জাতিসংঘ দিবস আজ: ঐতিহাসিক ইয়াল্টায় ‘দ্যা বিগ থ্রি’র সমঝোতায় গড়ে উঠেছিল যুদ্ধোত্তর বিশ্বশান্তির কাঠামো

জাতিসংঘ দিবস আজ: ঐতিহাসিক ইয়াল্টায় ‘দ্যা বিগ থ্রি’র সমঝোতায় গড়ে উঠেছিল যুদ্ধোত্তর বিশ্বশান্তির কাঠামো
শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদক | ২৪ অক্টোবর ২০২৬


আজ জাতিসংঘ দিবস। ১৯৪৫ সালের এই দিনে জাতিসংঘ সনদ কার্যকর হয়, আর সেই থেকে দিনটি বিশ্বজুড়ে জাতিসংঘ দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। এ বছর সংস্থাটির ৮১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ থেকেই জাতিসংঘের জন্ম। লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু ও শহরের পর শহর ধ্বংসের অভিজ্ঞতা থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সংকল্প করেছিল, এমন রক্তপাত আর কখনো ঘটতে দেওয়া হবে না। সংঘাতের সমাধান হবে যুদ্ধে নয়, ঐকমত্য ও সমঝোতার মাধ্যমে। এই দৃঢ় প্রত্যয়ই মানব ইতিহাসে একটি নতুন যুগের সূচনা করে।

ইয়াল্টা সম্মেলনের গুরুত্ব

জাতিসংঘ গঠনের পথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোর একটি ছিল ১৯৪৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্রিমিয়ার ইয়াল্টায় অনুষ্ঠিত সম্মেলন। যুদ্ধ তখন শেষ পর্যায়ে। মিত্রশক্তির তিন শীর্ষ নেতা, সোভিয়েত ইউনিয়নের জোসেফ স্ট্যালিন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট এবং যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল সেখানে মিলিত হন। জার্মানির পরাজয়-পরবর্তী ব্যবস্থা ও যুদ্ধোত্তর বিশ্বের রূপরেখা নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি তাঁরা সর্বসম্মতিতে সিদ্ধান্ত নেন, একটি নতুন আন্তর্জাতিক সংস্থা গড়তে সান ফ্রান্সিসকোয় সম্মেলন ডাকা হবে। নিরাপত্তা পরিষদের ভোটদান পদ্ধতি নিয়েও তাঁরা সমঝোতায় পৌঁছান, যা সংস্থাটির কাঠামো চূড়ান্ত করার পথ খুলে দেয়।

ইয়াল্টা সম্মেলনে ফ্র্যাঙ্কলিন রুজভেল্ট, জোসেফ স্ত্যালিন ও উইন্সটন চার্চিল। ১৯৪৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ক্রিমিয়ার ইয়াল্টার নিকটবর্তী লিভাদিয়া প্রাসাদে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

ভিন্ন রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও পরস্পরবিরোধী স্বার্থ সত্ত্বেও যুদ্ধকালীন এই জোটের নেতারা একটি সাধারণ লক্ষ্যে একমত হতে পেরেছিলেন: যুদ্ধের পর বিশ্বে স্থায়ী শান্তি ও সম্মিলিত নিরাপত্তার কাঠামো গড়া। ইতিহাসবিদদের অনেকে এই ঐকমত্যকে জাতিসংঘের ভিত্তি হিসেবে দেখেন।

সান ফ্রান্সিসকো থেকে কার্যকর সনদ

সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৯৪৫ সালের এপ্রিল থেকে সান ফ্রান্সিসকোয় সম্মেলন শুরু হয়। ২৬ জুন ৫০টি দেশ জাতিসংঘ সনদে স্বাক্ষর করে। পোল্যান্ড সম্মেলনে উপস্থিত থাকতে না পারায় পরে স্বাক্ষর করে, ফলে প্রতিষ্ঠাতা সদস্য দাঁড়ায় ৫১টি। চীন, ফ্রান্স, সোভিয়েত ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশিরভাগ স্বাক্ষরকারী দেশ অনুমোদন (র‍্যাটিফাই) করার পর ২৪ অক্টোবর সনদ আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়।

ইয়াল্টা সম্মেলনের দুই মাসের মধ্যে, ১৯৪৫ সালের ১২ এপ্রিল রুজভেল্ট মারা যান। ফলে সান ফ্রান্সিসকো সম্মেলনও জাতিসংঘের জন্ম তাঁর দেখে যাওয়া হয়নি।

ইয়াল্টা সন্মেলন সম্পর্কে বিস্তারিতঃ  The Yalta Conference

দ্যা বিগ থ্রী

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসান এবং যুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বে শান্তি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার কাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ইতিহাসে ‘বিগ থ্রি’ (Big Three) নামে পরিচিত তিন মিত্রনেতা—সোভিয়েত ইউনিয়নের জোসেফ স্টালিন, যুক্তরাষ্ট্রের ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট এবং ব্রিটেনের উইনস্টন চার্চিল—গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে তেহরান (১৯৪৩), ইয়াল্টা (১৯৪৫)  সম্মেলনে তাঁদের আলোচনা ও সিদ্ধান্ত যুদ্ধের সমাপ্তি, জার্মানির ভবিষ্যৎ, ইউরোপের পুনর্গঠন এবং যুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার রূপরেখা নির্ধারণে প্রভাব ফেলে।

তাঁদের উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার লক্ষ্যে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়; ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর জাতিসংঘ সনদ কার্যকর হয়। তবে শান্তির এই নতুন কাঠামো গড়ে ওঠার পাশাপাশি তিন শক্তির মধ্যে আদর্শগত ও ভূরাজনৈতিক বিরোধও ক্রমে তীব্র হয়, যা পরবর্তী সময়ে স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা ঘটায়। ফলে ‘বিগ থ্রি’-এর উত্তরাধিকার একদিকে যুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক শান্তি ও সহযোগিতার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি, অন্যদিকে পরবর্তীতে “দ্যা নিউ বিগ থ্রী”  বিশ্বরাজনীতির বিভাজনের ইতিহাসের সঙ্গেও যুক্ত।

একটি জটিল উত্তরাধিকার

ইয়াল্টা সম্মেলনের সিদ্ধান্ত পরবর্তী সময়ে বিতর্কেরও জন্ম দেয়। বিশেষ করে পোল্যান্ড ও পূর্ব ইউরোপের ভবিষ্যৎ নিয়ে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ আছে। শীতল যুদ্ধের শুরুতে মিত্রশক্তির এই ঐক্যে ফাটলও ধরে, যখন রুজভেল্ট ও চার্চিল দৃশ্যপট থেকে মুছে যান। তবু জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তটি যুদ্ধোত্তর বিশ্বের জন্য একটি স্থায়ী আন্তর্জাতিক কাঠামো রেখে গেছে, যেখানে আজ ১৯০টির বেশি দেশ সদস্য।

আজ বিশ্বের নানা প্রান্তে সংঘাত চলমান থাকলেও জাতিসংঘ দিবস সেই মৌলিক অঙ্গীকারের কথাই মনে করিয়ে দেয়: সংঘাত নয়, সংলাপ ও সমঝোতাই মানবজাতির পথ।

 

Visited 10 times, 10 visit(s) today