কিসের উপর কি দাঁড়িয়ে আছে অন্তর্বর্তী সরকার?

কিসের উপর কি দাঁড়িয়ে আছে অন্তর্বর্তী সরকার?
শেয়ার করুন

মানুষ দুটি পায়ের উপর দাঁড়িয়ে থাকে, তারজন্য পায়ের শক্তি এবং শরীরের সুস্থতার বিষয় আছে। গাছ মাটির উপর দাঁড়িয়ে থাকে, মাটির নীচে শিকড় থাকে। ভবন মাটির উপর দাঁড়িয়ে থাকে, মাটির নীচে শক্ত ভিত নির্মাণ করতে হয়। রাষ্ট্র তাঁর সম্পদ, অর্থ, শক্তি ও সামর্থ্যের উপর দাঁড়িয়ে থাকে। রাষ্ট্রের সম্পদ, অর্থ, শক্তি ও সামর্থ্যের সুস্থ ব‍্যবস্থাপনার মাধ্যমে জনগণের সমর্থনের উপর দাঁড়িয়ে থাকে রাষ্ট্রের সরকার।

বাংলাদেশের বর্তমান সরকার কিসের উপর দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমত অন্তর্বর্তী সরকারের কোন অস্তিত্ব বাংলাদেশের সংবিধানে নাই। ধরে নিলাম, রাষ্ট্রের জন‍্য সংবিধান, সংবিধানের জন্য রাষ্ট্র নয়, অতএব একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে বর্তমান সরকার গঠিত হয়েছে। তাহলে সুপ্রিম কোর্টের রেফারেন্স নিতে হলো ক‍্যানো? মেনে নিলাম, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও ন‍্যায়পরানয়তার উপর দাঁড়ানোর জন‍্য সুপ্রিম কোর্টে রেফারেন্স পাঠিয়ে সুপ্রিম কোর্টের মতামত নিয়ে সরকার গঠিত হয়েছে। প্রশ্ন হলো, আইন মন্ত্রণালয় থেকে সুপ্রিম কোর্টে রেফারেন্স পাঠিয়ে বলা হয়েছে, দেশের প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন, সাংবিধানিক সংকট দেখা দিয়েছে, মতামত দিন। কোন বিচারক কোন দালিলিক প্রমাণ সামনে না রেখে কোন রায় বা মতামত দিতে পারেন না। সেদিন সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের সামনে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ পত্র ছিল না। আইন মন্ত্রণালয় থেকে মতামত সুপ্রিম কোর্টে পাঠানো পত্রের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ পত্র সংযুক্ত ছিল না। তাহলে কিসের ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্ট রেফারেন্স মামলায় মতামত দিলেন তা অস্বচ্ছ। প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগপত্র স্বচক্ষে না দেখে সাংবিধানিক সংকট প্রশ্নে মতামত দিয়ে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকগণ গর্হিত অন্যায় কাজ করেছেন। যাহোক, প্রধানমন্ত্রীকে যেহেতু দেশের বাইরে রেখে আসতে সক্ষম হয়েছে, দেশের সরকারও একটা গঠন করতে সক্ষম হয়েছে। এখন আলোচনা করি সরকার কি করছে, কিসের ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে আছে। অন্তর্বর্তী সরকার বিগত সরকারের দেয়া বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, মাতৃত্বকালীন ভাতাসহ গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য গৃহীত সকল কর্মসূচি বন্ধ করে দিয়েছে। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)র মাধ্যমে তেল, ডাল ও চাল বিক্রির কর্মসূচি ছিল, বর্তমানে তা বন্ধ করে দিয়েছে। সারা দেশে টিসিবির এক কোটি পরিবার কার্ডের মধ্যে ৪৩ লাখ কার্ড বাতিল করা হয়েছে। হয়তো এই ৪৩ লাখ ব্যক্তিকে বিগত সরকারের দোসর মর্মে চিহ্নিত করেছে। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদের সকল নির্বাচিত প্রতিনিধিকে অপসারণ করেছে, যা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং অসাংবিধানিক। ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ করেছে। প্রশ্ন হলো, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সুবিধাভোগী গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, আওয়ামী লীগের কর্মী সমর্থক, ছাত্রলীগের অগনিত নেতাকর্মী, বরখাস্ত হওয়া জনপ্রতিনিধিগণ সহ বাংলাদেশের বিশাল এক জনগোষ্ঠীকে সরকার কি করতে চাচ্ছে? তাদেরকে দেশ থেকে বিতাড়িত করে দিবে? তাঁদেরকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিবে? তাঁদেরকে মেরে ফেলবে? কি করবে?

উচ্চ মূল্যস্ফীতির কঠিন চাপে দেশের মানুষের জীবনে যখন নাভিশ্বাস উঠেছে, এমন সময়ে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর বাড়তি ভ্যাট আর শুল্ক করের বোঝা বসালো সরকার। বর্তমানে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয় এবং প্রান্তিক আয়ের মানুষজন সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে। ফল, জুস, বেভারেজ, তামাকপণ্য, রেস্তরাঁ, মোবাইলের টকটাইম, ইন্টারনেটসহ ৯০টিরও বেশি পণ্য ও সেবার ওপর মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) এবং সম্পূরক শুল্ক বাড়িয়েছে সরকার। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে সাধারণ মানুষের জন্য ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করেছিল। বিকাশ বা নগদ এপসে টাকা গ্রহণ থেকে শুরু করে গ্রামের নিম্ন আয়ের মানুষদেরও বিভিন্ন কাজে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে হয়, গ্রামের ছোট ছোট বাজারগুলোতে ইন্টারনেট সেবা দেয়ার জন্য ব‍্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। ইন্টারনেটের উপর করের বোঝায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠী নিদারুণ কষ্টের সম্মুখীন হবে। নিম্ন আয়ের মানুষ তথা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী মোবাইল ফোন ব্যবহার করে, তাদেরকে এখন ১০০ টাকার টকটাইমে ৩০ টাকা ভ‍্যাট দিতে হবে। জনগণের সাথে এমন নির্মম আচরণ করতঃ কাদের সুবিধার জন্য বর্তমান সরকার কাজ করছে?? কোন শ্রেণী-পেশার মানুষের সমর্থন নিয়ে সরকারটি দাঁড়িয়ে আছে? রাষ্ট্রায়ত্ত বিপণন সংস্থা টিসিবি’র হিসাবেই গত এক সপ্তাহে মোটা চালের দাম কেজিতে তিন থেকে চার টাকা বেড়েছে। আর মাঝারি মানের চালের দাম কেজিতে দুই টাকা বেড়েছে। অথচ এখন আমনের ভরা মৌসুম, নতুন ধানের চাল পুরোদমে বাজারে। বোতলজাত সয়াবিন তেল লিটারপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ১৭৫ টাকা। আর পাঁচ লিটারের বিভিন্ন ব্রান্ডের সয়াবিন তেল বিক্রিমূল্য ৮৫০-৮৫৫ টাকা। নিত‍্য প্রয়োজনীয় সকল জিনিস সাধারণ জনগণের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে, মানুষের মধ্যে হাহাকার, দীর্ঘশ্বাস। অপরদিকে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে অস্থিরতা। মানুষের মনে প্রশ্ন, বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের ছাত্ররা নতুন দল করার জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করছে, ওদেরকে বাংলামোটরে রূপায়ন টাওয়ারে অফিস ভাড়ার টাকা কারা দিচ্ছে? আন্দোলনকারী ছাত্ররা দামী দামী গাড়ি ব্যবহার করছে, কিভাবে সম্ভব হচ্ছে? কেউ কেউ দ্রুত নির্বাচন চায়, কেউ বিলম্ব করতে চায়। নতুন দলের নেতারা বর্তমান সংবিধান বাতিল করে দিতে চায়, স্বাধীনতার ঘোষনা বাতিল করে নতুন স্বাধীনতার ঘোষনাপত্র তৈরি করতে চায়! সারাদেশে চুরি, ডাকাতি, চাঁদাবাজির মহোৎসব চলছে, ঢাকার শহরে সন্ধ্যার পর ছিনতাইয়ের ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। ছাত্রলীগ-আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীদের নির্বিচারে হত্যা করছে। খুনী সন্ত্রাসী জঙ্গীসহ বিভিন্ন অপরাধের আসামীদের কারাগার থেকে ছেড়ে দিয়ে আওয়ামী লীগ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের দিয়ে কারাগার পূর্ণ করেছে। সকল মিডিয়া একপেশে হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগ শাসনামলে শুধু কি খারাপ কাজই করেছে, তাদের কি একটিও ভালো কাজ নাই? অথচ মিডিয়াগুলো শুধু আওয়ামী লীগকে গালাগাল করণের নীতি অনুসরণ করছে। সারাদেশের বাস ষ্টেশন, সিএনজি স্টেশনগুলোতে চলছে চাঁদাবাজি, বিমান বন্দরে যাত্রীদের করা হচ্ছে হয়রানি। ট্রেন যাত্রীদের দুর্ভোগ নিত্যনৈমিত্তিক। ঢাকার শহরে যানজট তীব্র। বেশ কয়েকদিন যাবৎ পত্রিকায় খবর বের হচ্ছে, রাজধানী ঢাকা শহরের আবহাওয়া অস্বাস্থ্যকর। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের খবর পত্রিকায় পড়ে ঢাকার দশম শ্রেণীর এক শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তার ভাষ‍্য, অনেক বাসই সে দেখছে, কালো ধোঁয়া ছাড়ছে, আগে কখনো এমন দেখেনি। সরকারের উপর খুবই বিরক্ত সে। এমনতর কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে সরকার কিসের উপর দাঁড়িয়ে আছে তাই প্রশ্ন!

পূরণ দাস,

১১ জানুয়ারি, ২০২৫।

Visited 78 times, 1 visit(s) today