❐ বিশেষ প্রতিবেদক
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার পর ধীরে ধীরে দেশের নাগরিক সেজে পাসপোর্ট পর্যন্ত সংগ্রহ করছে রোহিঙ্গারা। কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জে গড়ে উঠেছে সুসংগঠিত দালালচক্র, যারা ভুয়া জন্মনিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) বানিয়ে দিচ্ছে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাকে।
২০১৭ সালে নাফ নদ পেরিয়ে আসা ৩৫ বছর বয়সী মিনারা নামে এক রোহিঙ্গা নারী ৮ বছর পর হাসিনা পরিচয়ে জন্মনিবন্ধন, এনআইডি এবং অবশেষে পাসপোর্ট করার চেষ্টা করেন। গত ২৭শে আগস্ট বুধবার নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে ধরা পড়েন তিনি।
এমন ঘটনা শুধু মিনারার নয়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত তিন মাসে নারায়ণগঞ্জের একই অফিস থেকে আরও তিন রোহিঙ্গা আটক হয়েছেন। তাদের সবারই ভুয়া এনআইডি বানানো হয়েছিল কক্সবাজার, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন, কেরানীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন ইউনিয়নের ঠিকানায়।
ফতুল্লা থানা পুলিশ জানায়, দালালদের সহায়তায় তারা বাংলাদেশি নাগরিক সেজে বিদেশে পালানোর পরিকল্পনা করছিলেন।
দালালচক্রের কৌশল
প্রমাণ মিলছে, নারায়ণগঞ্জ পাসপোর্ট অফিস এখন রোহিঙ্গা পাচারের নতুন ট্রানজিট রুট। দালালচক্র প্রথমে ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গাদের বের করে ইউনিয়ন পরিষদের কিছু জনপ্রতিনিধির সহায়তায় জন্মনিবন্ধন সংগ্রহ করে। সেই কাগজ দিয়ে তৈরি হয় ভুয়া এনআইডি। এরপর পাসপোর্টের জন্য হাজির করা হয় নারায়ণগঞ্জ বা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক কার্যালয়ে।
পাসপোর্ট অফিসের এক কর্মকর্তা বলেন, “দালালরা ইউনিয়ন পরিষদের ভেতরে লোক লাগিয়ে রেখেছে। তাদের সহযোগিতা ছাড়া জন্মনিবন্ধন বা এনআইডি পাওয়া সম্ভব নয়।”
প্রতিশ্রুতি দিয়ে জুলাই দাঙ্গায় রোহিঙ্গাদের ব্যবহার
গত বছরের জুলাই-আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ সহিংসতায় ব্যবহার করা হয়েছিল অন্তত দেড় থেকে দুই লাখ রোহিঙ্গাকে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পভিত্তিক একটি সূত্রের বরাতে উঠে আসে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য। স্থানীয় জামায়াত-শিবিরের নেতারা এই রোহিঙ্গাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, যদি তাদের কথামত কাজ করে, যদি শেখ হাসিনা সরকারকে হটানো যায় তাহলে রোহিঙ্গাদেরকে পাসপোর্ট করে দেওয়া হবে, বাংলাদেশে বা অন্য কোনো দেশে থাকতে চাইলে ব্যবস্থা করা হবে।
এমন প্রতিশ্রতি দিয়ে রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করা হয় সহিংসতা চালানোর জন্য। এতে সম্পৃক্ত ছিলেন বিএনপির নেতারাও। বিহারি এবং রোহিঙ্গারা আন্দোলন করে শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে। গত জুলাইয়ের শেষ দিকে কক্সবাজারে আটক হয় কয়েক শ রোহিঙ্গা, যারা আন্দোলনে অংশগ্রহণের জন্য বিএনপির এক নেতার অধীনে সমবেত হয়েছিল। নিহত রোহিঙ্গা যুবক নুর মোস্তফা জুলাইয়ের নিহতের তালিকাভুক্ত হয়েছে। এনআইডি এবং পাসপোর্টের প্রতিশ্রুতিই তাদের উদ্বুদ্ধ করেছিল।
সাম্প্রতিক সময়ে আটকের কিছু ঘটনা
- ২৫শে মে: কিশোর আব্দুল আজিজ পাসপোর্ট করতে গিয়ে ধরা পড়েন। তিনি নাবালক ছিলেন এবং পুরো পরিবার ভুয়া এনআইডি ব্যবহার করছিল।
- ৩রা জুন: সুমা আক্তার নামের এক নারীকে আটক করা হয়। তদন্তে বের হয়, তার বাবা-মা ও স্বামীরও ভুয়া এনআইডি বানানো হয়েছিল।
- ১৮ই আগস্ট: মো. আনস ওরফে আরিয়ান ধরা পড়েন। ফিঙ্গারপ্রিন্ট যাচাইয়ে রোহিঙ্গা ডাটাবেজে মিল পাওয়া যায় তার নাম।
- ২৮শে আগস্ট: চট্টগ্রামে ভুয়া পরিচয়ে আবেদন করা ফরহাদ হোসেন ও আরও এক রোহিঙ্গাকে গোয়েন্দা পুলিশ আটক করে।
প্রশাসনের অবস্থান
নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের উপপরিচালক শামীম আহমদ জানান, “রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট ইস্যুর ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। ভুয়া কাগজপত্রের বিরুদ্ধে মামলা করা হচ্ছে এবং অভ্যন্তরীণ তদারকি বাড়ানো হয়েছে।”
ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের পরিচালক মো. সাইদুল ইসলাম বলেন, “রোহিঙ্গাদের সহায়তায় দালালচক্র সক্রিয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে যেকোনো ভুয়া আবেদন চিহ্নিত করা হচ্ছে।”
প্রশ্ন রয়ে যায়
যদিও একের পর এক রোহিঙ্গা ধরা পড়ছে, তবে দালালচক্রের মূল হোতারা এখনো ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে পাসপোর্ট অফিস পর্যন্ত জাল নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকায় সন্দেহ করা হচ্ছে—শক্তিশালী প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় চলছে এ ভুয়া নাগরিক বানানোর কারবার।

