নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকা, ৪ নভেম্বর ২০২৫ – ইলিশ মাছের প্রধান প্রজনন মৌসুমে ধরা নিষিদ্ধকরণের সময়সীমা নির্ধারণে চরম অবহেলা ও ভুল হিসাবের অভিযোগ উঠেছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা এবং মৎস্য অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে। নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার মাত্র ৫ দিনের মধ্যে জেলেদের জালে উঠে আসছে ডিমভর্তি মা ইলিশ, যা প্রমাণ করে প্রজনন মৌসুম এখনও পুরোদমে চলছে। এতে ইলিশের ভবিষ্যৎ উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সরকার গত ১৪ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ১৫ দিনের জন্য ইলিশ ধরা, বিক্রি ও মজুদ নিষিদ্ধ করেছিল, যা গত ৩০ অক্টোবর শেষ হয়। কিন্তু নদীপথে নামা জেলেরা জানাচ্ছেন, পদ্মা-মেঘনা অববাহিকা, চাঁদপুর, ভোলা ও বরিশালের বিভিন্ন এলাকায় এখনও প্রচুর পরিমাণে ডিমওয়ালা ইলিশ ধরা পড়ছে।
“নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলেও মাছের পেট ভর্তি ডিম। এটা তো প্রজননের মাঝামাঝি সময়!” – বলছেন চাঁদপুরের জেলে মো. রহিম উদ্দিন। এই ঘটনা স্পষ্ট করে যে, মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে মৌলিক ভুল রয়েছে। ইলিশের প্রজনন মৌসুম সাধারণত অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে নভেম্বরের শুরু পর্যন্ত চলে, যা চন্দ্রচক্রের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু অধিদপ্তরের নির্ধারিত সময়সীমা প্রজননের পিক টাইমকে ঠিকমতো হিসাব করতে পারেনি। ফলে জেলেরা এখন মা ইলিশ নির্বিচারে ধরছেন, যা ইলিশের স্টক ধ্বংসের পথ খুলে দিচ্ছে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার এ বছর ব্যাপক প্রচারণা চালিয়েছিলেন। বিমানবাহিনীর ড্রোন ব্যবহার করে নদীপথে নজরদারি, স্যাটেলাইট ইমেজারি এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে প্রজনন মৌসুম নির্ধারণের দাবি করা হয়েছিল। “এবারের নজরদারি অত্যাধুনিক, কোনো ভুল হবে না” – বলে ঢাকঢোল পিটিয়েছিলেন উপদেষ্টা। কিন্তু বাস্তবে এই ‘হাইটেক’ উদ্যোগ কোনো কাজে আসেনি।
জেলে সম্প্রদায়ের অভিযোগ, ড্রোন উড়লেও স্থানীয় জেলেদের অভিজ্ঞতা ও চন্দ্রকালের সঠিক হিসাব উপেক্ষা করা হয়েছে। ফলে প্রজননের সঠিক সময় মিস হয়ে গেছে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) একজন বিশেষজ্ঞ (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, “ইলিশের প্রজনন অক্টোবরের পূর্ণিমা থেকে নভেম্বরের অমাবস্যা পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এবারের নিষেধাজ্ঞা খুব তাড়াতাড়ি শেষ করা হয়েছে। এতে লক্ষ লক্ষ ডিম ধ্বংস হবে, যা পরবর্তী মৌসুমে ইলিশের উৎপাদন ২০-৩০ শতাংশ কমিয়ে দিতে পারে।”
জেলে নেতারা দাবি করছেন, নিষেধাজ্ঞা আরও অন্তত ১০-১৫ দিন বাড়ানো দরকার। কিন্তু মৎস্য অধিদপ্তর এখনও নীরব।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার এর কার্যালয় থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এই ব্লান্ডারের ফলে ইলিশ রক্ষার জাতীয় প্রচেষ্টা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, এবং জেলেদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। সরকারের এই অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত ইলিশের ভবিষ্যৎকে ঝুঁকিতে ফেলেছে। বিশেষজ্ঞরা অবিলম্বে নতুন নিষেধাজ্ঞা জারি এবং সঠিক বৈজ্ঞানিক হিসাবের ভিত্তিতে নীতি প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন। না হলে বাংলাদেশের ‘রুপালি ফসল’ হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা অমূলক নয়।
