পাণ্ডুলিপি ফাঁস, পাঠ্যবইয়ের আগেই গাইড বই ছাপানোর হিড়িক!

পাণ্ডুলিপি ফাঁস, পাঠ্যবইয়ের আগেই গাইড বই ছাপানোর হিড়িক!
শেয়ার করুন
সংবাদ প্রতিবেদন

অন্তর্বর্তী সরকার যখন নতুন পাঠ্যবই শিক্ষার্থীদের হাতে বছরের শুরুতেই তুলে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখনই নতুন পাঠ্যবইয়ের পাণ্ডুলিপি ফাঁস হওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

সেই ফাঁসকৃত পাণ্ডুলিপি অনুসারে নোট ও গাইড বই ছাপানোর হিড়িক পড়ে গেছে বাজারে। বিভিন্ন নামিদামি প্রকাশনীর এসব গাইড বই ছাপতে প্রেসগুলোতে দিনরাত কাজ চলছে তুমুলভাবে। যেখানে বই এখনো শিক্ষার্থীদের হাতে আসা অনিশ্চিত, কারো কারো ধারণা, আগামী শিক্ষাবর্ষের বই বছরের প্রথম দিনে হাতে পাওয়া অনিশ্চিত। সব বই হাতে হাতে পৌঁছাতে মার্চ-এপ্রিলও লেগে যেতে পারে। অথচ এরইমধ্যে গাইড বই ছাপার কাজ শুরু হয়ে গেছে।

প্রশ্ন উঠছে, কারা পাণ্ডুলিপি ফাঁস করল, কারা সেটি নিশ্চিত করল গাইড বই ছাপানো প্রকাশকদের, সে নিয়ে চলছে আলোচনা।

ঘটনা স্বীকার করে পাঠ্যবই মুদ্রণ তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) জানিয়েছে, ফাঁস হওয়া পাণ্ডুলিপি দিয়ে নোট ও গাইড বই ছাপার অভিযোগ পেয়েছেন তারা।

তবে পাঠ্যবই ছাপা শেষ হওয়ার আগে নোট ও গাইড বই ছাপাতে মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিষেধ করে নোটিস জারি করে দায় সেরেছে এনসিটিবি।

এনসিটিবির চেয়ারম্যান এ কে এম রিয়াজুল হাসান বলেন, পরিমার্জিত বইয়ের পাণ্ডুলিপি ফাঁস করে নোট-গাইড ছাপা হচ্ছে বলে অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে একজন সদস্যকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা আগামী সপ্তাহে এ বিষয়ে প্রতিবেদন দেবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

অধ্যাপক রিয়াজুল ইতিপূর্বে জানিয়েছিলেন, নির্ধারিত সময়ে বই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে দিতে না পারা মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে কালো তালিকাভুক্ত করা হবে।

বললেন, চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বই ছাপানোর কাজ শেষ করতে বলা হয়েছে। নতুন বছরের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের হাতে সব বই তুলে দিতে চায় এনসিটিবি। তাই আবারও নোটিস জারি করে মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক করা হয়েছে বলে জানান তিনি। কেউ (মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান) যদি সারাদিন নোট-গাইড ছাপিয়ে বলে কাগজ সংকটের কারণে পাঠ্যবই ছাপতে পারছি না, এমনটি যাতে না হয় তাই ওই নোটিস দেওয়া হয়েছে।

এর আগে ২০০৮ সালের ১৩ই মার্চ হাই কোর্ট এনসিটিবির অনুমোদন ছাড়া নোট বই ও গাইড বই প্রকাশ, বিতরণ ও বিক্রির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দেশের জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দেন। সেই রায়ের বিরুদ্ধে প্রকাশকদের করা আপিল ২০০৯ সালের ৯ই ডিসেম্বর খারিজ করে দিয়েছিল আপিল বিভাগ। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নোট ও গাইড বই প্রকাশনা, বিক্রি ও বিতরণ করেছিল। তবে নোট-গাইডের লাগাম টানা বাস্তবে সম্ভব হয়নি। ২০১২ সালেই সরকারের শিক্ষাক্রমের প্রস্তাবনা ছিল কোচিং ব্যবসা ও নোট-গাইডের বিরুদ্ধে।

২০২৩ সালে অভিজ্ঞতা নির্ভর নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন শুরু করেছিল আওয়ামী লীগ সরকার। লক্ষ্য ছিল কোচিং সেন্টার ও নোট-গাইড নির্ভরতা কমানো। কিন্তু কোচিং বাণিজ্যের মাধ্যমে বিশাল সাম্রাজ্য বানিয়ে জেঁকে বসা শিক্ষকদের কারণে নোট-গাইডের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা যায়নি। ইতিপূর্বে গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে উঠে এসেছিল, কোচিং ব্যবসার বাৎসরিক লেনদেন ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। দেশের নামিদামি স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা এই বিশাল ‘শিক্ষা-মাফিয়ার অংশ বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের বলা হয়েছে।

জুলাই-আগস্টে সরকারবিরোধী আন্দোলনের পটভূমি প্রস্তুত করার পেছনে এই কোচিং ব্যবসায়ী গোষ্ঠীও সম্পৃক্ত ছিল। ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে থেকেই ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হয় শিক্ষাঙ্গনে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির মাধ্যমে। যার প্রেক্ষিতে ৫ই আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকার নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নযোগ্য নয় বলে ঘোষণা দিয়েছে। তাই এক যুগ আগে প্রণীত ২০১২ সালের শিক্ষাক্রমের বইগুলো থেকে বিশেষ বিশেষ অংশ বিয়োজন ও নতুন কিছু সংযোজন করে ছাপার কাজ শুরু করেছে এনসিটিবি।

পাঠ্যবই ছাপানোর দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো নোট-গাইড ছাপার কাজে জড়িত নয় বলে দাবি করেছেন মুদ্রণ শিল্প সমিতির ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. আনোয়ার হোসাইন। তিনি বলেন, যাদের নোট-গাইড ব্যবসা আছে তারা এসব করতে পারে। তবে যারা শুধু প্রিন্টিংয়ের কাজ করে তারা এমনটি করে না।

নতুন শিক্ষার্থীদের বই ছাপার কাজ পেয়েছে ‘অনুপম প্রিন্টার্স’ নামের একটি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানটির মূল কোম্পানি কাজল ব্রাদার্স লিমিটেড। তারা বহু বছর ধরে ‘অনুপম গাইড’ নামে গাইড বই প্রস্তুত ও বাজারজাত করে।

নতুন বইয়ের পাণ্ডুলিপি ব্যবহার করে গাইড প্রস্তুত হচ্ছে কি না এমন প্রশ্নের উত্তর জানতে অনুপম প্রিন্টার্সের সত্ত্বাধিকারী মীর্জা আলী আশরাফ কাশেমের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে প্রতিষ্ঠানের গোডাউন ইনচার্জ শহিদুল ইসলামের দাবি, তারা পাঠ্যবই ছাপার কাজ পেলেও গাইড ছাপার কাজ শুরু হবে নতুন বই শিক্ষার্থীদের হাতে যাওয়ার পর। তারা এখন গাইড ছাপানোর কাজ করছেন না।

নোট-গাইড প্রকাশকদের হাতে পাণ্ডুলিপি পৌঁছাল কারা? এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির প্রধান এনসিটিবির শিক্ষাক্রম উইংয়ের সদস্য অধ্যাপক রবিউল কবীর চৌধুরী জানান, পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো থেকেই পাণ্ডুলিপির সিডি চলে গেছে নোট-গাইড প্রকাশকদের কাছে। তারপরই ছাপানোর কাজ শুরু হয়ে থাকতে পারে।

তিনি আরও বলেন, চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোকে আমরা সিডিতে বইয়ের সফট কপি দিয়েছি, সেনাবাহিনীকেও দেওয়া হয়েছে। ছাপাখানা থেকে কেউ যদি তা ফাঁস করে দেন বা নিজেরাই নোট-গাইড ছাপানোর কাজ শুরু করেন সেক্ষেত্রে আমরা কী করব? আমরা অভিভাবক বেশে বাজারে খোঁজ নিয়েছি। এখনও নতুন বইয়ের নোট-গাইড বাজারে আসেনি। বিক্রেতারা বলছে ফেব্রুয়ারি মাসে এসব পাওয়া যাবে।

নোট-গাইড বন্ধে এনসিটিবির কোনো উদ্যোগ আছে কিনা, জানতে চাইলে তিনি বলেন, কিছু নিষিদ্ধ হলে সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে নির্বাহী বিভাগ বা আইনশৃ্ঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আমাদের এ বিষয়ে করার তেমন কিছু নেই।

পাণ্ডুলিপি অনেক পর্যায় থেকে ফাঁস হতে পারে বলে মনে করেন এনসিটিবির চেয়ারম্যান এ কে এম রিয়াজুল হাসান। তিনি বলেন, বই পরিমার্জনের পর সেগুলো পরিমার্জনে সংশ্লিষ্টরা টাইপ করেছেন, সেগুলো আমাদের এখানেও টাইপ হয়েছে, ডিজাইন করা হয়েছে- এর কোনো একটি পর্যায় থেকে ফাঁস হতে পারে। যদিও আমরা সংশ্লিষ্টদের আগেই এ বিষয়ে গোপনীয়তা বজায় রাখতে বলেছি।

Visited 46 times, 1 visit(s) today