নিজস্ব প্রতিবেদক
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরে অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে গিয়ে দুর্বৃত্তদের হামলায় র্যাবের এক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। নিহত কর্মকর্তার নাম আব্দুল মোতালেব। তিনি র্যাব–৭–এ উপসহকারী পরিচালক (ডিএডি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এ ঘটনায় আরও কয়েকজন র্যাব সদস্য আহত হয়েছেন।
আজ সোমবার, ১৯শে জানুয়ারি সন্ধ্যায় এ ঘটনা ঘটে।
বিকেলে র্যাবের পতেঙ্গা ব্যাটালিয়নের একটি দল জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় আসামি গ্রেপ্তারের উদ্দেশ্যে অভিযান চালায়। এ সময় দুর্বৃত্তরা র্যাবের চারজন কর্মকর্তা ও সদস্য এবং এক সোর্সকে আটকে রেখে মারধর করে। পরে খবর পেয়ে পুলিশ ও র্যাবের অতিরিক্ত বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছে জিম্মিদের উদ্ধার করে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে পাঠায়। সেখানে চিকিৎসক আবদুল মোতালেবকে মৃত ঘোষণা করেন।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপমহাপুলিশ পরিদর্শক (ডিআইজি) আহসান হাবীব পলাশ গণমাধ্যমকে জানান, সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে পরিচালিত অভিযানের সময় র্যাবের ডিএডি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন।
এ বিষয়ে র্যাব–৭–এর সহকারী পরিচালক (গণমাধ্যম) এআরএম মোজাফফর হোসেন গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলেন, জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান চলাকালে সন্ত্রাসীদের অতর্কিত হামলার মুখে পড়ে র্যাব সদস্যরা। এতে চারজন গুরুতর আহত হন। তাদের মধ্যে একজন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। আহত অপর তিনজন বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
জঙ্গল সলিমপুরের পাহাড় দখল নিয়ে বিএনপি-জামায়াতের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ ৩০, নিহত ১, নিখোঁজ ২০
পুলিশ ও র্যাব সূত্রে জানা গেছে, অস্ত্র উদ্ধারের উদ্দেশ্যে র্যাব সদস্যরা জঙ্গল সলিমপুরে প্রবেশ করলে সেখানে অবস্থানরত সন্ত্রাসীরা হঠাৎ হামলা চালায়। একপর্যায়ে তারা র্যাবের কয়েকজন সদস্যকে ছিনিয়ে নেয় এবং প্রকাশ্যে গুলি চালায়।
এই অপরাধ সাম্রাজ্যের নেপথ্যে রয়েছে দুটি শক্তিশালী পক্ষ। ‘আলীনগর বহুমুখী সমিতি’র নেতৃত্বে রয়েছেন চিহ্নিত সন্ত্রাসী জামায়াতপন্থি মো. ইয়াছিন মিয়া এবং ‘মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সংগ্রাম পরিষদ’ নিয়ন্ত্রণে রাখছেন বিএনপিপন্থি কাজী মশিউর ও গাজী সাদেক। এই দুই সমিতিতে সদস্য সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার। উত্তর জেলা যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. রোকন উদ্দিন ও গোলাম গফুরের নেতৃত্বাধীন একটি বিশাল দল রয়েছে ইয়াছিনের বিপক্ষে।
জঙ্গল সলিমপুরের অবস্থান চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী এলাকা থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার পশ্চিমে, এশিয়ান উইমেন ইউনিভার্সিটির বিপরীতে লিংক রোডের উত্তর পাশে। প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর আয়তনের এই এলাকা প্রশাসনিকভাবে সীতাকুণ্ডে পড়লেও এটি মূলত নগরের ভেতরেই অবস্থিত। এর পূর্বে হাটহাজারী উপজেলা এবং দক্ষিণে বায়েজিদ বোস্তামী থানা।
দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘদিন ধরেই সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত। গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বেড়েছে।
সম্প্রতি দখল ও নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাসীদের দুটি পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এতে একজন নিহত হন। পরদিন ঘটনাস্থলে সংবাদ সংগ্রহে গেলে সন্ত্রাসীদের হামলা ও মারধরের শিকার হন দুই সাংবাদিক।
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষ, গোলাগুলি
গত চার দশক ধরে সরকারি পাহাড় কেটে এখানে গড়ে উঠেছে কয়েক হাজার অবৈধ বসতি। এখনও পাহাড় কেটে প্লট বাণিজ্য চালু রয়েছে। এই অবৈধ দখল ও বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে এলাকাটিতে শক্তিশালী সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তোলা হয়েছে। এসব সন্ত্রাসী সার্বক্ষণিক সশস্ত্র পাহারায় থাকে। এলাকাবাসীর জন্য পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, বহিরাগত কেউ সহজে প্রবেশ করতে পারে না।
এমনকি পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারাও একাধিকবার সেখানে অভিযানে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন।
এর আগে, ২০২৩ সালের ১৪ই সেপ্টেম্বর জঙ্গল সলিমপুরের ছিন্নমূল বড়ইতলা ২ নম্বর সমাজ এলাকায় পাহাড় থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ শেষে ফেরার পথে জেলা প্রশাসনের তৎকালীন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. উমর ফারুক, সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তোফায়েল আহমেদসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। সে সময় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে ককটেল ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ গুলি ছোড়ে।
এরও আগে, ২০২২ সালের ৪ঠা ফেব্রুয়ারি জঙ্গল সলিমপুরে র্যাব ও সন্ত্রাসীদের মধ্যে গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটে। একই বছরের ২রা আগস্ট অবৈধ ঘরবাড়ি উচ্ছেদ অভিযান শেষে ফেরার পথে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বাধা দেওয়া হয়। এরপর ২০২২ সালের ৮ই সেপ্টেম্বর আলীনগর এলাকায় অবৈধ বসতি উচ্ছেদে গেলে সেখানকার সন্ত্রাসীরা পুলিশের ওপর হামলা চালায়।

