ব্যবসা অচল করতে ভারতীয় সুতা আমদানির সুবিধা প্রত্যাহারের প্রস্তাবনা, ক্ষোভে ফুঁসছেন ব্যবসায়ীরা

ব্যবসা অচল করতে ভারতীয় সুতা আমদানির সুবিধা প্রত্যাহারের প্রস্তাবনা, ক্ষোভে ফুঁসছেন ব্যবসায়ীরা
শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক

অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় বসেই আবারও পরিচিত পথে হাঁটছে—একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর চাপ সামলাতে গিয়ে দেশের প্রধান রপ্তানি খাতকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া। সুতা আমদানিতে বন্ডেড সুবিধা প্রত্যাহারের প্রস্তাব তারই সাম্প্রতিক উদাহরণ।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এমন উদ্যোগে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে তৈরি পোশাক খাত, যা দেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৫ শতাংশ যোগান দেয়।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) পাঠানো চিঠিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের সুতার আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছে। এই মাঝারি থেকে মোটা কাউন্টের সুতা মূলত নিট পোশাক তৈরিতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ, সিদ্ধান্তটি সরাসরি আঘাত করছে রপ্তানিমুখী গার্মেন্ট শিল্পের উৎপাদন কাঠামোয়।

সরকারি যুক্তি—ভারত থেকে কম দামে সুতা আমদানির ফলে স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলো চাপে পড়ছে। কিন্তু রপ্তানিকারকদের প্রশ্ন, বৈশ্বিক বাজারে যখন বাংলাদেশের পোশাক শিল্প মারাত্মক দামের চাপে, তখন কাঁচামালের খরচ কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দেওয়ার দায় কে নেবে?

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) এই সিদ্ধান্তকে ‘অবাস্তব ও আত্মঘাতী’ আখ্যা দিয়ে সংবাদ সম্মেলনের ঘোষণা দিয়েছে।

তাদের দাবি, প্রস্তাব আসার খবর ছড়াতেই স্থানীয় মিলগুলো সুতার দাম কেজিতে ২৫ থেকে ৩০ সেন্ট বাড়িয়ে দিয়েছে—যার সরাসরি বোঝা পড়ছে গার্মেন্ট কারখানার ওপর।

বিজিএমইএর পরিচালক ফয়সাল সামাদ বলেন, শুল্কমুক্ত আমদানি বন্ধ হলে কারখানাগুলো বাধ্য হয়ে বেশি দামে স্থানীয় সুতা কিনবে।

‘এতে উৎপাদন ব্যয় এমন পর্যায়ে যাবে, যা বিদেশি ক্রেতারা কোনোভাবেই গ্রহণ করবে না,’ বলেন তিনি।

তার ভাষায়, ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত সুতার আমদানিতে হঠাৎ বিধিনিষেধ দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাতকে গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে।

বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান আরও স্পষ্ট ভাষায় বলেন, স্পিনিং খাত রক্ষার নামে রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্পকে বলি দেওয়ার এই নীতি গ্রহণযোগ্য নয়।

তার হিসাবে, দেশের মোট সুতার চাহিদার প্রায় ৩০ শতাংশ আমদানিনির্ভর, যার বড় অংশ ভারত থেকে আসে। অথচ সরকার বিকল্প জোগান বা দাম স্থিতিশীল রাখার কোনো রোডম্যাপ ছাড়াই নিয়ন্ত্রণমূলক সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে।

অন্যদিকে, এই উদ্যোগ এসেছে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ)-এর দীর্ঘদিনের দাবির পর।

সংগঠনটির দাবি, ভারতীয় ‘ডাম্পিং’-এর কারণে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ থাকা প্রাইমারি টেক্সটাইল খাত হুমকির মুখে।

তবে সমালোচকদের প্রশ্ন—ডাম্পিং প্রতিরোধের জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আইনের পথ না হেঁটে কেন সরাসরি বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের মতো কাঁচা সিদ্ধান্ত?

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আমদানি বৃদ্ধির পরিসংখ্যান দেখিয়ে উদ্বেগ জানালেও রপ্তানিকারকরা বলছেন, এসব তথ্যের বিপরীতে বিশ্ববাজারের বাস্তবতা পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে।

তাদের আশঙ্কা, কাঁচামালের দাম বাড়লে অর্ডার চলে যাবে ভিয়েতনাম, ভারত বা কম্বোডিয়ার মতো প্রতিযোগী দেশে।

এলডিসি উত্তরণ, জিএসপি প্লাস বা টু-স্টেজ ট্রান্সফরমেশনের মতো ভবিষ্যৎ শর্ত সামনে এনে সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দিলেও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—অন্তর্বর্তী সরকারের কাজ কি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার, নাকি ক্ষমতাধর শিল্পগোষ্ঠীর চাপ সামলানো?

সব মিলিয়ে সুতা আমদানি নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ আবারও দেখাল, অন্তর্বর্তী সরকার নীতিনির্ধারণে সমন্বয়হীন, তড়িঘড়ি সিদ্ধান্তপ্রবণ এবং দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাতের বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন। এখন দেখার বিষয়, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে এর দায়ভার কে নেবে—স্পিনার, রপ্তানিকারক নাকি সরকার নিজেই।

Visited 5 times, 1 visit(s) today