নিজস্ব প্রতিবেদক
গ্রামীণ সুবিধাবঞ্চিত নারীদের জন্য স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, আইন, জেন্ডার, ব্যবসা, পরিবার পরিকল্পনা ও সাইবার সিকিউরিটিসহ ছয়টি খাতে তথ্যসেবা প্রদানের লক্ষ্যে চালু হওয়া ‘তথ্য আপা’ প্রকল্পটি বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইউনূস সরকার।
চলতি জুন মাসে এই প্রকল্পের কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ জারি করা হয়েছে, যা দেশের ৪৯২টি উপজেলায় কর্মরত প্রায় ১,৯৬৮ জন নারী-পুরুষ কর্মীর জন্য বেকারত্ব ও আর্থিক সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০১৭ সালের এপ্রিলে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে জাতীয় মহিলা সংস্থার মাধ্যমে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে গ্রামীণ নারীদের ক্ষমতায়ন। প্রকল্পটি ৪৯২টি উপজেলায় তথ্যকেন্দ্র স্থাপন করে তৃণমূল পর্যায়ে নারীদের তথ্যসেবা ও পরামর্শ প্রদান করে আসছিল। প্রতিটি তথ্যকেন্দ্রে একজন তথ্যসেবা কর্মকর্তা (১০ম গ্রেড), দুজন তথ্যসেবা সহকারী (১৬তম গ্রেড) এবং একজন অফিস সহায়ক (২০তম গ্রেড) নিয়োজিত ছিলেন।
কিন্তু সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে এই প্রকল্পের কর্মীদের কর্মস্থল ত্যাগ করতে এবং কার্যালয় গুটিয়ে নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর আগে কর্মীদের চাকরি রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।
এমনকি, হাইকোর্টে দায়েরকৃত রিটের বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়েই এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হচ্ছে। ফলে, কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।
প্রকল্পের কর্মীরা জানিয়েছেন, তারা ২০১৮ সালের নভেম্বরে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ পেয়েছিলেন। কিন্তু ইউনুস সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে মাসের পর মাস বেতন বন্ধ থাকায় তারা ইতোমধ্যে আর্থিক সংকটে পড়েছেন।
গত ২৭ মে থেকে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন তারা, দাবি করে রাজস্ব খাতে স্থানান্তর এবং বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধের। ২৩ দিন ধরে চলা এই আন্দোলনে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো নিশ্চিত সমাধান দেওয়া হয়নি।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শারমিন এস মুরশিদ আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনায় বসলেও তিনি রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারেননি। তিনি বলেন, “এই প্রতিশ্রুতি আমি দিতে পারি না। এর সঙ্গে অনেক মন্ত্রণালয় জড়িত। এটা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।”
তিনি আন্দোলন প্রত্যাহার করে কাজে ফিরে যাওয়ার অনুরোধ জানালেও কর্মীরা তাদের দাবিতে অটল রয়েছেন।
আন্দোলন পরিচালনা কমিটির সভাপতি সঙ্গীতা সরকার বলেন, “আমরা ২৩ দিন ধরে রাস্তায়। আমাদের দুই দফা দাবি না মানা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।” তিনি আরও জানান, সরকারের পক্ষ থেকে প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে বলে জানানো হলেও এটি তাদের দাবির সমাধান নয়।
প্রকল্প বন্ধের এই সিদ্ধান্ত গ্রামীণ নারীদের তথ্যপ্রযুক্তি ও সেবা প্রাপ্তির সুযোগ কেড়ে নিচ্ছে, যা তাদের ক্ষমতায়নের পথে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি করবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। এছাড়া, প্রায় আড়াই হাজার কর্মীর বেকারত্ব ও আর্থিক সংকট দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা আন্দোলনকারীদের প্রতি সংহতি জানিয়েছেন এবং সরকারকে দ্রুত সমাধানে আসার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে, সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ না নেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে।
তথ্য আপা কর্মীরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, তাদের দাবি পূরণ না হলে আগামী দিনে আরও কঠোর কর্মসূচির দিকে যাবেন তারা। এই পরিস্থিতি গ্রামীণ নারীদের ক্ষমতায়নের স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করার পাশাপাশি হাজারো পরিবারের জীবিকার ওপরও প্রভাব ফেলছে।
