সিলেটে প্রশাসনের নাকের ডগায় ইসিএ অঞ্চলজুড়ে খনিজসম্পদ লুটের মহোৎসব

সিলেটে প্রশাসনের নাকের ডগায় ইসিএ অঞ্চলজুড়ে খনিজসম্পদ লুটের মহোৎসব
শেয়ার করুন

সংবাদ প্রতিবেদন

সিলেটের পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ঘোষিত অঞ্চলগুলোয় অব্যাহতভাবে চলছে পাথর ও বালু উত্তোলন। পাহাড়, টিলা এবং নদীভিত্তিক এই এলাকায় নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও শত শত নৌকা, ড্রেজার ও ট্রাকের মাধ্যমে প্রতিদিন হাজার হাজার ঘনফুট খনিজসম্পদ তোলা হচ্ছে।

প্রশাসনের নাকের ডগায় এভাবে খনিজ লূটের মহোৎসব এবং কর্তৃপক্ষের নীরবতা ও নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পরিবেশবাদী এবং স্থানীয় বাসিন্দারা।

২০১৫ সালের ৮ই জানুয়ারি পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের গেজেট অনুযায়ী, সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলং পাথর কোয়ারি এলাকার ডাউকি নদী এবং তার দুই পাশের ৫০০ মিটারসহ মোট ১৪.৯৩ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে ইসিএ ঘোষণা করা হয়। ওই গেজেটের ৮ নম্বর নির্দেশনায় স্পষ্ট বলা হয়েছে—এই এলাকায় যান্ত্রিক, ম্যানুয়াল বা যেকোনোভাবে খনিজসম্পদ আহরণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু বাস্তবে সেই নির্দেশনা মানা হচ্ছে না।

গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ ও ভোলাগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, দিনরাত অব্যাহত রয়েছে বালু-পাথর উত্তোলন। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, প্রতিদিন গড়ে প্রায় এক হাজার ট্রাক ৫০০ থেকে ৬০০ ঘনফুট করে বালি-পাথর নিয়ে যাচ্ছে ডাউকি নদী এলাকা থেকে। সন্ধ্যার পর শুরু হয় বড় ড্রেজার ও স্টিলের নৌকা বাল্কহেড দিয়ে রাতভর খনিজসম্পদ উত্তোলন।

জাফলংয়ের স্থানীয় এক মাঝি জানান, রাতে ডাউকি নদীর জাফলং ব্রিজ পার হয়ে বহু নৌকা প্রবেশ করে, যেগুলো মধ্যরাত পর্যন্ত নদী শুষে নেয়। এসব খনিজ সামগ্রী তীরে এনে বিক্রি করা হয় মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে, যারা পরে সেগুলো দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠিয়ে দেন।

ভোলাগঞ্জ ও কোম্পানীগঞ্জে চিত্র আরও ভয়াবহ। শাহ আরেফিন টিলায় দিনে-দুপুরে চলছে পাথর উত্তোলন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, গত বছরের ৫ই আগস্টের পর থেকে একদিনও বন্ধ হয়নি এই কার্যক্রম। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যবেষ্টিত ভোলাগঞ্জের রেলওয়ে বাঙ্কার এলাকায় গাছপালা কেটে ফেলে তৈরি করা হয়েছে বিশাল বিশাল গর্ত—যা এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।

পরিবেশ আন্দোলন কর্মীরা বারবার প্রতিবাদ জানিয়েও কোনো সুফল পাননি।

স্থানীয়রা জানান, নদী ও পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন” সংগঠনের ব্যানারে তারা বহুবার প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন, কিন্তু প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

সম্প্রতি গোয়াইনঘাটে এক অভিযানে অংশ নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রতন কুমার অধিকারী জানিয়েছেন, ইসিএ অঞ্চল থেকে বালু উত্তোলনের প্রমাণ পাওয়ায় সরকারিভাবে জব্দ করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট মালামাল।

পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) সিলেটের সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শাহ সাহেদা বেগম বলেন, “বর্তমানে যে লুটপাট চলছে, তা স্মরণকালের মধ্যে ভয়াবহ। এটি প্রশাসনের ব্যর্থতা নয়, বরং সম্পূর্ণ উদাসীনতা।”

এদিকে সিলেটের জেলা প্রশাসক শের মাহবুব মুরাদ বলেন, “আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি। কিন্তু জনবল সংকটের কারণে স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না। অভিযান শেষ হলেই আবার শুরু হয় উত্তোলন। তবে খুব শিগগিরই সমন্বিতভাবে এই অবৈধ কর্মকাণ্ড বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযানের নামে লোক দেখানো তৎপরতা ছাড়া বাস্তবসম্মত কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না, আর এ সুযোগেই চলছে সিলেটের মূল্যবান খনিজসম্পদের নির্দয় লুটপাট।

Visited 73 times, 1 visit(s) today