বছরের প্রথম দিন ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মাঝে শিক্ষার্থীদের হাতে একযোগে বই প্রাপ্তির উচ্ছ্বাস এবার অপূর্ণ রয়ে গেল। এ নিয়ে নানা অজুহাতও দেখা গেছে। কখনো নতুন করে পাঠ্যসূচি পরিবর্তনজনিত দেরি, নিজ দেশি ছাপাখানায় বই ছাপতে অতিরিক্ত সাড়ে সাত শ কোটি টাকা ব্যয়ের নেপথ্য কারণও শুনতে পেল জাতি ইতিমধ্যে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে। তবুও বই হাতে পৌঁছানো অনিশ্চিত রয়ে গেল।
৪১ কোটি বইয়ের মধ্যে সরবরাহ হয়েছে মাত্র ৬ কোটি বই। বলা হচ্ছে, মার্চেই সব বই হাত পৌঁছে যাবে, এতে শিক্ষাবর্ষের প্রথম তিন মাস উধাও হয়ে গেলই বা! কর্তৃপক্ষ পরামর্শ দিলেন সরকারি ওয়েবসাইট থেকে ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের বই ডাউনলোড করে পড়তে, যতদিন না বই ছাপা সম্পন্ন হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের হাত বিনামূল্যের বই না পৌঁছালেও সব ক্লাসের বিনামূল্যের পাঠ্যবই কিনতে পাওয়া যাচ্ছে রাজধানীর নীলক্ষেতের বিভিন্ন বইয়ের দোকানে। বাংলাবাজার থেকে একটি চক্র পাঠ্যবই কিনে চড়া দামে বিক্রি করছে শিক্ষার্থীদের কাছে। বিনামূল্যের বই হাতে আসার দেরি দেখে অনেক অভিভাবকই সন্তানদের হাতে বই তুলে পড়ার টেবিলে বসিয়ে দেবেন, এই চিন্তা থেকেই এভাবে বই বিক্রির ধান্দায় নেমেছে চক্রটি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বাংলাবাজারের লাইব্রেরির মালিক আজিজ মোল্লা ও উজ্জ্বল নামে দুজনের কাছ থেকে কিনে নীলক্ষেতের লাইব্রেরিগুলোতে বিনামূল্যের বই বিক্রি করছেন।
নীলক্ষেতে সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রথম থেকে নবম-দশম শ্রেণির সব ধরনের পাঠ্যবই খোলা বাজারে বিক্রি হচ্ছে। মীম বুক হাউজ, প্রিমিয়ার বুক হাউজ, আরাফাত বুক হাউজ, শহীদ বুক সেন্টার, বুক লাইন এবং আরিয়ান বুক লাইব্রেরিসহ বেশ কয়েকটি লাইব্রেরিতে সরকারের বিনামূল্যের পাঠ্যবই চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে।
মীম বুক হাউজ বইগুলো অন্যান্য লাইব্রেরি মালিকদের কাছে পাইকারি দরে সরবরাহ করছে।
লাইব্রেরি সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এসব বই বাংলাবাজার থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।
আরাফাত বুক হাউজে ২০২৫ সালের অষ্টম শ্রেণির ‘সাহিত্য কণিকা’ বই বিক্রি হচ্ছে ২৫০ টাকায়। কোনো এনসিটিবি বই ২০০ টাকার নিচে বিক্রি হচ্ছে না। একক্রেতা বই কেনার ভাউচার চাইলে লাইব্রেরির পক্ষ থেকে জানানো হয়, বোর্ডের বইয়ের জন্য কোনো ভাউচার দেওয়া হয় না। ক্রেতাদের ভাউচার ছাড়া বই নিতে বলা হচ্ছে।
শহীদ বুক সেন্টারের মালিক মো. শহীদ নবম-দশম শ্রেণির বাংলা বই ২৫০ টাকায় এবং ষষ্ঠ শ্রেণির ‘চারুপাঠ’ ২০০ টাকায় বিক্রি করছেন। বইয়ের দাম বেশি কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, “নতুন বইয়ের দাম বেশি, বিক্রির ঝামেলা আছে। অনেক কিছু ম্যানেজ করতে হয়।”
আরাফাত বুক হাউজ ও শহীদ বুক সেন্টারে সব বই না পেলে অন্য দোকানের মালিকরা পরামর্শ দেন মীম বুক হাউজ বা প্রিমিয়ার বুক হাউজে যাওয়ার জন্য।
মীম বুক হাউজে প্রথম থেকে নবম-দশম শ্রেণির সব বই মজুদ রয়েছে। দোকানের মালিক সাইফুলের ছোট ভাই ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা বই ব্যবসায়ীদের কাছে এসব বই পাইকারি দরে বিক্রি করছেন। একজন ক্রেতা জানতে চাইলে তিনি নিশ্চিত করেন যে ২০২৫ সালের সব বই এখানে পাওয়া যাবে।
মীম বুক হাউজে একজন ক্রেতা নবম ও দশম শ্রেণির গণিত বই ২০০ টাকায়, নবম শ্রেণির ‘ইংলিশ ফর টুডে’ ১০০ টাকায়, ‘ইংলিশ গ্রামার অ্যান্ড কম্পোজিশন’ ১৫০ টাকায় এবং ষষ্ঠ শ্রেণির ‘বাংলা দ্রুত পঠন-আনন্দ পাঠ’ ১০০ টাকায় কিনেছেন।
একই সময়ে, রুবেল বুক কর্নারে বিভিন্ন শ্রেণির পাঠ্যবই সাজিয়ে বিক্রির জন্য প্রস্তুত রাখা হয়। সেখানে সব শ্রেণির বই পাওয়া যাচ্ছে।
প্রিমিয়ার বুক হাউজে নবম ও দশম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের বই পাওয়া গেলেও বাংলা বই পাওয়া যায়নি। তবে বিক্রেতা একজন ক্রেতাকে আশ্বস্ত করেছেন যে, ২০শে জানুয়ারির মধ্যে সব বই সরবরাহ করা সম্ভব হবে।
বিনামূল্যের বই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে না পৌঁছালেও নীলক্ষেতে কীভাবে সব বই চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে— এমন প্রশ্নের জবাবে এনসিটিবি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এর পেছনে এক শ্রেণির অসৎ মুদ্রণ মালিক জড়িত।
এ বিষয়ে এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এ কে এম রিয়াজুল হাসান বলেছেন, “এটি অসৎ প্রিন্টারদের কাজ।”
প্রিন্টারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না জানতে চাইলে তিনি জানান, ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা অভিযানে নেমেছে। অসৎ প্রিন্টারদের ডেকে এনে বকা দেওয়া হয়েছে। শাস্তির আওতায় আনা হবে তাদের।
ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির সব বই এবং সপ্তম শ্রেণির বাংলা, ইংরেজি ও গণিত বই শিক্ষার্থীদের বছরের প্রথম দিন সরবরাহ করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত সপ্তম শ্রেণির অন্যান্য কিছু বই বিদ্যালয়ে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। তবে অন্য শ্রেণির বই এখনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এসে পৌঁছায়নি।
ঢাকার বেশ কয়েকটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা জানিয়েছেন, তারা প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির সব বই এবং সপ্তম শ্রেণির বাংলা, ইংরেজি ও গণিত বই আগেই পেয়েছেন। পরবর্তীতে সপ্তম শ্রেণির আরও কিছু বই এসেছে। এখন পর্যন্ত এই শ্রেণিগুলোর সব বই শিক্ষার্থীদের দিতে পেরেছেন। তবে অন্যান্য শ্রেণির বই কবে আসবে, সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই।
শিক্ষাবোর্ডের বিনামূল্যের বই বাজারে বিক্রি হওয়ার অভিযোগ নিয়ে গণমাধ্যমকর্মীরা জানতে চাইলে কোনো পুস্তক বিক্রেতা এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
