মতামত।। কারাগারে রমেশ চন্দ্র সেনের মৃত্যু: কয়েকটি প্রশ্ন

মতামত।। কারাগারে রমেশ চন্দ্র সেনের মৃত্যু: কয়েকটি প্রশ্ন
শেয়ার করুন

– ফরিদুর রহমান।
(বাংলাদেশ টেলিভিশনের প্রাক্তন উপ-মহাপরিচালক)

 

কারাগারে রমেশ চন্দ্র সেনের মৃত্যু কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি আমাদের সময়ের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহারের একটি নগ্ন প্রতিফলন। ছিয়াশি বছর বয়সের একজন জননেতা, সাবেক মন্ত্রী, যাঁর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক কোনো অভিযোগই কখনো প্রকাশ্যে উত্থাপিত হয়নি, তাঁকে সাদা পোশাকের কয়েকজন মানুষ এসে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায় এই আশ্বাস দিয়ে যে, “আধা ঘণ্টার মধ্যেই ফিরে আসবেন।” সেই আধা ঘণ্টা শেষ হতে লেগেছে প্রায় দেড় বছর, আর তার সমাপ্তি ঘটেছে কারাগারের ভেতর একটি মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। এই সময়ের দৈর্ঘ্যই আসলে রাষ্ট্রীয় সহিংসতার প্রকৃত রূপকে উন্মোচন করে। এটি আর হঠাৎ আঘাত নয়, এটি ধীরগতির, পরিকল্পিত এবং প্রাতিষ্ঠানিক।

 

আধুনিক রাষ্ট্র নিজেকে উপস্থাপন করে আইনের মাধ্যমে। আইনই রাষ্ট্রের চেহারা, আইনই তার সীমা। কিন্তু যখন অভিযোগ, পরোয়ানা বা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই কাউকে তুলে নেওয়া হয়, তখন রাষ্ট্র আর আইনের ভাষায় কথা বলে না; সে কথা বলে ক্ষমতার ভাষায়। “আমাদের সঙ্গে চলুন”, এই বাক্যটি কোনো আইনি নির্দেশ নয়, এটি এক ধরনের আধিপত্যমূলক সংকেত, যেখানে নাগরিক আর অধিকারভোগী থাকে না, বরং রাষ্ট্রের ইচ্ছার অধীন একটি শরীরে, প্রকৃতপক্ষে একটি শিকারে পরিণত হয়। সেই মুহূর্তেই রাষ্ট্র তার সাংবিধানিক চরিত্র হারাতে শুরু করে।

 

কারাগার রাষ্ট্রের সবচেয়ে সংবেদনশীল স্থানগুলোর একটি। কারণ এখানে মানুষ রাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকে। তার খাদ্যের যোগান, চলাফেরা, চিকিৎসা, এমনকি জীবনের মৌলিক নিরাপত্তাও রাষ্ট্রের হাতে। তাই কারাগারে কোনো মানুষের মৃত্যু মানেই রাষ্ট্রের দায়। একে “স্বাভাবিক মৃত্যু” বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই, কারণ স্বাভাবিকতা তখনই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়, যখন একজন মানুষ দেড় বছর ধরে বিচার ছাড়াই বন্দি থেকে ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যান। এই মৃত্যু যদি চিকিৎসার অভাবে হয়, তা অবহেলা; যদি মানসিক ও শারীরিক চাপের ফল হয়, তা নিষ্ঠুরতা; আর যদি পরিকল্পিত উদাসীনতার ফল হয়, তবে তা কাঠামোগত সহিংসতা। যে নামই দেওয়া হোক, দায় এড়ানো যায় না।

 

এই জায়গায় এসে ১৯৭১ সালের আল বদর বাহিনীর বুদ্ধিজীবী হত্যার সঙ্গে একটি অস্বস্তিকর মিল চোখে পড়ে। বলা যেতে পারে, তখন যুদ্ধ ছিল একটি দখলদার বাহিনির বিরুদ্ধে, এখন দেশ স্বাধীন এবং রাষ্ট্র একটি সরকারের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত। তখন ছিল সরাসরি হত্যা, এখন আইনি কাঠামো আছে। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষণ সময় বা পোশাক দেখে হয় না, হয় পদ্ধতি ও উদ্দেশ্য দেখে। তখন মানুষকে তুলে নেওয়া হয়েছিল দ্রুত হত্যা করে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব ও বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতা সৃষ্টির জন্য।এখন মানুষকে তুলে নেওয়া হয় দীর্ঘ সময় ধরে আটকে রেখে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করে কর্মীদের মনোবল ভেঙে দেওয়ার জন্য। তখন লাশ ফেলা হতো বধ্যভূমিতে, এখন লাশ তৈরি হয় কারাগারের ভেতর, ফাইলের ভাষায়, চিকিৎসা প্রতিবেদনের আড়ালে। উদ্দেশ্য উভয় ক্ষেত্রেই এক। ভয় সৃষ্টি করা, অনিশ্চয়তা তৈরি করা, বোঝানো যে রাষ্ট্র চাইলে কাউকে দৃশ্যমানভাবে নয়, অদৃশ্যভাবেও নিশ্চিহ্ন করতে পারে।

 

এই ধরনের মৃত্যুর একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য উদাহরণ সৃষ্টি করা। এটি কোনো অপরাধী বা নিরাপরাধ মানুষকে ব্যক্তিগতভাবে শাস্তি দেওয়ার চেয়ে বড় কিছু। এর মাধ্যমে সমাজকে জানিয়ে দেওয়া হয়, ক্ষমতার সীমা কতো দীর্ঘ, আর নাগরিকের সীমা কতটা সংকীর্ণ। এই বার্তা শুধু বিরোধী রাজনীতিকদের জন্য নয়; এটি সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, আমলা, সবাইকে লক্ষ্য করে ছোড়া হয়। স্পষ্টতই এতে বলা হয়, নিরাপত্তা কোনো অধিকার নয়, এটি ক্ষমতার দেওয়া একটি সাময়িক সুবিধা।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই সবকিছু ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। সমাজ যখন বলে, “উনি তো রাজনীতিক ছিলেন”, “সময় খারাপ ছিল”, “সব দেশেই এমনটা হয়”, তখন রাষ্ট্রীয় সহিংসতা তার সবচেয়ে বড় কার্যকর রূপ পায়। কারণ সহিংসতা তখন আর প্রতিরোধের মুখে পড়ে না, বরং নীরবতার ভেতর দিয়ে বৈধতা অর্জন করে। ইতিহাসে কোনো দমন-পীড়ন একদিনে প্রতিষ্ঠিত হয় না; তা ধাপে ধাপে সামাজিক সহনশীলতার সীমা পরীক্ষা করে অগ্রসর হয়।

 

এখানেই রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রতন্ত্রের পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রাষ্ট্র মানে নিয়ম, জবাবদিহি ও সীমা মেনে চলা। রাষ্ট্র তার নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রত্ব হারালে সেই রাষ্ট্র পরিণত হয় কেবল একটি ক্ষমতার কাঠামোতে, যেখানে আইন থাকে মুখোশ হিসেবে, আর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় সুবিধা ও ভীতি প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে। কারাগারে বিচারহীন বন্দিত্বের পর একজন মানুষের মৃত্যু সেই অবক্ষয়েরই দলিল।

 

রমেশ চন্দ্র সেনের মৃত্যু তাই শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি আমাদের সময়ের একটি রাজনৈতিক দলিল। এটি দেখিয়ে দেয়, কীভাবে আইন ধীরে ধীরে সরিয়ে দেওয়া হয়, আর তার জায়গা নেয় ক্ষমতা ও নীরবতা। ১৯৭১ আমাদের শিখিয়েছে, হত্যা শুধু গুলিতে হয় না, তারও পূর্বে তালিকা প্রস্তুত করা হয়। সময়ের দীর্ঘ পথ পাড়ি দেবার পরেও তালিকা তৈরি হচ্ছে, তালিকা ধরে নিপীড়ন, নির্যাতন, হত্যা করা হচ্ছে কখনো কারাগারে অবরুদ্ধ করে, কখনো “মব জাস্টিস” নামের বিচারহীন বিচারকে বৈধতা দিয়ে সময়ের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে।

 

রমেশ চন্দ্র সেনের মৃত্যু আমাদের কয়েকটি প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ১. অভিযোগ ছাড়া গ্রেপ্তার কীভাবে সম্ভব হলো? ২. দেড় বছরে বিচার প্রক্রিয়া কোথায় ছিল? ৩. কারাগারে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসার প্রকৃত অবস্থা কী? ৪. এই মৃত্যুর স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত হবে কি? এই প্রশ্নগুলো তোলা মানে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা নয়, এগুলো রাষ্ট্রকে তার ন্যূনতম নৈতিক মানদণ্ডে ফিরিয়ে আনার দাবি।

 

যে রাষ্ট্রে, যে সমাজে মানুষ “আধা ঘণ্টা”র কথা শুনে আর ফিরে আসে না, সেই দেশে, সেই সমাজে ১৯৭১ সালের রাজাকার আল বদরদের নৃশংস হত্যাকাণ্ড শুধু ইতিহাস নয়, এটি একটা চলমান সতর্কবার্তা। নাম বদলায়, পোশাক বদলায়, কিন্তু মাথায় পরাজয়ের গ্লানি আর প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা থাকলে সহিংসতার চরিত্র কখনো বদলায় না। আমরা এই ধারাকে প্রতিহত করবো, নাকি একে ইতিহাসের আরেকটি নীরব অধ্যায় হিসাবে মেনে নেব?

 

Visited 7 times, 1 visit(s) today