শ্রীলংকার মতোই বাংলাদেশে আগস্ট২৪ এসেছিল, সামনেও কি একই পরিণতি?

শ্রীলংকার মতোই বাংলাদেশে আগস্ট২৪ এসেছিল, সামনেও কি একই পরিণতি?
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক। ঢাকা, ২২ আগস্ট ২০২৫, শুক্রবার:

শ্রীলঙ্কার সাবেক রাষ্ট্রপতি রনিল বিক্রমাসিংহের গ্রেপ্তারের খবর দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ২০২২ সালের জনবিক্ষোভের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা বিক্রমাসিংহেকে রাষ্ট্রীয় তহবিলের অপব্যবহারের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থানের ঘটনার সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে।

২০২৫ সালের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের ফলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ এবং অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতায় আসার ঘটনা শ্রীলঙ্কার ২০২২ সালের ঘটনার সঙ্গে মিলে যায়। কিন্তু শ্রীলঙ্কার সাবেক নেতার গ্রেপ্তারের ঘটনা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে: বাংলাদেশ কি শ্রীলঙ্কার মতো একই পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে?

২০২২ সালে শ্রীলঙ্কায় অর্থনৈতিক সংকট ও জনবিক্ষোভের মুখে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি গোতাবায়া রাজাপক্ষে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হন, এবং রনিল বিক্রমাসিংহে ক্ষমতায় আসেন। তিনি অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে দেশকে স্থিতিশীল করার চেষ্টা করলেও, কঠোর নীতি ও দুর্নীতির অভিযোগে জনগণের সমর্থন হারান।

২০২৪ সালের নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর, ২০২৫ সালের ২২ আগস্ট তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, ২০২৩ সালে কিউবার জি৭৭ সম্মেলন থেকে ফেরার পথে যুক্তরাজ্যে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যক্তিগত সেমিনারে যোগ দেওয়ার জন্য সরকারি তহবিলের অপব্যবহার, যার খরচ ছিল প্রায় ১৬.৯ মিলিয়ন রুপি। এছাড়া, তার ২৩টি বিদেশ সফরে ৬০০ মিলিয়ন রুপির বেশি খরচের অভিযোগও তদন্তাধীন।

বাংলাদেশে ২০২৫ সালের গণঅভ্যুত্থান শ্রীলঙ্কার ঘটনার সঙ্গে তুলনীয়, যেখানে জনবিক্ষোভের মুখে শেখ হাসিনার সরকার পতন হয়। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসেছে, কিন্তু পশ্চিমা নেতাদের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে ব্যর্থতা, আইন-শৃঙ্খলা সমুন্নত রাখতে বার্থতা, প্রতিবেশী দেশ গুলোর সাথে সম্পর্ক অবনমন, বাজার নিয়ন্ত্রন থেকে শুরু করে অর্থনীতি পুরুরুদ্ধারে ব্যার্থতা, গালভরা সংস্কারের বুলি দিয়ে আদতে থ্রী জিরোতেই অবস্থান। আর নিজের ব্যাক্তিগত এনজিও কাজে সরকারের অর্থ ব্যায়ে বিভিন্ন সামিটে কন্যা, ও নিজস্ব লটবহর সহ রাষ্ট্রীয় সফর, রনিল বিক্রমাসিংহের পথই নির্দেশ করে।

শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সংকট ছিল মূলত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাস, ঋণের বোঝা এবং কোভিড মহামারীর প্রভাব। বাংলাদেশও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে, যেমন উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং জ্বালানি সংকট। তবে, বাংলাদেশের রিজার্ভ এখনো তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল, এবং আইএমএফের ঋণ সহায়তা রয়েছে। শ্রীলঙ্কায় রনিলের কঠোর আইএমএফ নীতি জনগণের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছিল, যা বাংলাদেশের জন্যও একটি সতর্কতা।

রনিল বিক্রমাসিংহের গ্রেপ্তার শ্রীলঙ্কার দুর্নীতি বিরোধী প্রচেষ্টার একটি অংশ, যা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৪ সালের দুর্নীতি সূচকে দেশটির দুর্বল অবস্থানের (১২১তম) প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ।

শ্রীলঙ্কায় রনিলের গ্রেপ্তার রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ তুলেছে, যা বাংলাদেশের জন্যও একটি শিক্ষণীয় বিষয়। বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য জনগণের সমর্থন ধরে রাখা এবং সংস্কারের ভারসাম্য রক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ। শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা দেখায় যে অর্থনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি জনগণের আস্থা অর্জন না করলে ক্ষমতার স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত হতে পারে। বাংলাদেশে ড. ইউনূসের সরকারের পশ্চিমা নেতাদের সঙ্গে সীমিত যোগাযোগ এবং অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।

শ্রীলঙ্কার পথে হাঁটা বাংলাদেশের জন্য একটি সতর্কতা। অর্থনৈতিক সংকট, দুর্নীতি বিরোধী পদক্ষেপ, এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। শ্রীলঙ্কায় রনিলের পরিণতি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন নেতাদের জন্য শিক্ষা হতে পারে যে জনগণের আস্থা ছাড়া কোনো সংস্কার সফল হয় না। বাংলাদেশের সামনে এখন সুযোগ রয়েছে সংস্কারের মাধ্যমে একটি স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ গড়ার, তবে শ্রীলঙ্কার মতো ভুল পদক্ষেপ এড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

Visited 19 times, 1 visit(s) today