নিজস্ব প্রতিবেদক
স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে বিভিন্ন বাণিজ্য ও আর্থিক সুবিধা পেয়ে আসছে বাংলাদেশ, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর ধীরে ধীরে সেসব সুবিধা কমে যাবে। তাই এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে—এমন আহ্বান জানিয়েছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরী।
গতকাল অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সাপোর্ট টু সাস্টেইনেবল গ্র্যাজুয়েশন প্রকল্প (এসএসজিপি) আয়োজিত ‘এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন অ্যান্ড স্ট্রাকচারাল ট্রান্সফরমেশন’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, এলডিসি সুবিধা শেষ হলেও রপ্তানিমুখী শিল্পগুলোর প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে বিকল্প পথ তৈরি করা জরুরি।
তিনি শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি ও প্রশিক্ষণ সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি সুলভ এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহারের ওপর জোর দেন। তার মতে, এতে উৎপাদনশীলতা যেমন বাড়বে, তেমনি পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ব্যবহার রপ্তানি পণ্যের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতাও বৃদ্ধি করবে।
অনুষ্ঠানের সভাপতি ও ইআরডি সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকী বলেন, কাঠামোগত রূপান্তরে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অপরিহার্য। এ জন্য গৃহীত ‘স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি’ বাস্তবায়নে সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অস্ট্রেলিয়ার ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ড. জুলফান তাজুদিন। তিনি বলেন, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বহু দেশে গণতান্ত্রিক চর্চার দুর্বলতা, সরকারের প্রতি আস্থাহীনতা ও ভূরাজনৈতিক জটিলতা কাঠামোগত রূপান্তরের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংস্কারের পাশাপাশি জনগণের ক্ষমতায়ন এবং ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জোর দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
প্যানেল আলোচনায় সাবেক সচিব আবদুল বাকি, সিপিডির ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান ও বিআইডিএসের রিসার্চ ডিরেক্টর ড. কাজী ইকবাল নীতিগত সংস্কার ও কাঠামোগত রূপান্তর দ্রুততর করার ওপর গুরুত্ব দেন।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদুল হাসান খানসহ বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা এলডিসি থেকে উত্তরণের সময়সীমা আরও তিন বছর বাড়ানোর আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তারা জ্বালানি নিরাপত্তা ও অবকাঠামো উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রস্তাব রাখেন।
২০২৬ সালের নভেম্বরে পাঁচ বছরের প্রস্তুতিকালীন সময় শেষে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে আসবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উত্তরণ টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করতে হলে শিল্পের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা উন্নয়ন এবং অর্থনীতিকে বহুমুখীকরণ করাই হবে প্রধান চ্যালেঞ্জ।
এলডিসি থেকে উত্তরণ ৩ বছর পিছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে: বাণিজ্য সচিব
বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘এলডিসি থেকে উত্তরণ তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, জাপান, ভারতসহ আমাদের বন্ধদেশগুলো এর বিরোধিতা করছে। তাই পেছানোর বিষয়টি নিয়ে খুব বেশি আশাবাদী হওয়া যাচ্ছে না। তবে সরকার চেষ্টা চালিয়ে যাবে।’
উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের উত্তরণ করার কথা রয়েছে। উত্তরণে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা হারাতে হবে। উত্তরণের পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্যসহ বড় বড় বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ১২ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ হতে পারে। এর ফলে রপ্তানি ৬ থেকে ১৪ শতাংশ কমে যেতে পারে। কাঁচামালের উৎসবিধি কঠোর হবে। এর ফলে তৈরি পোশাক খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই সম্প্রতি দেশের শীর্ষ ১৬ ব্যবসায়ী সংগঠন উত্তরণ পিছিয়ে দেওয়ার দাবি জানান।
