রাইসমিলের দূষিত পানিতে ধানি জমির সর্বনাশ, দেখার নেই কেউ

রাইসমিলের দূষিত পানিতে ধানি জমির সর্বনাশ, দেখার নেই কেউ
শেয়ার করুন
স্থানীয় সংবাদদাতা

চাঁপাইনবাবগঞ্জে ধানি জমিতে সেচের ড্রেন দিয়ে অটো রাইসমিলের গরম, দুর্গন্ধযুক্ত ও কালো দূষিত পানি প্রবাহিত হচ্ছে। প্রায় এক কিলোমিটার দূরের ড্রেন থেকে দিন-রাত বয়ে আসা এসব পানি সরাসরি মিশছে ফসলি জমিতে। এতে ফসলে পোকামাকড়ের উপদ্রব বেড়ে গেছে এবং পচা পানির কারণে ধানগাছ নুয়ে পড়ছে। ফলে বিস্তীর্ণ ফসলি জমি হারাচ্ছে উর্বরতা।

কৃষকদের অভিযোগ, জমিতে পানির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে ধান রক্ষার জন্য বেশি পরিমাণে সার ও কীটনাশক ব্যবহার করতে হচ্ছে, ফলে উৎপাদন খরচ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেও কৃষকরা পুঁজি তুলতে পারছেন না, যা তাদের চরম সংকটে ফেলেছে। ক্ষতিপূরণের দাবি বা প্রতিবাদ করলে মিল মালিকদের পক্ষ থেকে ভয়ভীতি ও হুমকি দেওয়া হয়।

সেচ প্রকল্পের ড্রেন দিয়ে এ ধরনের দূষিত পানি জমিতে যাচ্ছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

কৃষকদের মতে, অটো রাইসমিলের ধান সিদ্ধ ও অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত দুর্গন্ধময়, নোংরা ও কালো পানির কারণে সদর উপজেলার আতাহার, বুলনপুর, রাঁধুনীডাঙ্গা এবং বাইল্যাকান্দা মাঠের হাজারো বিঘা ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে, আবার কোথাও শুধুমাত্র খড় পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিবাদ করলেই মিল মালিকদের পক্ষ থেকে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে।

নয়াগোলা এলাকার কৃষক আজিজুল হক জানান, কয়েক বছর ধরে এই পরিস্থিতি চলছে। রাইসমিলের কেমিক্যাল মিশ্রিত নোংরা পানি সেচের ড্রেন দিয়ে সরাসরি ধানের জমিতে পড়ে। ফলে ধানের ফলন প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। উল্টো নোংরা পানির কারণে খরচ বেড়েছে কয়েক গুণ। অন্যের জমি চাষ করে যে খরচ হচ্ছে, তার কিছুই বাড়িতে তুলতে পারছি না।

বৃদ্ধ কৃষক মোতালেব মিয়া বলেন, এই বিষয়ে কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পায় না। প্রতিবাদ করলেই দেওয়া হয় হুমকি, ভয়ভীতি এবং মামলার ভয়। মিল মালিকরা বড় বড় ব্যবসায়ী। তাদের অর্থ ও ক্ষমতার কাছে আমরা অসহায়। অভিযোগ জানালেও কোনো প্রতিকার পাই না। তারা স্বৈরাচারী মনোভাব নিয়ে মিল পরিচালনা করেন।

আতাহার এলাকার কৃষক গোলাম রাব্বানি বলেন, হাজার হাজার বিঘা জমি এইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এরপরও স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও কৃষি বিভাগ কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। বারবার অভিযোগ করার পরও তারা কোনো পদক্ষেপ নেয় না। মনে হয়, রাইসমিলের মালিকদের অর্থবিত্তের কাছে তারাও জিম্মি। কৃষকদের জন্য কেউ নেই।

জেলা মিল মালিক ও আতপ ধান চাউল ব্যবসায়ী সমিতি এবং চাউল কল মালিক গ্রুপের কোনো প্রতিনিধি এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।

পরিবেশ অধিদপ্তর চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আবু সাইদ জানান, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ধান সিদ্ধের পর গরম পানি মিলের ভেতরের পুকুরেই সংরক্ষণ করতে হবে। রাইস মিল থেকে নোংরা পানি ফসলি জমিতে গিয়ে কৃষকদের ক্ষতি হলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক আব্দুস সামাদের বক্তব্য নেওয়ার জন্য একাধিকবার চেষ্টা করলেও তার কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

জেলার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাছমিনা খাতুন বলেন, অটো রাইসমিল মালিকরা নোংরা পানি ফসলি জমিতে ছেড়ে কৃষকদের ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারেন না। এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের সহায়তায় মিল মালিকদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উল্লেখ্য, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় অর্ধশতাধিক অটো রাইসমিল রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৩০টি মিল আতাহার-বুলনপুর এলাকায় অবস্থিত। চলতি আমন মৌসুমে জেলায় ৫৪ হাজার ৩৭৫ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছে।

Visited 7 times, 1 visit(s) today