নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকা, ২২ এপ্রিল ২০২৫, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তাদের শীর্ষ নেতা এটিএম আজহারুল ইসলামকে মুক্ত করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দলটি ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এই হেভিওয়েট যুদ্ধাপরাধীর রায় পুনর্বিবেচনা ও মুক্তির পথ সুগম করতে তৎপর বলে বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে।
এটিএম আজহারুল ইসলামের আপিল শুনানি সম্প্রতি পিছিয়ে আগামী ৬ মে ২০২৫ তারিখে নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে চার বিচারপতির আপিল বেঞ্চ মঙ্গলবার এই আদেশ দেন।
আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী, ৬ মে সাত বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে এই আপিল শুনানি কার্যতালিকার শীর্ষে থাকবে।
এটিএম আজহারুল ইসলাম, যিনি জামায়াতে ইসলামীর সাবেক ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল ছিলেন, তার বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সময় রংপুর অঞ্চলে গণহত্যা, অপহরণ, ধর্ষণ, নির্যাতন ও লুণ্ঠনের মতো গুরুতর মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। ২০১৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়, যা ২০১৯ সালের ৩১ অক্টোবর আপিল বিভাগ বহাল রাখে।
বর্তমানের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল এর চীফ প্রসিকিউটর এর হস্তক্ষেপে চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি সর্বোচ্চ আদালত এটিএম আজহারের রিভিউ আবেদনের ওপর আপিল শুনানির অনুমতি দেয়। জামায়াতের আইনজীবীরা, যাদের মধ্যে ব্যারিস্টার এহসান আবদুল্লাহ সিদ্দিকী, অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির ও ব্যারিস্টার নাজিব মোমেন অন্যতম, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা পূর্ববর্তী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া, যেমন কাদের মোল্লা ও মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদণ্ডের রায়ের ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন।
জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘদিন ধরে এটিএম আজহারের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন করে আসছে। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি দলটি রাজধানীর পল্টনে বিক্ষোভ সমাবেশ করে এবং ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেয়। শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জামায়াত এই বিষয়ে আরও সোচ্চার হয়েছে। দলের আমির ড. শফিকুর রহমানসহ শীর্ষ নেতারা ইউনুস প্রশাসনের কাছে আজহারের মুক্তি ও দলের নিবন্ধন পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছেন।
জামায়াতের একাংশ দাবি করছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল। তবে মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা, বিশেষ করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সহায়তাকারী আল-বদর বাহিনীর সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা নিয়ে ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। এটিএম আজহারের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি রংপুরে আল-বদরের কমান্ডার হিসেবে ১,২০০ জনের গণহত্যাসহ নানা অপরাধে জড়িত ছিলেন।
এদিকে, আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির জানিয়েছেন, “এটিএম আজহারের মামলার সব প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন। আমরা আশা করছি, ৬ মে’র শুনানিতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে।” তবে জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে এই শুনানি পেছানো নিয়ে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। দলের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, মুক্তি না হলে দলের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে পারে।
অন্তর্বর্তী প্রশাসনের ওপর জামায়াতের চাপ এবং আদালতের এই শুনানি নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন উঠছে। অনেকে মনে করছেন, এটিএম আজহারের মতো গুরুতর অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তির মুক্তির প্রচেষ্টা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর আঘাত হানতে পারে। আগামী ৬ মে’র শুনানি এই মামলার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আইনজীবী মহল মনে করছে।
