নকল টিভিসহ বিভিন্ন ধান্দায় কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে পলাতক গুপ্ত সংগঠন শিবির নেতা এক যুগ পর গ্রেপ্তার

নকল টিভিসহ বিভিন্ন ধান্দায় কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে পলাতক গুপ্ত সংগঠন শিবির নেতা এক যুগ পর গ্রেপ্তার
শেয়ার করুন

❐ জেলা প্রতিনিধি


ব্যবসায় বিনিয়োগের প্রলোভন দেখিয়ে বন্ধু ও পরিচিতদের কাছ থেকে প্রায় ৩ কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগে গুপ্ত সন্ত্রাসী সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা মমিনুল ইসলাম মন্ডল ওরফে ‘মইম সুমন’কে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

১৫ই অক্টোবর, বৃহস্পতিবার রাতে বগুড়া শহরের প্রেসপট্টি এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়। শুক্রবার বিকেলে আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

গ্রেপ্তার সুমন গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার কিশামত দশনিয়া গ্রামের শাহাদাৎ হোসাইন মণ্ডলের ছেলে। তিনি গুপ্ত সংগঠন ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

অভিযোগ, সাংগঠনিক পরিচয় ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে ব্যবসার কথা বলে বিভিন্নজনের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের পর তিনি আত্মগোপনে যান।

ভুক্তভোগীরা জানান, ২০১১ সালের দিকে বন্ধুদের নিয়ে ব্যবসা শুরুর উদ্যোগ নেন সুমন। প্রথমে ‘বেঙ্গল শ্রমজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেড’ প্রতিষ্ঠা করেন। পরে পর্যায়ক্রমে ‘তেজারা এক্সপোর্ট ইমপোর্ট লিমিটেড’, ‘তেজারা প্রপার্টিজ’সহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।

বন্ধুদের এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচালক পদে যুক্ত করে তাদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করেন। বিভিন্ন সময়ে এভাবে প্রায় ৩ কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ করেছেন বিনিয়োগকারীরা।

বিনিয়োগকারীদের আস্থা পেতে সুমন অভিনব কৌশল নিয়েছিলেন।

ঢাকার গুলিস্তান থেকে নকল কপি ব্র্যান্ডের ৪০ থেকে ৫০টি টেলিভিশন কিনে তাতে ‘তেজারা টিভি’ লোগো লাগানো হয় এবং ব্যবহার করা হয় প্রতিষ্ঠানের নামের কার্টন। চীন থেকে টেলিভিশন আমদানি হচ্ছে—এমন ধারণা দিয়ে বন্ধুদের কাছে ব্যবসার কার্যক্রম তুলে ধরতেন তিনি।

তার কথায় বিশ্বাস করে অনেকেই ধাপে ধাপে অর্থ বিনিয়োগ করেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, প্রায় এক বছর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে লোকদেখানো কার্যক্রম চালানোর পর হঠাৎ আত্মগোপনে চলে যান সুমন।

পরে বগুড়ায় তার অবস্থান শনাক্ত হওয়ার পর পাওনাদাররা টাকা ফেরত চান। এ সময় বিভিন্নজনের সঙ্গে যোগসাজশ করে পাওনাদারদের হুমকিও দেন তিনি।

ভুক্তভোগীদের অনেকেই জানিয়েছেন, বন্ধুত্বের কারণে তারা নগদ টাকা দিয়েছিলেন; তাই তাদের কাছে লেনদেনের যথেষ্ট কাগজপত্র নেই।

তবে এক ভুক্তভোগী সুমনের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে টাকা জমা করেছিলেন। সেই জমার ভাউচার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করে সম্প্রতি বগুড়ার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের সদর আমলি শাখায় মামলা করেন ওমর ফারুক। মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর পুলিশ সুমনকে আটক করে।

বগুড়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শুক্রবার সকালে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

তিনি বলেন, সমবায় ব্যবসাসহ বিভিন্ন লাভজনক উদ্যোগের প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষ ও পরিচিতদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে সুমনের বিরুদ্ধে। দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার পর প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

প্রতারণার শিকার ঢাকার কবি ও প্রচ্ছদশিল্পী আফসার নিজাম বলেন, সরল বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে সুমন তার কাছ থেকেও বিভিন্ন অজুহাতে টাকা নিয়েছেন। পরে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন।

এ ধরনের কর্মকাণ্ড মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাস নষ্ট করেছে বলে ক্ষোভ জানান তিনি।

সমন্বয় সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংসদ (সসাস) বগুড়ার সাবেক পরিচালক নাজমুল আহসান সোহাগের অভিযোগ, সাংগঠনিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন জেলার মানুষের কাছ থেকে সমবায় সমিতির নামে অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছিল। ঘটনায় জড়িত ব্যক্তির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিও দাবি করেন তিনি।

নাট্যকার, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘বিকল্প’-এর সাবেক পরিচালক এবং সসাসের সাবেক নাট্য সম্পাদক নবার নাসির বলেন, তারা দীর্ঘদিন ধরে এ ঘটনার বিচার চাইছেন।

তার দাবি, সুমনের বিরুদ্ধে সংগঠনের বহু নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে বড় অঙ্কের আর্থিক প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে।

সুমনের গ্রেপ্তারে স্বস্তি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। তবে তাদের প্রধান দাবি, বহু বছর আগে দেওয়া অর্থ ফেরত পাওয়া এবং অভিযোগের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা।

তাদের আশা, বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটিত হবে; অভিযোগ প্রমাণিত হলে অর্থ উদ্ধারের পাশাপাশি দায়ী ব্যক্তির উপযুক্ত শাস্তিও হবে।

Visited 1 times, 1 visit(s) today