নিজস্ব প্রতিবেদক
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে উত্তাল সময়কার কথা। ১৯৮৮ সালের এ দিন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনা নগরীর লালদিঘি ময়দানে আয়োজিত এক জনসভায় যোগ দিতে গেলে সম্পূর্ণ বিনা উস্কানিতে স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের আজ্ঞাবহ পুলিশবাহিনী আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও সাধারণ জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়।
এতে ঘটনাস্থলেই শহিদ হন ২৪ জন নেতাকর্মী। পরে অজ্ঞাত পরিচয় আরও ৮ জনের নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। আহত হন প্রায় ৩ শতাধিক মানুষ।
সেদিন শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর পরেও নিতান্তই ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান তিনি। শেখ হাসিনাকে যখন গুলি করা হচ্ছিল নেতাকর্মীরা তাঁকে মানবঢাল দিয়ে রক্ষা করেন। এসময় অনেক নেতাকর্মী গুলিবিদ্ধ হনে। একজন ঢলে পড়লে সেই শূন্যস্থান পূরণ করেন আরেকজন। এভাবে তাঁকে সেদিন রক্ষা করা হয়।
বৃষ্টির মত গুলি করছিল পুলিশ। হঠাৎ অসাবধানতাবশতঃ এক পুলিশ সদস্যের রাইফেলের কানেকশন বেল্ট খুলে পড়ায় গুলিবর্ষণে কিছুটা ছেদ পড়ে, সেই সুযোগে তাঁকে নিয়ে সেখান থেকে সরে যান নেতাকর্মীরা। ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান শেখ হাসিনা।
কিন্তু এই বিরতি ছিল মাত্র কয়েক সেকেন্ডের। আবারও গুলিবর্ষণ শুরু হয়। ততক্ষণে আওয়ামীপন্থী আইনজীবী ও নেতাকর্মীরা মানবঢাল তৈরী করে শেখ হাসিনাকে কর্ডন করে আইনজীবী সমিতি অফিসে নিয়ে রক্ষা করেন। যদিও এর মধ্যে অকাতরে ঢলে পড়েন অনেক নেতাকর্মী।
শহিদ নেতাকর্মীরা হলেন- মো. হাসান মুরাদ, মহিউদ্দিন শামীম, স্বপন কুমার বিশ্বাস, এথেলবার্ট গোমেজ কিশোর, স্বপন চৌধুরী, অজিত সরকার, রমেশ বৈদ্য, বদরুল আলম, ডি কে চৌধুরী, সাজ্জাদ হোসেন, আব্দুল মান্নান, সবুজ হোসেন, কামাল হোসেন, বি কে দাশ, পঙ্কজ বৈদ্য, বাহার উদ্দিন, চান্দ মিয়া, সমর দত্ত, হাসেম মিয়া, মো. কাসেম, পলাশ দত্ত, আব্দুল কুদ্দুস, গোবিন্দ দাশ ও শাহাদাত।
ইতিহাসে এই দিনটিকে চট্টগ্রাম গণহত্যা দিবস হিসেবে পালন করা হয়।
জানা যায়, ১৯৮৮ সালের ২৪শে জানুয়ারির ওইদিন বৃষ্টির মতো এলোপাথাড়ি গুলি চালানো হয় শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর। কেন্দ্রীয় নেতারা ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেলেও প্রাণ হারান মোট ৩২ জন ছাত্র, শ্রমিক ও পেশাজীবী জনতা। আহত হন আরও প্রায় ৩ শতাধিক।
নৃশংসতার এক পর্যায়ে পুলিশের কড়া পাহারায় নিহত অধিকাংশের লাশ রাতের অন্ধকারে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে নগরীর অভয়মিত্র মহাশ্মশানে নিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হয়। অন্যদিকে চলে লাশ গুম করার চেষ্টা।
এই ঘটনার ৪ বছর পর ১৯৯২ সালের ৫ই মার্চ আইনজীবী শহীদুল হুদা বাদী হয়ে চট্টগ্রামের মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে মোট ৪৬ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর মামলাটি পুনরুজ্জীবিত হয়। আদালতের আদেশে সিআইডি মামলাটি তদন্ত করে ১৯৯৭ সালের ১২ই জানুয়ারি প্রথম এবং অধিকতর তদন্ত শেষে ১৯৯৮ সালের ৩রা নভেম্বর দ্বিতীয় দফায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। অভিযোগপত্রে তৎকালীন সিএমপি কমিশনারসহ ৮ পুলিশ সদস্যকে আসামি করা হয়।
মামলার আসামিরা হলেন- তৎকালীন সিএমপি কমিশনার মির্জা রকিবুল হুদা, কোতোয়ালী জোনের পেট্রোল ইন্সপেক্টর (পিআই) গোবিন্দ চন্দ্র মণ্ডল, কনস্টেবল আব্দুস সালাম, মোস্তাফিজুর রহমান, প্রদীপ বড়ুয়া, বশির উদ্দিন, শাহ মো. আবদুল্লাহ ও মমতাজ উদ্দিন।
২০০০ সালের ৯ই মে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু করেন আদালত।
২০২০ সালের ২০শে জানুয়ারি আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। রায়ে ৫ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এরা হলেন- কোতোয়ালী জোনের পেট্রোল ইন্সপেক্টর (পিআই) গোবিন্দ চন্দ্র মন্ডল, কনস্টেবল মোস্তাফিজুর রহমান, প্রদীপ বড়ুয়া, শাহ মো. আবদুল্লাহ ও মমতাজ উদ্দিন।
মৃত্যুজনিত কারণে তৎকালীন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার মির্জা রকিবুল হুদা, কনস্টেবল বশির উদ্দিন ও আব্দুস সালামকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।




