়ে গ্রাহকদের সীমাহীন ভোগান্তির মধ্যেই সামনে এসেছে ব্যবসায়ীদের কারসাজির বিষয়টি। জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, চলমান কারসাজির সঙ্গে কিছু বড় কোম্পানি জড়িত থাকতে পারে। সরবরাহ আটকে রেখে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করা হয়ে থাকতে পারে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া ওই প্রতিবেদনে সন্দেহের তালিকায় নাম এসেছে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের—আইগ্যাস, পেট্রোম্যাক্স, বিএম এনার্জি, ওমেরা ও যমুনা।
গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এলপিজির আমদানি, মজুদ ও বাজারে সরবরাহের গোটা প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।
বিপিসির অদক্ষতা
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট ভাঙতে সরকারিভাবে এলপিজি আমদানি বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে চরম অদক্ষতার পরিচয় দিয়েছে বিপিসি।
দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষ থেকে বারবার তাগিদ আসা সত্ত্বেও গত সাড়ে সাত মাসে সংস্থাটি এক কেজি এলপিজিও আমদানি করতে পারেনি।
বিপিসি কর্মকর্তারা জানান, পাঁচ দফা দরপত্র ডাকা হলেও সরবরাহকারী পাওয়া যায়নি। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে সরবরাহকারীরা অতিরিক্ত জাহাজ ভাড়া চাওয়ায় সরবরাহকারী চূড়ান্ত করা যায়নি বলে তারা জানান।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, বেসরকারি আমদানিকারকরা নিজেদের জন্য প্রতি টন এলপিজি ২০০ ডলার জাহাজ ভাড়ায় আনলেও বিপিসির জন্য সরবরাহ করতে হলে ২৭০ ডলারের নিচে নামতে চায় না সরবরাহকারীরা।
অভিজ্ঞদের মতে, এর কারণ সরকারি প্রতিষ্ঠানে সরবরাহের ক্ষেত্রে নানা ‘লুকায়িত ব্যয়’।
মজুদ বাড়ানোর উদ্যোগ
বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামার পাশাপাশি দেশে এলপিজি সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ সরকারি কোম্পানির দুর্বলতা।
বাজার নিয়ন্ত্রণে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি বিপিসির আওতাধীন এলপিজি গ্যাস লিমিটেড নামে একটি কোম্পানিও রয়েছে। তবে দেশের মোট চাহিদার ২ শতাংশেরও কম বাজার হিস্যা এই কোম্পানির।
এর প্রধান কারণ, কোম্পানিটির মজুদ করার সক্ষমতা তেমন নেই। আশার কথা হলো, সমস্যা মেটাতে নতুন কিছু উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
বাগেরহাটের মোংলায় ৬.৩৭ একর জমিতে ৮,২০০ টন এলপিজি মজুদের ট্যাংক নির্মাণের প্রস্তুতি চলছে। টাঙ্গাইলের কালিহাতী ও রাজাবাড়ীতে ৬.৯১ একর এলাকায় মজুদ ও বটলিং প্ল্যান্ট বসানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

