আগের ১০ এয়ারবাস এর সাথে ড. ইউনূসের আরো ২৫ বোয়িং ক্রয়-এর সিদ্ধান্ত হঠকারীতা নয়তো?

আগের ১০ এয়ারবাস এর সাথে ড. ইউনূসের আরো ২৫ বোয়িং ক্রয়-এর সিদ্ধান্ত হঠকারীতা নয়তো?
শেয়ার করুন
নিজস্ব প্রতিবেদক। ঢাকা, ২৭ জুলাই ২০২৫।

নোবেল বিজয়ী প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাম্প্রতিক লন্ডন সফরে এয়ারবাসের সঙ্গে বিমান ক্রয় নিয়ে আলোচনার পর হঠাৎ বোয়িং কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার খবর বাংলাদেশের বিমান চলাচল খাতে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের পেছনে স্বচ্ছতার অভাব এবং বোয়িংয়ের সাম্প্রতিক নিরাপত্তা সমস্যা নিয়ে সমালোচনা তীব্র হচ্ছে। এদিকে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর ২০২৩ সালের বাংলাদেশ সফরকালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জন্য ১০টি এয়ারবাস এ৩৫০ বিমান ক্রয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যার মূল্য প্রায় ৩.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। জুনে লন্ডন সফরেও এয়ারবাসের কর্মকর্তাদের সাথে বিমান ক্রয়ের ব্যাপারে মিটিং করে আসার পর ড. ইউনূসের এই আকস্মিক সিদ্ধান্ত পরিবর্তন এবং এর পেছনের কারণ নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।

শেখ হাসিনার আমলে এয়ারবাস চুক্তি

২০২৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ৩৩ বছর পর প্রথম ফরাসি প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাংলাদেশ সফরে আসেন। এই সফরে তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন, যেখানে বাংলাদেশ-ফ্রান্স সম্পর্ক জোরদার করার পাশাপাশি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জন্য ১০টি এয়ারবাস এ৩৫০ বিমান ক্রয়ের একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির আওতায় আটটি যাত্রীবাহী এ৩৫০ এবং দুটি এ৩৫০এফ কার্গো বিমান ক্রয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। এই চুক্তি ছিল বাংলাদেশের জন্য এয়ারবাসের সঙ্গে প্রথম বড় ধরনের চুক্তি, কারণ বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহরে এতদিন বোয়িংয়ের বিমানই প্রাধান্য পেয়ে এসেছিল।

ম্যাক্রোঁ এই চুক্তিকে “ইউরোপীয় মহাকাশ শিল্পের প্রতি বাংলাদেশের আস্থার প্রমাণ” হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “এই ১০টি এ৩৫০ বিমান ক্রয়ের প্রতিশ্রুতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।” শেখ হাসিনা এই সফরকে “আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সতেজ বাতাস” হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, এটি বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের মধ্যে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করবে এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখবে। এই চুক্তির পাশাপাশি ফ্রান্সের সঙ্গে একটি পৃথিবী পর্যবেক্ষণ স্যাটেলাইট সিস্টেম ক্রয়ের জন্য একটি সমঝোতা পত্র স্বাক্ষরিত হয়, যা বাংলাদেশের ভূমি ও সমুদ্র অঞ্চল পর্যবেক্ষণে ব্যবহৃত হবে। এই সফরে ফ্রান্স বাংলাদেশকে অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য ঋণ সুবিধা প্রদানের প্রতিশ্রুতিও দেয়।

এয়ারবাস চুক্তি নিয়ে সমালোচনা

শেখ হাসিনার আমলে এয়ারবাস চুক্তি স্বাক্ষর হলেও, এটি বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহরে বর্তমানে ২০টির বেশি বোয়িং বিমান রয়েছে, এবং এয়ারবাসের বিমান পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষিত পাইলট ও রক্ষণাবেক্ষণ কর্মীদের অভাব ছিল। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এয়ারবাসের বিমান যুক্ত করার ফলে পাইলট ও ক্রুদের জন্য নতুন টাইপ-রেটিং প্রশিক্ষণ এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অতিরিক্ত ব্যয় বাড়বে। এছাড়া, বিমানের আর্থিক সংকট এবং দুর্নীতির অভিযোগের মধ্যে ৩.২ বিলিয়ন ডলারের এই চুক্তি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি করবে বলে সমালোচনা উঠেছিল।

২০২২ সালে এয়ারবাস ঢাকায় এ৩৫০ বিমান প্রদর্শন করে এবং বিমানের একটি কমিটি এই বিমান ক্রয়ের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য গঠিত হয়। কিন্তু এই কমিটি তাদের মূল্যায়ন শেষ করার আগেই ২০২৩ সালের ৫ মে শেখ হাসিনার শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান যুক্তরাজ্যের ব্যবসা ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী লর্ড ডমিনিক জনসনের সঙ্গে একটি যৌথ বিবৃতি স্বাক্ষর করেন, যেখানে আটটি যাত্রীবাহী এবং দুটি কার্গো এয়ারবাস বিমান ক্রয়ের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। এই দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়েও সমালোচনা হয়েছিল।

ড. ইউনূসের লন্ডন সফর ও বোয়িং সিদ্ধান্ত

২০২৫ সালের জুন মাসে ড. ইউনূস লন্ডনে সফর করেন এবং এয়ারবাসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এই বৈঠকে এয়ারবাসের জ্বালানি-সাশ্রয়ী এ৩২১নিও এবং এ৩৫০ মডেলের বিমান ক্রয়ের বিষয়ে আলোচনা হয়। এয়ারবাসের প্রতিনিধিরা এই সফরকে বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারের একটি সুযোগ হিসেবে দেখছিলেন। কিন্তু এই আলোচনার পর হঠাৎ করেই বোয়িংয়ের ৭৩৭ ম্যাক্স এবং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার মডেল ক্রয়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে সূত্র জানায়।

সাম্প্রতিক সময়ে বোয়িংয়ের নিরাপত্তা সমস্যা বিশ্বব্যাপি সমালোচিত হচ্ছে। ২০১৮ এবং ২০১৯ সালে বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্সের দুটি মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় ৩৪৬ জনের মৃত্যু এবং ২০২৪ সালে একটি বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স ৯-এর দরজার প্লাগ ফুঁড়ে যাওয়ার ঘটনা বোয়িংয়ের নিরাপত্তা মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এছাড়া, ২০২৫ সালের জুনে ভারতের আহমেদাবাদে বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার দুর্ঘটনায় ২৪১ জনের মৃত্যু বোয়িংয়ের সুনামকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এয়ারবাসের তুলনায় বোয়িংয়ের বিমান বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ এবং এর রক্ষণাবেক্ষণে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে।

বোয়িং কেনার সিন্ধান্তের সমালোচনা ও প্রশ্ন

ড. ইউনূসের এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন নিয়ে রাজনৈতিক মহল ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। জুনেই যিনি এয়ারবাস কিনতে আগ্রহী ছিলেন বিগত সরকারের এয়ারবাসের ১০টি বিমান ক্রয়ের চুক্তির ধারাবাহিকতায়, জুলাই এসে তিনি ঘোষনা দিলেন ৫ বিলিয়নের ২৫ টা বোয়িং কেনার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বানিজ্য ঘাটতি মেটাতে এই উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে বলে বিবৃতি দিয়েছেন বানিজ্য উপদেষ্টা।

ইউরোপের সাথে বাংলাদেশের রপ্তানি বানিজ্যে বছরে ৪০ বিলিয়ন ডলার, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে রপ্তানি বানিজ্য মাত্র ৭ বিলিয়ন ডলার। এয়ারবাস ক্রয় চুক্তি বাতিল করে মার্কিন বলয়কে সন্তুষ্ট করতে ৫ বিলিয়ন ডোলারে বোয়িং ক্রয় কি ফলপ্রসু কোন সমাধান হতে পারে?

এয়ারবাসের সাথে করা পূর্বের ৩.২ বিলিয়নের চুক্তির সাথে আরো ২৫টি বিমান কিনতে ৫ বিলিয়নের চুক্তি আদৌ কি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বানিজ্য ঘাটতি মেটাতে পারবে? এয়ারবাসের ১০টি বিমানের সাথে আরো ২৫টি বিমান চালানোর সক্ষমতা কি বাংলাদেশ বিমানের আছে কিনা সে প্রশ্নও উঠেছে, যেখানে বাংলাদেশ বিমানের যাত্রী সংকটের কারনে অনেক রুটে ফ্লাইট বন্ধ হয়ে গেছে।

শেখ হাসিনার আমলে ফ্রান্সের সঙ্গে এয়ারবাস ক্রয়ের চুক্তি বাংলাদেশের বিমান খাতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। এই চুক্তি বাংলাদেশের কৌশলগত স্বাধীনতা এবং ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত। কিন্তু ড. ইউনূসের নেতৃত্বে এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন এবং বোয়িংয়ের দিকে ঝুঁকে পড়া নিয়ে স্বচ্ছতার অভাব এবং নিরাপত্তা উদ্বেগ দেশবাসীর মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। এই সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ এবং এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা এবং তদন্তের দাবি উঠেছে।

Visited 14 times, 1 visit(s) today