❐ জেলা প্রতিনিধি
গত বছর পারিবারিক বিরোধের জেরে আহত হন রাজশাহীর বাঘার গুপ্ত সংগঠন শিবিরের কর্মী যুবক জাহিদ হাসান (২২)। এ নিয়ে গ্রামে সালিশ-দরবারও হয়। অথচ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আন্দোলনে অংশগ্রহণের দাবি করে ‘জুলাইযোদ্ধা’ হিসেবে গেজেটভুক্ত হয়েছেন তিনি। এমন ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
আলোচনায় আসা জাহিদ উপজেলার চন্ডিপুর গ্রামের রবিউল ইসলামের ছেলে। তিনি জামায়াতে ইসলামীর গুপ্ত সন্ত্রাসী সংগঠন ছাত্র শিবিরের কর্মী।
স্থানীয়রা জানান, ঢাকায় একটি কোম্পানিতে চাকরি করতেন জাহিদ। গত বছরের ১লা আগস্ট চাকরি ছেড়ে তিনি গ্রামে ফেরেন। তখন ঢাকায় জুলাই হাঙ্গামা চলছিল। গ্রামে ফিরে জাহিদ নিজেকে সমন্বয়ক দাবি করে জমিজমার সংক্রান্ত পারিবারিক শত্রুতার জেরে মুস্তাক আহমেদ নামের এক স্কুলশিক্ষককে হুমকি দেন। ৬ই আগস্ট বিকেলে ফ্যাসিবাদের দোসর আখ্যা দিয়ে সেই শিক্ষকের পরিবারের ওপর হামলা করেন তিনি। পাল্টা প্রতিরোধে আহত হন জাহিদ। পরে তাকে স্থানীয়রা উদ্ধার করে প্রথমে বাঘা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে নিয়ে যান।
সংঘর্ষের পর জাহিদের বাবা রবিউল ইসলাম এ ঘটনায় পূর্ব শত্রুতার জের উল্লেখ করে বাঘা থানায় একটি লিখিত অভিযোগও দায়ের করেন। যাতে ৮ জনকে আসামি করা হয়। পরবর্তীতে এই ঘটনার রেশ ধরে জাহিদের স্বজনরা প্রতিপক্ষের ওপর হামলা করে। এমন পরিস্থিতিতে ইউপি চেয়ারম্যান ফিরোজ আহমেদ রঞ্জুর সমঝোতায় ৬ লাখ টাকার বিনিময়ে দু’পক্ষের মধ্যে বিষয়টি মীমাংসা হয়।
অথচ হাসপাতালে চিকিৎসার কাগজপত্র দেখিয়ে জাহিদ নিজেকে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আন্দোলনে আহত হিসেবে ‘জুলাইযোদ্ধা’ তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করেন এবং গেজেটপ্রাপ্ত হন। গেজেট নং ৮৩৪। মেডিকেল কেস নং ৫৯৯০।
মামলার বাদি ও জাহিদের বাবা রবিউল ইসলাম বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, জাহিদকে স্থানীয় কিছু আওয়ামী লীগ সমর্থক লোকজন মেরেছিল। তবে আন্দোলনে সে অংশ নিয়েছিল কি-না তা আমি জানি না। এ ব্যাপারে তার সঙ্গে কথা বলেন।
কীভাবে জুলাইযোদ্ধা তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত হলো জানতে চেয়ে যোগাযোগ করা হলে উত্তেজিত হয়ে পড়েন জাহিদ। তিনি আন্দোলনে অংশ নিয়ে আহতের দাবি করলেও কোনো তথ্যপ্রমাণ দিতে পারেননি।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জাহিদ সম্পর্কে কিছু তথ্য পাওয়া যায়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাহিদের এক বন্ধু বলেন, ও (জাহিদ) শিবিরের রাজনীতিতে জড়িত। গত আগস্টে গ্রামে চলে আসে। ঢাকায় যেখানে চাকরি করত, সেখানে কোনো একটি সমস্যা হয়েছে বলে শুনেছি আমরা। বিস্তারিত বলেনি কিছু। সরকারের পতন ঘটবে বোঝা যাচ্ছিল যখন, তখন গ্রামে আওয়ামী লীগের পক্ষের লোকজনের ওপর হুমকি-ধমকি দিতে শুরু করে। এসব নিয়ে মুস্তাক আহমেদের পরিবারের সাথে তাদের মারামারি হয়।
তিনি আরও বলেন, গত আগস্ট থেকে পরবর্তী সময় জাহিদ এলাকায় নিজেকে সমন্বয়ক পরিচয় দিয়ে অনেক অনিয়ম অপকর্ম করেছে। তবে কোথায় আন্দোলন করেছেন তিনি কেউ জানেনা। আমাদের এদিকে আন্দোলনের তেমন কোনো ঘটনা ছিল না। এলাকা প্রায় শান্তই ছিল। কেউ বলেন জাহিদ ঢাকায় আন্দোলন করেছে। কিন্তু তাহলে সে আগস্টের শুরুতে কেন চলে আসবে গ্রামে? তার আন্দোলনের কোনো ছবি-ভিডিও কিছু আমাদের চোখে পড়েনি।
এদিকে জাহিদের হামলার ঘটনা নিয়ে বিবাদি পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, জাহিদদের পরিবারের সঙ্গে জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের শত্রুতা ছিল। ৬ই আগস্ট জাহিদ দেশিয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তাদের মারতে যান। কিন্তু উল্টো আহত হয়ে ফেরেন। এ ঘটনায় তাদের পরিবারের বিরুদ্ধে মামলা করে জাহিদের পরিবার। পরে ইউপি চেয়ারম্যানের মধ্যস্থতায় বিষয়টি মীমাংসা হয়।
ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও ইউপি চেয়ারম্যান ফিরোজ আহমেদ রঞ্জু বলেন, জায়গা-জমি নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে স্থানীয় একটি পক্ষ জাহিদের পিঠে হাঁসুয়া দিয়ে কোপ দেয়। এ ঘটনায় আমি গ্রামের শতাধিক লোকজন নিয়ে মীমাংসা করে দিয়েছি। তারা এরমধ্যে মামলাও তুলে নিয়েছে ক্ষতিপূরণের টাকা নিয়ে। কিন্তু জাহিদ কীভাবে জুলাইযোদ্ধার গেজেটভুক্ত হলো তা আমার জানা নেই।
চন্ডিপুর গ্রামের শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমরা সবাই জানি ৫ই আগস্ট দুপুর থেকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সবাই পালিয়ে যায়। তাই সেদিন রাতে আওয়ামী সমর্থকরা কাউকে মারতে পারে এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। প্রতারণার মাধ্যমে কেউ আন্দোলনকারীর স্বীকৃতি পেলে প্রকৃত যোদ্ধাদের প্রতি বড় অবিচার হবে।
গ্রামের পল্লী চিকিৎসক সাইদুর রহমান বলেন, জুলাই আন্দোলনে আহত হয়েছে- এমন ভুয়অ দাবি করে গেজেটভুক্ত হলে, সরকারি সুযোগ-সুবিধা নিলে এটা অবশ্যই অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। প্রশাসনকে অবশ্যই বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে- এটা আমাদের প্রত্যাশা।
বাঘা উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাম্মী আক্তার জানান, আমি একাধিক সূত্র থেকে বিষয়টি জানতে পেরে ইউপি চেয়ারম্যান ফিরোজ আহমেদের কাছ থেকে জানতে চাই বিস্তারিত। তিনি নিশ্চিত করেছেন এটা জমি সংক্রান্ত সংঘর্ষের ঘটনা। সালিসে মীমাংসাও হয়েছে। তবে জাহিদ জুলাইযোদ্ধা গেজেটে কীভাবে নাম তুলেছে, সনদ পেয়েছে, আমার জানা নেই। আমি বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।
