Preset71
‘এখন সবার একটাই কাজ, শেখের জন্য প্রতীক্ষা’- জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ঠিক এরকমই বলছিলেন একজন কুটনীতিক। বাইরের রাস্তা তখন আটকে আছে বাস ও গাড়িতে, সবগুলোর সামনে শেখ মুজিবের বড় বড় ছবি টাঙানো।
কারাবন্দী বাঙালী নেতা শেখ মুজিব যে কোন মুহুর্তে ফিরে আসবেন তাঁর নিজভূমে। গত সোমবার পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলি ভুট্টো তাঁর কারামুক্তির ঘোষনা দেয়ায় এখানে এই আশাবাদ সৃষ্টি হয়েছে। শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তা এতো আকাশচুম্বী এবং তাঁর প্রত্যাবর্তন ঘিরে আশাবাদ এতো তীব্র যে, গুরুত্বপুর্ণ সব সিদ্ধান্ত থমকে আছে তাঁর অপেক্ষায়।
দুসপ্তাহ আগে ভারতের নির্বাসন থেকে ফিরে আসা আওয়ামী লীগের মন্ত্রীসভার সদস্যগণ সরকারী বাসভবনেই বেশী সময় কাটাচ্ছেন। কেউ কেউ সমাবেশ ও সংবর্ধনায় যোগ দিচ্ছেন, কেউ কেউ ভারতে গিয়েছেন পরিবারের সদস্যদের ফিরিয়ে আনতে।
রাষ্ট্রদ্রোহীতার অভিযোগে মার্চ মাসে পাকিস্তানের হাতে বন্দী হবার পর গত নয় মাসের বিশৃংখল পরিস্থিতিতেও শেখ মুজিব বা তাঁর রাজনৈতিক দলটির কার্যকর কোন বিরোধীপক্ষ তৈরী হতে পারেনি।
১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ১৬৭টিতে জয় লাভ করে। নয় মাসের যুদ্ধে অপরাপর ছোট দলগুলি আরও দুর্বল হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
কিন্তু নতুন বাঙালী রাষ্ট্রটির সামনে অনেকগুলো জটিল সমস্যার উদ্ভব হয়েছে, শেখ মুজিবুর রহমানকেই এসবের সমাধান করতে হবে।
গেরিলাদের নিরস্ত্রীকরন
————————
মুক্তিবাহিনীর লক্ষাধিক গেরিলা এখনো সশস্ত্র অবস্থায় রয়েছে। মন্ত্রীসভা থেকে তাঁদেরকে অস্ত্র সমর্পনের আহ্বান জানানো হলেও খুব সামান্যই এতে সাড়া দিয়েছে। মুক্তিবাহিনীর সদস্য পরিচয় দেয়া সশস্ত্র লোকজন দালাল গ্রেপ্তার করার নামে বিভিন্ন ঘরবাড়িতে হানা দিচ্ছে, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের কন্স্যুলেট ও ইনফরমেশন সার্ভিসেও তারা অভিযান চালিয়েছে। এরকম ঘটনা প্রতিদিন ঘটছে। যুদ্ধের সময় লুট হয়েছিলো- এমন অভিযোগ তুলে সম্পত্তি দখলের কিছু ঘটনাও ঘটেছে।
দুদিন আগে গেরিলাদের একটি দল ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে প্রবেশ করে। ভারতীয় সেনাদের প্রহরায় সেখানে পাকিস্তানী সৈনিক ও বেসামরিক নাগরিকরা রয়েছে। গেরিলারা সেখানে তিনজনকে হত্যা করে।
মুক্তিবাহিনী গেরিলাদের অনেকেই ছাত্র, তারা পড়ালেখায় ফিরে যেতে চায়। কিন্তু কিছু গ্রাম এলাকায় কোন কোন উপদল নিজেদেরকেই সরকার ভাবছে।
এটা একটা জটিল সমস্যা। শেখ মুজিবুর রহমানকেই এটা সামলাতে হবে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।
বিহারী সমস্যা
————–
আরেকটি গভীর সমস্যা হচ্ছে ২ মিলিয়ন বিহারী। ভারত থেকে উদ্বাস্তু হয়ে আসে এই জাতিগত সংখ্যালঘুরা বাঙালী নিধনে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহযোগী হয়েছিল। যুদ্ধ শেষ হবার পর তারা অবরুদ্ধ অবস্থায় আছে, খাবার সংগ্রহ বা কর্মসংস্থানের জন্য বাইরে যেতে শংকিত।
ঢাকার মোহাম্মদপুরের বিহারী জনগোষ্ঠির একজন নেতা বলেছেন, যেরকম আশংকা করেছিলেন সেরকম হত্যাযজ্ঞের শিকার তারা হননি এখনো। তবে তিনি মনে করেন, বাংলাদেশে তাদের আর কোন ভবিষ্যত নেই। “আমরা আমাদের নিজেদের ঘরেই এখন উদ্বাস্তু”। তাঁকে খুব বিধ্বস্ত লাগছিলো। একটি ঘরের ভেতর ২৫ জন বিহারীর আশ্রয়। তিনি আরো বলছিলেন- “এখানে আর থাকার মতো অবস্থা নেই। আমাদের পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যেতে হবে অথবা ভারতেই ফিরে যেতে হবে” ।
মুক্তিবাহিনীর সশস্ত্র গেরিলাদের তৈরী করা নিরাপত্তা ঝুঁকি ও বিহারীদের বিপদ দুটোই ভারতীয় সেনা প্রত্যাহারের পর বাড়বে। বাংলাদেশ সরকারে সম্পৃক্ত ভারতের বিশেষ প্রতিনিধি দূর্গাপ্রসাদ ধর এই বিষয়গুলো নিয়ে সরকারের সাথে কাজ করছেন।
কিন্তু চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত শেষমেষ শেখ মুজিবুর রহমানের উপর নির্ভর করবে বলে বিশ্লেষকরা মত প্রকাশ করেছেন।
সংবিধান বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত হয়নি
————————————-
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও সরকার সিদ্ধান্ত নিতে পারছেনা- সংবিধান প্রণয়নের জন্য কী করে সংবিধান সভা আহ্বান করবে? এই সমস্যা সমাধানের জন্য প্রবাসী সরকার যুদ্ধের মধ্যেই একটি কমিশন গঠন করেছিলো। কিন্তু স্বাধীন দেশে প্রত্যাবর্তনের পর সেই কমিশন কোন চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত না দিয়েই বিলুপ্ত হয়।
রাজনৈতিক সুত্রগুলোর মতে মুল সমস্যা হচ্ছে, ১৬৭ জন জাতীয় পরিষদ সদস্য ও ২৮৮ জন প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যের সকলেই সংবিধান সভার সভ্য হতে আগ্রহী। সংবিধানের খসড়া প্রণয়নে এতো বিশাল সংখ্যক সদস্য একটি অস্বাভাবিক বিষয়। তাই এই সিদ্ধান্তগ্রহনও শেখ মুজিবের জন্য রয়ে গেছে।
বর্তমানে আওয়ামী লীগ ছাড়া প্রকৃত অর্থে একমাত্র সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি হচ্ছে, আওয়ামী লীগেরই সহযোগী ছাত্রলীগ। ছাত্রলীগের চার প্রধান নেতার একজন আব্দুর রব তার কক্ষে বসে বলছিলেন- “আমরা শেখ মুজিবের নির্দেশের অস্ত্র হাতে নিয়েছিলাম, একমাত্র তাঁর নির্দেশেই আমরা অস্ত্র নামাবো”।
১৫ বছর নিষিদ্ধ থাকার পর গত সপ্তাহে ঢাকায় কার্যালয় উদ্বোধন করা কমিউনিস্ট পার্টিকে অতি সামান্যই গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে। ছেঁড়া মাও স্যুট গায়ে জবুথবু পার্টি প্রধান মণি সিংহ তাঁর দলের সদস্য সংখ্যা বলতে পারেননি। মনি সিংহ যখন কথা বলছিলেন তখন খাটো পেটানো শরীরের একজন এসে ঢুকে এবং নিজেকে সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা প্রাভদার সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে তাঁকে ঘরের বাইরে নিয়ে যায়।
Visited 75 times, 1 visit(s) today
