নিজস্ব প্রতিবেদক | ৩ আগস্ট ২০২৫
দৈনিক জনকণ্ঠ পত্রিকার প্রধান কার্যালয় দখলের ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, জুলাই-আগস্টের কোটা সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত একটি গ্রুপ এই দখলের পেছনে জড়িত। এই ঘটনাকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছেন অনেকে। এছাড়া, ৫ আগস্টের পর জুলাই আন্দোলনকারীদের নামে বিভিন্ন মিডিয়া হাউজ ও পত্রিকা অফিসে মব সৃষ্টি করে দখলের ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
জনকণ্ঠ অফিস দখলের ঘটনা ২ আগস্ট ২০২৫-এর রাতে দৈনিক জনকণ্ঠের প্রধান কার্যালয়ে একদল ব্যক্তি প্রবেশ করে অফিস দখল করে নেয় বলে অভিযোগ উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যায়, জয়নাল আবেদীন শিশির নামে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্য সচিবের নেতৃত্বে এই দখল সংঘটিত হয়। বৈষম্য বিরোধী ও এনসিপির সদস্যরা মিলে ৬ সদস্যের এডিটর প্যানেল ঘোষনা করে মাইকে ঘোষনা দিয়ে।
ঘটনা শুরু হয় জনকণ্ঠ পত্রিকা জুলাই আন্দোলনের বিরুদ্ধে এবং ৫ আগস্টের শোক পালনের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় প্রতিবাদ হিসেবে এক স্যাবোটাজের মাধ্যমে। এর পরিপ্রেক্ষিতে পত্রিকাটির প্রথম পাতা লাল রঙে রঞ্জিত করা হয় এবং জুলাই আন্দোলনের পক্ষে থাকা সাংবাদিকদের বেআইনিভাবে বরখাস্ত করা হয় বলে দাবি করা হয়।
জনকণ্ঠের একটি সূত্র জানায়, এই দখলের পেছনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কিছু নেতা ও তাদের সমর্থকদের হাত ছিল, যারা পত্রিকাটির সম্পাদকীয় নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে।
পত্রিকাটির সম্পাদক শামীমা আতিকুল্লাহ খান এক ভিডিও বার্তায় জানান, তিনি আগস্ট অভ্যুথান উপলক্ষে পত্রিকার প্রথম পাতা লাল রঙ করার নির্দেশনাই দিয়েছিলেন। কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীরা একটা ইস্যু সৃষ্টির মাধ্যমে পত্রিকা অফিস দখল করার উদ্দেশ্যে প্রথম পাতা কালো রঙ করে, এবং এই ইস্যুর প্রেক্ষিতেই মব সৃষ্টি করে পত্রিকাটি দখল করে।
৫ আগস্টের পর মিডিয়া হাউজ ও পত্রিকা অফিস দখল
৫ আগস্ট ২০২৪-এ আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ও শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা বেড়েছে। এই সময়ে জুলাই-আগস্টের কোটা সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন মিডিয়া হাউজ ও পত্রিকা অফিসে হস্তক্ষেপের অভিযোগে জড়িয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত তথ্য এবং বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই গ্রুপটি সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে ক্ষুব্ধ ছিল।
একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনায়, ১৮ ডিসেম্বর ২০২৪-এ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একজন শীর্ষ নেতার হস্তক্ষেপে একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের পাঁচজন সাংবাদিকের চাকরি হারানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, আন্দোলনের নেতারা ওই চ্যানেলের বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের পরিচালকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ১০ জন সাংবাদিকের নামের তালিকা প্রদান করে এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চাপ প্রয়োগ করে।
এছাড়া, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৫ আগস্টের পর থেকে কয়েকটি পত্রিকা ও টিভি চ্যানেলের কার্যালয়ে মব সৃষ্টি করে হামলা, ভাঙচুর এবং নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়েছে। এই ঘটনাগুলোর পেছনে জুলাই আন্দোলনকারীদের একাংশ জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে, যারা সরকারের পতনের পর গণমাধ্যমের উপর নিজেদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। এই হস্তক্ষেপের ফলে কিছু গণমাধ্যমে সম্পাদকীয় পরিবর্তন এবং নতুন নিয়োগে রাজনৈতিক দলের প্রভাব দেখা গেছে, যা সাংবাদিকতার স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৪-এ জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তবে, এই ঘটনাগুলো সেই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে সমালোচকরা মনে করছেন। বিশেষ করে, মব সৃষ্টির মাধ্যমে গণমাধ্যমে হস্তক্ষেপের অভিযোগ সাংবাদিকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মব সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে, এবং সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশের মাধ্যমে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে পূর্বের মামলাগুলো বাতিল করা হচ্ছে।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো এই ঘটনাগুলোর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। একজন সিনিয়র সাংবাদিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আন্দোলনের নামে গণমাধ্যমে হস্তক্ষেপ গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য হুমকি। এটি একটি নতুন ধরনের নিয়ন্ত্রণ, যা পূর্বের সরকারের সময়ের চেয়েও বিপজ্জনক হতে পারে।”
জুলাই আন্দোলনের সমন্বয়কদের একাংশ এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তারা গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পক্ষে, এবং এই ধরনের ঘটনাগুলো তাদের আন্দোলনের মূল লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তবে, এই ঘটনাগুলোর তদন্ত ও জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।
জনকণ্ঠ অফিস দখল এবং ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন গণমাধ্যমে হস্তক্ষেপের ঘটনা বাংলাদেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এই ঘটনাগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের উপর এখন দায়িত্ব গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা করা এবং এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা।
