ইমতিয়াজ মাহমুদ
(১)
মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে যারা যারা বেয়াদবি করেছে, ওদের নাম ঠিকানা মনে রাখবেন মেহেরবানী করে। মনে রাখবেন, ভুলবেন না। তুচ্ছতম বেয়াদবিরও জবাব দিতে হবে- এমনকি বাচনিক বেয়াদবিও যদি হয়। এইসব বেয়াদবির জবাব নেওয়া, হিসাব বুঝিয়ে দেওয়া আপনার আমার দায়িত্ব। কেন দায়িত্ব? কিভাবে দায়িত্ব? বলছি।
তখন বাংলাদেশের জনসংখ্যা বলা হতো সাড়ে সাত কোটি। ১৯৭১ সনের কথা বলছি। দেশ আক্রান্ত- এক লক্ষাধিক সদস্যের এক বিশাল আধুনিক বাহিনী আমাদের দেশ আক্রমণ করেছে। দেশের কোটি মানুষ প্রাণ হাতে নিয়ে দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছে। আমরা পালিয়ে বেড়াচ্ছি এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে। সেই সময় আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা রুখে দাঁড়িয়েছে আমাদের হয়ে।
আপনি একজন এডভোকেট আবদুল হামিদ বা এডভোকেট ফজলুর রহমানের কথা চিন্তা করেন। ওরা তখন নিতান্ত তরুণ, ফজলুর রহমান তখন কিশোর, কলেজে পড়েন মাত্র। মুহূর্তমাত্র দ্বিধা না করে ওরা যুদ্ধে যোগ দিয়েছে। কার জন্যে। আমি সবসময়ই মনে করি আমাদের এইসব যোদ্ধারা আমাকে রক্ষার জন্যে আমার মাতৃভূমিকে রক্ষার জন্যে, আমার জন্মদাত্রী জননীকে রক্ষার জন্যে যুদ্ধে গেছে। নিজের প্রাণের কথা ভাবেননি ওরা, আমার কথা ভেবেছেন।
(২)
নিরাপদে ওরা ওদের কলেজে পাঠ বা স্বাভাবিক জীবন অব্যাহত রাখতে পারতেন, পালিয়ে প্রাণ নিজের প্রনা রক্ষা করতে পারতেন। সেটা ওরা করেননি। ওরা আমার কথা পনার কথা ভেবেছেন- আমার জন্যে ওরা যুদ্ধে গেছে। ফজলুর রহমান ভাই সেদিন একাত্তরের কথা বলতে গিয়ে কেঁদেছেন, ওঁর বন্ধু ওঁর পাশে থেকে গুলি খেয়ে পড়ে গেছেন, শুধু একটা কথা বলতে পেরেছেন সেই বীর শাহাদাৎ বরণের আগে, ‘মামা, আমার মারে দেইখো।’ ফজলুর রহমান প্রশ্ন করছেন, আমি সেই একাত্তর ভুলে যাবো!
না, আমরা ভুলে যাইনি। বাঙালীর হাজার বছরের ইতিহাসে এরকম ঘটনা আর ঘটেনি। আমি সেই ঘটনা ভুলে যাবো? জি না। নিতান্ত শিশু ছিলাম, কিন্তু দেখেছি, মনে আছে। মুক্তিযোদ্ধা কথাটার অর্থ কি সেটা আমি জানি। কি করে আমি ভুলে যাবো একেকজন মুক্তিযোদ্ধার কথা! না, সেটা কখনো হবে না। আপনারা আপনাদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন আমাকে রক্ষার জন্যে, আমার মাতৃভূমির জন্যে, আমার মায়ের জন্যে। আমি কি এতোই অকৃতজ্ঞ যে আমি আমার বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কথা ভুলে যাবো!
না, ভুলি নাই। এইটাও ভুলি নাই- বাঙালীর শ্রেষ্ঠ সন্তানেরা হচ্ছে আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা। শ্রেষ্ঠ মানে বুঝেন- এইরকম সন্তান যে দেশের মাটিতে জন্মায় ধন্য সেই মাটি। আর যে যতবড় কাণ্ডই করুক, একজন মুক্তিযোদ্ধার সমান এই বাংলার জীবনে আর কেউ নেই, আর কেউ হবে না। আমাদের সেই সাহসী পূর্বজ নারী পুরুষ- ওরা অনেকেই আজকে নেই আমাদের মধ্যে। বাকিরা সকলেই বৃদ্ধ হয়েছেন, অশক্ত অনেকেই, মৃত্যু পথযাত্রী কেউ কেউ।
(৩)
এই অধম মনে করে আমাদের পূর্বজ বাংলার এইসব বীর সন্তানদের সম্মান রক্ষা করা আমার দায়িত্ব। প্রতিটি ঘটনা- যেখানেই একজন মুক্তিযোদ্ধাকে কেবল মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার কারণে অপমানের চেষ্টা করা হয়, নির্যাতন করা হয়, প্রতিটি ঘটনা আমার ব্যক্তিগত ব্যর্থতা। আমাদের সকলের ব্যর্থতা। আমাদের দায়িত্ব ছিল, যে হাত একজন মুক্তিযোদ্ধাকে আঘাত করে সেই হাত কেটে নেওয়া।
নিজের গৌরব কখনো ভুলবেন না। নিজের পরিচয় কখনো ভুলবেন না। নিজের মর্যাদা যেন ভুলে যাবেন না। মনে রাখবেন- আমাদের সবচেয়ে অহংকারের জায়গাটিতে যারা আঘাত করে ওদেরকে মনে রাখবেন। বীরজ্ঞানে যাদের চরণ স্পর্শ করার কথা আমার আপনার, ওদেরকে যদি কেউ আক্রমণ করে, মনে রাখবেন। চিনে রাখবেন। চিনে রাখুন।
