মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে ছাত্রলীগ নেতা: হত্যার নির্দেশ দিয়ে হাসনাত আব্দুল্লাহ বলে- ‘খেয়ে দে’

মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে ছাত্রলীগ নেতা: হত্যার নির্দেশ দিয়ে হাসনাত আব্দুল্লাহ বলে- ‘খেয়ে দে’
শেয়ার করুন
নিজস্ব প্রতিবেদক | ৩১শে মে, ২০২৫

আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের ওপর যে নির্মম নিপীড়ন-নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে বৈষম্যবিরোধী কর্মীরা, তারই এক জ্বলজ্যান্ত দৃষ্টান্ত উঠে এলো মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা ছাত্রলীগের নেতা আল-রিয়াদ আদনান অন্তরের ভাষ্যে। বৈছা নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ ফোনে নির্দেশ দিয়েছিল তাকে হত্যা করতে, তবুও ভাগ্যজোরে প্রাণে বেঁচে ফিরতে পেরেছেন অপহৃত ও মুক্তিপণ দেওয়া এই ছাত্রলীগ নেতা।

বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের সাবেক-সহ-সম্পাদক অন্তরকে মাওনা চৌরাস্তা থেকে অপহরণ করা হয় গত ২৮শে মে, বুধবার রাত ৯টার দিকে। স্থানীয়দের চোখের সামনে তাকে ঘিরে ধরে ৩০-৪০ জনের একটি সংঘবদ্ধ দল। তারা উচ্চস্বরে বলে— “গাজীপুরে হাসনাত আব্দুল্লাহর উপর হামলাকারীকে ধরেছি, আওয়ামী লীগের দোসরকে ধরেছি!”

তুলে নিয়ে যাবার পর অজ্ঞাত স্থানে রেখে নির্যাতন করা হয় অন্তরকে। তারপরের অভিজ্ঞতা অন্তর লিখেছেন তার ভেরিফায়েড ফেসবুক প্রোফাইলে। তিনি লিখেছেন:

হাসনাত আবদুল্লাহর হামলাকারী বলতে বলতে আমাকে অপহরণকারীরা নিয়ে যায়। ওরা আমাকে অজ্ঞাত স্থানে নেয়ার পরে বারবার জিজ্ঞেস করতে থাকে আমি কেন হাসনাত আবদুল্লাহর উপর হামলা করলাম! এরপর এদের একজন মাথায় টুপি এবং বিস্কুট কালার পাঞ্জাবি পরিহিত হাসনাতকে ফোন দিয়ে লাউডস্পিকার দেয়। ওপাশ থেকে হাসনাত ফোন ধরে বলে- “কাঈফ বলো”। এপাশ থেকে বলতে থাকে- “ভাই আপনার উপর হামলাকারী অন্তরকে ধরে ফেলছি।”

অনেকটা গৌরবের সাথে কথাটা বলতে থাকে। ঐপাশ থেকে হাসনাত বলে- “পুরো নাম বলো ওর”, তখন অন্য একটা ছেলে বলে- “ওর নাম আল-রিয়াদ আদনান অন্তর। মুক্তির ডাক-৭১ করে ঐ ছেলেটা।” তখন হাসনাত বলে- “খেয়ে দে”। এরপরই ফোন রেখে দেয়।

হাসনাত আবদুল্লাহর এই কথাটা আমার এখনো কানে বাজে। কথাটা শুনেই আমি আতঙ্কিত হয়ে যাই। আর মনে মনে ভাবতে থাকি আমার বোধহয় আর বাড়ি ফেরা হবে না।

 

এর আগে, অন্তরের অপহরণের ঘটনা জানা যায় তার পরিবার ও স্বজনদের কাছ থেকে।

জাতীয় নাগরিক পার্টি’র (এনসিপি) নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহর অনুসারীরা এই অপহরণ ও নির্যাতনের পর মুক্তিপণ বাণিজ্যে জড়িত বলে জানান অন্তরের স্বজনরা। তারা অন্তরকে তুলে নিয়ে যাবার সময় হাসনাতের ওপর হামলার অভিযোগে অন্তরকে আটক করা হয়েছে বলে স্লোগান দিয়েছিল।

অন্তরকে তুলে নিতে ব্যবহৃত হয় ৮-১০টি মোটরসাইকেল এবং কয়েকটি অটোরিকশা। তাকে নিয়ে যাওয়া হয় মাওনার ইয়াকুব আলি মার্কেটের পেছনের একটি মুরগির খামারের পার্শ্ববর্তী ফাঁকা মাঠে, যেখানে তাকে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়। পরিবার ও স্বজনরা ছুটে এলেও অন্তরকে খুঁজে পাননি।

অন্তরের পরিবারের মোবাইলে আসে ফোন, ৩০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে অপহরণকারীরা। ফোনের ভেতরেই শোনা যায় অন্তরের আর্তচিৎকার, নির্যাতনের শব্দ। এক ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়।

ভয়ে ও আতঙ্কে স্বজনরা ২ লাখ টাকা এবং অন্তরের আইফোনের বক্স নিয়ে এমসি বাজারে হাজির হন। সেখানে বাইকে আসা তিনজন অপরিচিত লোক টাকা ও জিনিস নিয়ে যায়। আশ্বাস দেয়, “কিছুক্ষণ পর অন্তরকে ছেড়ে দেবে।”

কিন্তু সে আশ্বাস ছিল প্রতারণা। ভোর ৪টার দিকে আবার ফোন আসে— “৩০ লাখ না হোক, ১০ লাখের নিচে অন্তরকে ছাড়বো না। না দিলে লাশ নিয়ে যান!”

পড়ুন: ‘আওয়ামী দোসর ধরেছি’- বলে ছাত্রলীগ নেতা অপহৃত, মুক্তিপণ নিয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় ফেরত

আত্মীয়রা প্রাণভিক্ষা করে আরও ৩ লাখ ৪৫ হাজার টাকা জোগাড় করে আবার যান সেই গলিতে। টাকা নিয়ে গেলেও এরপর অপহরণকারীদের সঙ্গে আর যোগাযোগ সম্ভব হয়নি।

শেষ পর্যন্ত ভোররাতে অন্তরকে পাওয়া যায়—হাত-পা বাঁধা, রক্তাক্ত, অচেতন অবস্থায়। অপহরণকারীরা তাকে ফেলে যায় বাড়ির সামনের মাঠে।

স্থানীয় থানা বা প্রশাসন কোনো সহায়তা দেয়নি। অন্তর দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রলীগের মানবিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই, বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পর, তিনি বিরোধী গোষ্ঠীর চোখে ছিলেন ‘টার্গেট’।

Visited 307 times, 1 visit(s) today