আরও ৪.৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ চায় বৈদেশিক ঋণের ভারে জর্জরিত বাংলাদেশ

আরও ৪.৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ চায় বৈদেশিক ঋণের ভারে জর্জরিত বাংলাদেশ
শেয়ার করুন

❐ বিশেষ প্রতিবেদক


রাজস্ব আদায় বাড়ানো, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার ও খেলাপি ঋণ কমানোকে গুরুত্ব দিচ্ছে আইএমএফ। আগের ঋণচুক্তিতে খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য থাকলেও তা বেড়ে প্রায় ৩৩ শতাংশ হয়েছে। নতুন ঋণ কর্মসূচির শর্ত ও সংস্কারের লক্ষ্যমাত্রা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ত্রৈমাসিক কিস্তিতে ৪৫০ কোটি ডলার ঋণ নিতে চায় বাংলাদেশ। প্রস্তাবিত ঋণের পরিমাণ, কিস্তি ও শর্ত চূড়ান্ত করতে চলতি মাসের শেষ দিকে আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদলের বাংলাদেশ সফরের পর কর্মকর্তা পর্যায়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।

সবকিছু নির্ধারিত সময় অনুযায়ী এগোলে চলতি বছরের শেষ নাগাদ ঋণচুক্তি সই হতে পারে।

তবে নতুন ঋণ কর্মসূচির বিপরীতে কী ধরনের সংস্কার করতে হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা দূর করা, খেলাপি ঋণ কমানো এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনাকে গুরুত্ব দিচ্ছে আইএমএফ।

আগের ঋণ কর্মসূচিতে খেলাপি ঋণ কমানোর যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, তা অর্জিত না হওয়ায় নতুন কর্মসূচিতে সংস্কারের অগ্রগতি ও বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে ২০২৬ সালের আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভার ফাঁকে আইএমএফের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক নাইজেল ক্লার্কের সঙ্গে বৈঠক করেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বৈঠক শেষে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের কর্মকর্তারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঋণ পাওয়ার বিষয়ে আশাবাদ জানান।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিনিধিদলের একজন কর্মকর্তা বলেন, চলতি মাসের শেষ দিকে আইএমএফের স্টাফ মিশন বাংলাদেশ সফর করবে। এরপর কর্মকর্তা পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে ঋণের পরিমাণ ও শর্ত চূড়ান্ত হবে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ ঋণচুক্তি সই হতে পারে বলেও জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর প্রস্তাবিত ঋণের পরিমাণ বা কিস্তির সংখ্যা নিশ্চিত করেননি।

তিনি বলেন, কর্মকর্তা পর্যায়ের আলোচনা এবং আইএমএফের পরিচালনা পর্ষদের সভায় এসব বিষয় নির্ধারিত হবে।

তিতুমীর আরও বলেন, ২০৩০ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগেই, অর্থাৎ ২০২৯ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে সংস্কার উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। কারণ, এরপর সরকারকে জনগণের ম্যান্ডেটের মুখোমুখি হতে হবে।

অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীও বলেছেন, নতুন ঋণ কর্মসূচির জন্য কিছু শর্ত থাকবে এবং সেগুলো পূরণ করতে হবে। তবে কিছু বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানো হবে।

গতকাল ক্লার্কের সঙ্গে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের তিনি বলেন, প্রস্তাবিত কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে। এ কর্মসূচির আওতায় কী ধরনের শর্ত থাকবে এবং সেগুলো কীভাবে পূরণ করা হবে, তা নিয়ে আরও আলোচনা হবে।

রাজস্ব আদায় ও ব্যাংকিং খাতে সংস্কারে জোর

প্রস্তাবিত ঋণের পরিমাণ ৪৫০ কোটি থেকে ৫০০ কোটি ডলার হতে পারে বলে জানিয়েছেন আইএমএফের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের উপপরিচালক সোনালি জৈন-চন্দ্র। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এ ঋণ নিয়ে আলোচনায় রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি ও আর্থিক খাতের সংস্কারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে সংস্থাটি।

গতকাল এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলবিষয়ক সংবাদ সম্মেলনে জৈন-চন্দ্র বলেন, বাংলাদেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত কমে ৭ শতাংশে নেমেছে, যা বিশ্বের সর্বনিম্ন পর্যায়ের মধ্যে রয়েছে।

তিনি বলেন, আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য রাজস্ব আদায় বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের বড় সমস্যাগুলো সমাধানে কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়েছে আইএমএফ।

অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ব্যাংকিং খাত, কর-জিডিপি অনুপাত, ব্যাংকের পুনঃমূলধনীকরণ ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আইএমএফ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এসব বিষয়ে সংস্থাটির পর্যবেক্ষণের সঙ্গে বাংলাদেশও একমত। ইতিমধ্যে অনেক সমস্যার সমাধান হয়েছে এবং বাকি বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা চলবে।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধসহ বৈশ্বিক নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বাজেট-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিয়ে আইএমএফ সন্তোষ প্রকাশ করেছে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী।

তবে রাজস্ব আদায়ের দুর্বলতা ও ব্যাংকিং খাতের সংকট দীর্ঘদিনের। রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশে নেমে আসা করের আওতা সম্প্রসারণ ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতাকে সামনে এনেছে। অন্যদিকে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের উচ্চ হার এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর আমানত ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ আর্থিক খাতে আস্থা পুনরুদ্ধারের চ্যালেঞ্জ তুলে ধরছে।

নতুন ঋণ কর্মসূচিতে এসব সমস্যার সমাধানে কী পরিমাণ সংস্কার ও কত সময়সীমা নির্ধারণ করা হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

খেলাপি ঋণ বেড়ে প্রায় ৩৩ শতাংশ

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধিদলের একজন কর্মকর্তা জানান, বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ব্যাংকিং খাতের সংস্কার পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং খেলাপি ঋণ কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

ওই কর্মকর্তা বলেন, সংকটে থাকা সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের আমানত ফেরত দেওয়া হচ্ছে। বৃহস্পতিবার থেকে ন্যাশনাল ব্যাংকের গ্রাহকদের আমানত ফেরত দেওয়াও শুরু হয়েছে। দুর্বল ব্যাংকগুলোর আমানতকারীদের নিয়মিত অর্থ ফেরত দেওয়ার মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর ওপর গ্রাহকের আস্থা ফিরিয়ে আনতে চায় সরকার।

এ ছাড়া ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার পরিকল্পনাও প্রস্তুত করছে প্রতিনিধিদলটি।

তবে খেলাপি ঋণ কমানোর ক্ষেত্রে আগের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি বাংলাদেশ। ২০২৩ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আইএমএফের সঙ্গে সই করা ঋণচুক্তিতে ২০২৬ সালের মধ্যে খেলাপি ঋণের হার ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে এ হার বেড়ে প্রায় ৩৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

আগের কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ার পর নতুন ঋণ কর্মসূচিতে খেলাপি ঋণ কত শতাংশে নামিয়ে আনা হবে, তা এখনো নির্ধারিত হয়নি বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই কর্মকর্তা।

ফলে নতুন ঋণ কর্মসূচিতে শুধু সংস্কারের প্রতিশ্রুতি নয়, সেগুলোর বাস্তবায়ন কতটা কার্যকরভাবে হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বিশেষ করে খেলাপি ঋণ আদায়, দুর্বল ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার উন্নতি এবং আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

গত ১২ই অক্টোবর ব্যাংককে ২০২৬ সালের আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বার্ষিক সভা শুরু হয়েছে। আগামী ১৮ই অক্টোবর পর্যন্ত এ সভা চলবে। এতে বিভিন্ন দেশের অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, নীতিনির্ধারক এবং উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন।


তারেক সরকারের ৩ মাসে বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে ৪২০ কোটি ডলার!

বাংলাদেশের বিদেশি ঋণ অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে প্রায় ১১৫ বিলিয়ন বা ১১ হাজার ৫০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। মাত্র তিন মাসে ঋণের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার—শতকরা হিসাবে ৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ।

বর্তমান বিনিময় হার—প্রতি ডলার ১২৩ টাকা ২০ পয়সা—ধরলে এই ঋণের টাকার অঙ্ক দাঁড়ায় ১৪ লাখ ১৬ হাজার ৫৯০ কোটি টাকা।

রোববার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত হালনাগাদ পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষে বাংলাদেশের মোট বিদেশি ঋণ ছিল ১১৪ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ ১১ হাজার ৪৯৮ কোটি ৩০ লাখ ডলার।

এর আগের মার্চের শেষে ঋণের পরিমাণ ছিল ১১০ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন বা ১১ হাজার ৯৩ কোটি ডলার। ছয় মাস আগে, গত বছরের ডিসেম্বর শেষে তা ছিল ১১৩ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার। আর এক বছর আগে জুনের শেষে মোট বিদেশি ঋণ ছিল ১১৩ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ছয় মাসে বিদেশি ঋণ বেড়েছে ১ দশমিক ২৯ শতাংশ। এক বছরের হিসাবে বৃদ্ধির হার ১ দশমিক ২৩ শতাংশ।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব বলছে, গত জুনের শেষে সরকারি খাতের বিদেশি ঋণ দাঁড়ায় ৯৫ দশমিক ১০ বিলিয়ন বা ৯ হাজার ৫১০ কোটি ডলারে। মার্চ শেষে এই ঋণের পরিমাণ ছিল ৯০ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলার। ফলে তিন মাসে সরকারি খাতের ঋণ বেড়েছে প্রায় ৪২০ কোটি ডলার।

একই সময়ে বেসরকারি খাতের বিদেশি ঋণ অবশ্য ১৪ কোটি ডলার কমেছে। জুনের শেষে এ খাতের ঋণ নেমে আসে ১৯ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৯৮৮ কোটি ডলারে।

ঋণের মেয়াদ বিশ্লেষণে দেখা যায়, জুনের শেষে মোট বিদেশি ঋণের ৮৭ দশমিক ৫২ শতাংশ ছিল দীর্ঘমেয়াদি। এই ঋণের পরিমাণ ১০০ দশমিক ৬৪ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে স্বল্পমেয়াদি ঋণ ছিল ১৪ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার।

ঋণদাতার ধরন অনুসারে, জুনের শেষে বিশ্বব্যাংক, এডিবি এবং অন্যান্য বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সংস্থার কাছ থেকে নেওয়া ঋণ ছিল ৪৮ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলার। দ্বিপক্ষীয় ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩২ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলারে। এ ছাড়া বাণিজ্যিক ঋণ ছিল ১০ দশমিক ৬০ বিলিয়ন এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ ছিল ৫ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন ডলার।

মার্চের শেষে বেসরকারি খাতের বিদেশি ঋণ ছিল ২০ দশমিক শূন্য দুই বিলিয়ন ডলার। জুনের শেষে তা কমে ১৯ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়। এ খাতের স্বল্পমেয়াদি ঋণ, ক্রেতাঋণ বা বায়ার্স ক্রেডিট এবং বাণিজ্যঋণ কমে যাওয়াই মোট বিদেশি ঋণ হ্রাসের কারণ।

Visited 6 times, 1 visit(s) today